19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাস্তু মেনে বাসস্থান: জীবনে শান্তি, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি..

বাড়িঘর

নিজস্ব প্রতিনিধি


মানুষের জীবনে বাড়ি শুধু একটি আশ্রয় নয়, এটি তার মানসিক শান্তি, সুখ, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির প্রতিফলন। তাই প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যশাস্ত্র “বাস্তুশাস্ত্র” বা “বাস্তুবিদ্যা” কেবল একটি নির্মাণ নীতি নয়, বরং এটি একটি জীবনদর্শন যা প্রকৃতি, শক্তি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সুষম ভারসাম্য রক্ষা করে। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বাস্তু মেনে বাসস্থান গড়ার মূলনীতি, দিকনির্দেশনা, ঘরবাড়ির বিভিন্ন অংশের অবস্থান, শুভ ও অশুভ দিক, এবং আধুনিক সময়ে বাস্তুর প্রয়োগ নিয়ে।


বাস্তুশাস্ত্র কী?

‘বাস্তু’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বস্তু’ বা ‘বাস’ থেকে, যার অর্থ বসবাসের স্থান। ‘শাস্ত্র’ মানে নিয়ম বা বিদ্যা। অতএব, বাস্তুশাস্ত্র হলো “বসবাসের নিয়ম” বা “নির্মাণবিদ্যা” যা মানুষ, প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রাচীন ঋষিরা বিশ্বাস করতেন, পৃথিবী পাঁচটি মৌলিক উপাদানে গঠিত পৃথিবী (ভূমি), জল (আপ), অগ্নি (তেজ), বায়ু (বায়ু) এবং আকাশ (আকাশ)। বাস্তুশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো এই পাঁচ উপাদান ও আট দিকের শক্তিকে এমনভাবে সমন্বিত করা, যাতে বাড়িতে বসবাসকারী মানুষের জীবনে শান্তি, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে।


দিক ও শক্তির ভূমিকা

বাস্তু অনুযায়ী প্রতিটি দিকের নিজস্ব দেবতা ও শক্তি রয়েছে, যা জীবনের নির্দিষ্ট দিকগুলিকে প্রভাবিত করে।

দিকশাসক দেবতাপ্রভাব
পূর্বইন্দ্রনতুন সূচনা, শক্তি, সমৃদ্ধি
পশ্চিমবরুণস্থায়িত্ব ও অভিজ্ঞতা
উত্তরকুবেরঅর্থ, সম্পদ
দক্ষিণযমশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ
উত্তর-পূর্ব (ঈশান)ঈশ্বরআধ্যাত্মিকতা ও ইতিবাচক শক্তি
দক্ষিণ-পূর্ব (অগ্নি)অগ্নিদেবশক্তি, রান্নাঘর ও প্রাণশক্তি
দক্ষিণ-পশ্চিম (নৈঋত)নৈঋতস্থিতিশীলতা, নেতৃত্ব
উত্তর-পশ্চিম (বায়ব্য)বায়ুসম্পর্ক, যোগাযোগ

সুতরাং, ঘর নির্মাণে কোন দিক কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করা হয় এই শক্তির ভারসাম্য অনুযায়ী।


বাড়ি নির্মাণের আগে করণীয়

১. জমি নির্বাচন

  • চতুর্ভুজ বা আয়তাকার জমি বাস্তু অনুযায়ী সবচেয়ে শুভ।

  • উত্তর বা পূর্বমুখী জমি সৌভাগ্য বৃদ্ধি করে।

  • জমির দক্ষিণ-পশ্চিম দিক যদি সামান্য উঁচু হয়, তা শুভ।

  • কবরস্থান, মন্দির, হাসপাতাল বা নালার পাশে জমি এড়িয়ে চলা উচিত।

২. প্রবেশদ্বার (Main Door)

  • পূর্ব বা উত্তর দিকের প্রধান দরজা সবচেয়ে শুভ।

  • দরজা এমনভাবে রাখতে হবে যাতে ঘরে প্রবেশের সময় সূর্যের আলো ভিতরে ঢোকে।

  • প্রবেশদ্বারে ঘণ্টা, শুভ চিহ্ন (স্বস্তিক, ওঁ, পদ্ম) বা তুলসী রাখলে ইতিবাচক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

৩. জলাশয় ও ট্যাংক

  • পানির উৎস বা ট্যাংক উত্তর-পূর্ব দিক রাখা শ্রেয়।

  • এটি শান্তি ও ধনবৃদ্ধিতে সহায়ক।


ঘরের অংশ অনুযায়ী বাস্তু নির্দেশ

ড্রয়িংরুম বা বসার ঘর

  • উত্তর-পূর্ব বা উত্তর দিক হলে শুভ।

  • আসবাবপত্র ভারী হলে দক্ষিণ বা পশ্চিমে রাখুন।

  • হালকা রঙ যেমন ক্রিম, হালকা নীল বা সবুজ ব্যবহার করলে ইতিবাচক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

  • টিভি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী দক্ষিণ-পূর্বে রাখলে শক্তির প্রবাহ ঠিক থাকে।


রান্নাঘর (Kitchen)

  • দক্ষিণ-পূর্ব দিক রান্নাঘরের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এটি অগ্নিতত্ত্বের স্থান।

  • গ্যাস বা চুলা এমনভাবে বসান যাতে রান্নার সময় মুখ পূর্বদিকে থাকে।

  • ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন দক্ষিণ-পশ্চিমে রাখতে পারেন।

  • রান্নাঘরে কালো বা ধূসর রঙ না ব্যবহার করাই ভালো; বরং কমলা, হলুদ বা হালকা লাল শুভ।


শোবার ঘর (Bedroom)

  • দক্ষিণ-পশ্চিম দিক শোবার ঘরের জন্য আদর্শ।

  • মাথা দক্ষিণ বা পশ্চিম দিকে রেখে ঘুমালে শরীরের চৌম্বক শক্তি ভারসাম্য বজায় থাকে।

  • বিছানার সামনে আয়না না রাখাই ভালো।

  • দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য হালকা গোলাপি, ক্রিম বা প্যাস্টেল রঙ ব্যবহার করুন।


শিশুর ঘর (Children’s Room)

  • পশ্চিম বা উত্তর-পূর্ব দিক শিশুদের ঘরের জন্য শুভ।

  • পড়ার টেবিল এমনভাবে রাখুন যাতে শিশুর মুখ পূর্ব বা উত্তরমুখী থাকে।

  • উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রঙ যেমন হালকা সবুজ, আকাশি বা হলুদ ব্যবহার করুন।


পুজোর ঘর (Prayer Room)

  • উত্তর-পূর্ব দিক (ঈশান কোণ) পুজো ঘরের জন্য সর্বাধিক পবিত্র স্থান।

  • দেবমূর্তি মুখ করে থাকুক পূর্ব বা পশ্চিমদিকে।

  • পুজো ঘরে অন্ধকার বা অগোছালো পরিবেশ রাখবেন না।

  • ধূপ, ফুল, প্রদীপের ব্যবহার ইতিবাচক শক্তি বাড়ায়।


বাথরুম ও টয়লেট

  • পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিকে বাথরুম রাখা শ্রেয়।

  • টয়লেটের আসন এমনভাবে বসান যাতে মুখ উত্তর বা পূর্বদিকে না থাকে।

  • নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি, কারণ এটি নেগেটিভ এনার্জির কেন্দ্র হতে পারে।


স্টাডি বা অফিস রুম

  • উত্তর বা পূর্ব দিক অধ্যয়ন ও কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

  • ডেস্ক এমনভাবে বসান যাতে মুখ পূর্ব দিকে থাকে।

  • প্রেরণাদায়ক ছবি, বই ও গাছ রাখলে মনোযোগ বাড়ে।


গাছপালা ও বাহিরের বাস্তু

শুভ গাছ:

  • তুলসী, অশ্বত্থ, বেল, আমলকী, কলা গাছ ইত্যাদি ইতিবাচক শক্তি আনয়ন করে।

  • তুলসী রাখার সর্বোত্তম স্থান — উত্তর-পূর্ব দিক।

অশুভ গাছ:

  • কাঁটা যুক্ত গাছ (যেমন বাবলা, কাঁটাগাছ), মৃত বা শুকনো গাছ বাস্তুদোষ সৃষ্টি করে।

  • এই ধরনের গাছ বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে থাকলে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।

গেট ও বাউন্ডারি:

  • প্রধান গেট পূর্ব বা উত্তর দিকের হলে শুভ।

  • গেটের দুপাশে দুটো পাত্রে তুলসী বা মানি প্ল্যান্ট রাখলে শুভ ফল মেলে।


রঙ ও বাস্তু

রঙ মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে প্রভাবিত করে।

ঘররঙপ্রভাব
বসার ঘরক্রিম, হালকা সবুজশান্তি ও অতিথি সৌভাগ্য
রান্নাঘরহালকা লাল, কমলাউদ্যম ও শক্তি
শোবার ঘরপ্যাস্টেল গোলাপি, ক্রিমপ্রেম ও প্রশান্তি
পুজো ঘরসাদা, হলুদপবিত্রতা ও ইতিবাচকতা
স্টাডি রুমআকাশি, হালকা নীলমনোযোগ ও জ্ঞান বৃদ্ধি

বাস্তুদোষ ও প্রতিকার

যদি কোনো কারণে বাড়িতে বাস্তুদোষ থাকে, তবে সহজ কিছু উপায়ে তা সংশোধন করা যায়।

✅ কিছু সহজ প্রতিকার:

  1. তুলসী গাছ উত্তর-পূর্বে রাখলে অনেক বাস্তুদোষ দূর হয়।

  2. স্বস্তিক চিহ্ন বা গণেশ মূর্তি প্রবেশদ্বারে রাখলে ইতিবাচক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

  3. হিমালয়ান রক সল্ট ল্যাম্প নেগেটিভ এনার্জি শোষণ করে।

  4. সঙ্গীত ও মন্ত্রোচ্চারণ ঘরের পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখে।

  5. আয়না সঠিক দিক (উত্তর বা পূর্ব) এ রাখলে ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়।


আধুনিক সময়ে বাস্তু প্রয়োগ

আজকের ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট জীবনে শতভাগ বাস্তু মেনে চলা সবসময় সম্ভব নয়।
তবুও কিছু ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি ঘরে ইতিবাচক শক্তি বজায় রাখতে পারেন —

  • সূর্যের আলো ও বাতাসের প্রবেশ যেন থাকে।

  • ঘরে অন্ধকার বা জঞ্জাল জমে থাকতে দেবেন না।

  • সুগন্ধি বা ধূপ জ্বালান, যা মন ও পরিবেশ উভয়কেই শান্ত করে।

  • নিয়মিত ফুল বা গাছপালা পরিবর্তন করুন।

  • ঘরে হালকা রঙের পর্দা ও দেওয়াল ব্যবহার করুন।

বাস্তুশাস্ত্র শুধুমাত্র স্থাপত্য নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বিজ্ঞান।
একটি বাস্তুসম্মত বাড়ি শুধু বসবাসের স্থান নয় — এটি মন ও শরীরের সুষম সমন্বয়ের কেন্দ্র। যেখানে আলো, বাতাস, রঙ, দিক, শক্তি — সব মিলেমিশে সৃষ্টি করে একটি শান্তিপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবেশ। তাই বাড়ি নির্মাণে বা সাজসজ্জায় সামান্য বাস্তুজ্ঞান প্রয়োগ করলেই আপনি পেতে পারেন স্বাস্থ্য, সম্পদ, সুখ ও মানসিক প্রশান্তি

ঠিক যেমনটি বলা হয় প্রাচীন শাস্ত্রে

“যত্র বাস্তু সম্যক সন্নিবদ্ধং, তত্র সুখম্, শান্তিঃ, সমৃদ্ধিঃ চ।”

(যেখানে বাস্তু সঠিকভাবে অনুসৃত হয়, সেখানে বাসিন্দার জীবনে শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি স্থায়ী হয়।)

Archive

Most Popular