স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে অনিয়মিত খাবার, অল্প ব্যায়াম ও মানসিক চাপ শরীরের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলে। তার মধ্যেই বর্তমানে একটি বহুল প্রচলিত রোগ হল নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)। নাম থেকেই বোঝা যায় এই অসুখে লিভারে চর্বি জমে, তবে এর সঙ্গে অ্যালকোহল বা মদ্যপানের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। ভারতীয় উপমহাদেশে এবং বিশেষ করে শহুরে জীবনে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এই সমস্যা দ্রুত বাড়ছে।
মানবদেহে লিভার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি খাবার হজমে সাহায্য করে, শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করে এবং শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। সাধারণত লিভারে কিছুটা ফ্যাট (চর্বি) থাকা স্বাভাবিক, তবে যদি লিভারের মোট ওজনের ৫-১০ শতাংশের বেশি ফ্যাট জমে যায়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।
যখন এই অবস্থার সঙ্গে অ্যালকোহলের সম্পর্ক থাকে না, তখনই একে বলা হয় নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার।
এটি প্রধানত স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অল্প ব্যায়াম ইত্যাদি কারণে হয়ে থাকে।
সাধারণ ফ্যাটি লিভার (Steatosis)
– এখানে লিভারে অতিরিক্ত ফ্যাট জমে, তবে লিভারের কোষে তেমন ক্ষতি হয় না।
নন অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো হেপাটাইটিস (NASH)
– ফ্যাট জমার পাশাপাশি লিভারে প্রদাহ (inflammation) শুরু হয়।
ফাইব্রোসিস
– প্রদাহ চলতে থাকলে লিভারের স্বাভাবিক টিস্যুর জায়গায় শক্ত টিস্যু তৈরি হয়।
সিরোসিস
– দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে লিভার শক্ত হয়ে যায়, কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
স্থূলতা (Obesity): অতিরিক্ত ওজন লিভারে ফ্যাট জমার প্রধান কারণ।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে লিভারে চর্বি জমতে থাকে।
উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড: অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট জমে গিয়ে লিভারের ক্ষতি করে।
অলস জীবনযাপন: নিয়মিত শরীরচর্চার অভাবও বড় কারণ।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ভাজা, তেলে ভাজা, অতিরিক্ত মিষ্টি ও প্রসেসড খাবার খাওয়া।
জেনেটিক প্রবণতা: পরিবারের অন্য সদস্যদের লিভারের অসুখ থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত কোনও বিশেষ উপসর্গ বোঝা যায় না। তবে ধীরে ধীরে কিছু সমস্যা দেখা দেয়
সারাক্ষণ ক্লান্তি বা অবসন্নতা
পেটের ডান দিকে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি
অজীর্ণ, হজমে সমস্যা
ওজন বেড়ে যাওয়া বা হঠাৎ কমে যাওয়া
উন্নত স্তরে জন্ডিস, পা ফুলে যাওয়া, পেট ফুলে যাওয়া (সিরোসিস পর্যায়ে)
নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার সাধারণত রুটিন হেলথ চেকআপের সময় ধরা পড়ে।
আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (USG): সহজে ফ্যাটি লিভার চিহ্নিত করা যায়।
লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT): রক্তে লিভারের এনজাইমের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
FibroScan বা MRI: উন্নত ধাপ বোঝার জন্য ব্যবহৃত হয়।
লিভার বায়োপসি: নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য কখনও করা হয়।
নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের এখনও কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে জীবনধারা পরিবর্তনই এর প্রধান চিকিৎসা।
ওজন নিয়ন্ত্রণ:
– শরীরের মোট ওজনের ৭-১০% কমানো ফ্যাটি লিভার কমাতে সাহায্য করে।
সুষম খাদ্যাভ্যাস:
– ভাজা, তেলে ভাজা, মিষ্টি ও ফাস্টফুড কমাতে হবে।
– বেশি করে শাকসবজি, ফল, হোল গ্রেইন, ডাল, ওটস, বাদাম খেতে হবে।
– লাল মাংসের পরিবর্তে মাছ ও লীন প্রোটিন বেছে নিতে হবে।
– দিনে পর্যাপ্ত জল পান করতে হবে।
নিয়মিত শরীরচর্চা:
– প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং বা যোগব্যায়াম।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ:
– ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সঠিকভাবে খেতে হবে।
অ্যালকোহল ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ এড়ানো:
– যদিও এটি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার, তবুও লিভার সুরক্ষার জন্য অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে এড়াতে হবে।
শিশু বা কিশোর বয়স থেকেই সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজের মধ্যে বিরতি নিয়ে নড়াচড়া করা।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
নন অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন লক্ষণ বোঝা যায় না। কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাই জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই এ রোগ প্রতিরোধের মূল উপায়।