স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
অ্যাজমা বা হাঁপানি একটি দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা, যা শ্বাসনালীর প্রদাহ ও সঙ্কোচনের ফলে হয়। এর ফলে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুক চাপে, কাশি ও হাঁপানোর মতো উপসর্গ দেখা দেয়। আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি বহু প্রাচীন ঘরোয়া উপায়ে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিচে অ্যাজমা উপশমে কার্যকর কিছু ঘরোয়া টোটকা, খাদ্যাভ্যাস, ও জীবনযাত্রার পরামর্শ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
অ্যাজমার একাধিক কারণ থাকতে পারে:
অ্যালার্জি: ধুলো, ধোঁয়া, ফুলের রেণু, পশুর লোম, ইত্যাদি থেকে অ্যালার্জি।
আবহাওয়া পরিবর্তন: ঠান্ডা, আর্দ্রতা বা অতিরিক্ত গরমে শ্বাসনালী সংকুচিত হয়।
ধূমপান ও দূষণ: সিগারেট, ধোঁয়া বা রাসায়নিক বাষ্প অ্যাজমাকে আরও তীব্র করে।
বংশগত কারণ: পরিবারের কারও হাঁপানি থাকলে সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
মানসিক চাপ: উদ্বেগ, চিন্তা বা স্ট্রেসও শ্বাসকষ্ট বাড়ায়।
আদা শ্বাসনালীর প্রদাহ কমায় এবং শ্বাস নেওয়া সহজ করে।
এক চা চামচ আদার রস, আধা চা চামচ মধু ও সামান্য কালো মরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে হাঁপানি উপশমে সাহায্য করে।
গরম জলে আদা ফেলে ভাপ নিলে শ্বাসনালী খুলে যায়।
মধু শ্বাসনালীর মিউকাস বা কফ সরাতে সাহায্য করে।
এক কাপ গরম জলে এক চামচ মধু মিশিয়ে দিনে ২-৩ বার খাওয়া যেতে পারে।
রাতে ঘুমানোর আগে এক চামচ মধু খেলে কাশি কমে।
রসুনে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ আছে যা শ্বাসনালীর প্রদাহ কমায়।
২-৩ কোয়া রসুন কুচিয়ে দুধে ফোটিয়ে পান করলে শ্বাসকষ্টে আরাম পাওয়া যায়।
সকালে খালি পেটে কাঁচা রসুন খাওয়াও উপকারী।
তুলসীতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ইমিউন বুস্টার গুণ আছে।
কয়েকটি তুলসী পাতা চিবিয়ে খেলে শ্বাস প্রশ্বাস সহজ হয়।
তুলসী পাতা, আদা ও মধু মিশিয়ে চা বানিয়ে খেলে উপকার মেলে।
কালোজিরা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা উন্নত করে।
এক গ্লাস গরম জলে আধা চা চামচ কালোজিরা তেল মিশিয়ে সকালে খেলে উপকার।
কালোজিরা ভেজে গুঁড়ো করে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াও কার্যকর।
হলুদে থাকা কারকিউমিন প্রদাহবিরোধী ও অ্যালার্জি প্রতিরোধী।
গরম দুধে এক চিমটে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে দিনে একবার পান করুন।
হলুদ-আদা-মধু মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে সকালে খেলে শরীরের ইমিউনিটি বাড়ে।
পুদিনা শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
পুদিনা পাতার ভাপ নিলে congestion বা কফ কমে।
পুদিনা পাতা দিয়ে চা বানিয়ে পান করাও উপকারী।
লবঙ্গে অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ আছে।
২-৩টি লবঙ্গ এক কাপ পানিতে ফোটিয়ে গরম অবস্থায় পান করুন।
এতে কাশি ও হাঁপানির আক্রমণ কমে।
গরম জলে কয়েক ফোঁটা ইউক্যালিপটাস তেল দিয়ে ভাপ নেওয়া খুব কার্যকর।
বুক ও পিঠে হালকা করে কালোজিরা তেল মালিশ করলে শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়।
অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিচে কিছু খাওয়া উচিত ও খাওয়া উচিত নয় এমন খাবারের তালিকা দেওয়া হলো।
তাজা ফল ও সবজি (বিশেষ করে কমলালেবু, আপেল, পালং, ব্রকোলি)
ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত মাছ (যেমন: ইলিশ, সার্ডিন, রুই)
আদা, হলুদ, তুলসী, মধু, রসুন
গরম পানি বা হালকা উষ্ণ তরল খাবার
ভিটামিন সি ও ই সমৃদ্ধ খাদ্য (লেবু, বেলপেপার, বাদাম)
ঠান্ডা পানীয়, আইসক্রিম
তেলেভাজা ও ফাস্ট ফুড
অতিরিক্ত দুধ বা দুধজাত পদার্থ (কিছু ক্ষেত্রে কফ বাড়ায়)
ধূমপান ও মদ্যপান
সংরক্ষিত ও প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবার
অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধুমাত্র ওষুধ নয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তনও জরুরি।
নিয়মিত প্রণায়াম ও যোগব্যায়াম:
ভস্ত্রিকা, অনুলোম–বিলোম, কপালভাতি প্রভৃতি শ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসকে শক্তিশালী করে।
ধুলো–ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন:
বাড়ি পরিষ্কার রাখুন, মাস্ক ব্যবহার করুন, এবং দূষিত পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ থাকবেন না।
স্ট্রেস কমান:
মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে ধ্যান ও পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন।
নিয়মিত ব্যায়াম:
হালকা হাঁটা বা সাঁতার শ্বাসপ্রশ্বাস উন্নত করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন:
অতিরিক্ত ওজন অ্যাজমার উপসর্গ বাড়ায়।
তুলসী পাতার রস ২ চামচ, আদার রস ১ চামচ, মধু ১ চামচ মিশিয়ে দিনে দুইবার খান। এটি ফুসফুস পরিষ্কার রাখে।
এক চা চামচ কালোজিরা গুঁড়ো, আধা লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে সকালে খেলে শ্বাসনালীতে জমে থাকা কফ দূর হয়।
গরম জলে দারচিনি গুঁড়ো ও মধু মিশিয়ে পান করলে প্রদাহ কমে ও রাতে শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়।
অ্যাজমা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি উপরোক্ত ঘরোয়া উপায়গুলো অনুসরণ করলে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা অনেকাংশে লাঘব করা যায়। তবে উপসর্গ বেড়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রকৃতির সহজ উপাদানগুলির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসাধারণ নিরাময় ক্ষমতা তাই জীবনযাত্রায় ছোটখাটো পরিবর্তন আনলেই অ্যাজমা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে।