19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বডি মাসাজের ম্যাজিক!

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


মানুষের শরীর মানেই এক আশ্চর্য যন্ত্র, যা কাজের চাপে, মানসিক টানাপোড়েনে ও জীবনের অনবরত ছন্দে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমন সময় বডি মাসাজ যেন এক জাদুকরী ছোঁয়া যা শুধু শরীর নয়, মনকেও আরাম দেয়, পুনরুজ্জীবিত করে আত্মাকে। প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর নানা সভ্যতায় বডি মাসাজের ব্যবহার দেখা গেছে ভারতীয় আয়ুর্বেদ, চীনা আকুপ্রেশার, থাই ট্র্যাডিশনাল থেরাপি থেকে শুরু করে ইউরোপীয় স্পা সংস্কৃতি পর্যন্ত। আজকের যুগে যখন স্ট্রেস আমাদের নিত্যসঙ্গী, তখন বডি মাসাজ হয়ে উঠেছে এক বৈজ্ঞানিক ও থেরাপিউটিক সমাধান।


বডি মাসাজের উৎপত্তি ও ঐতিহ্য

বডি মাসাজ বা ‘অভ্যঙ্গ’ শব্দটির মূল পাওয়া যায় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাবিদ্যার অন্যতম স্তম্ভ এই থেরাপি। "অভ্যঙ্গং আচার্যস্য নিত্যং কুর্যাৎ" এই উক্তিতে আয়ুর্বেদ গুরুদের পরামর্শ, প্রতিদিন বডি মাসাজ করা উচিত। তাঁদের মতে, তেল দ্বারা দেহে মৃদু ঘর্ষণ রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে, কোষের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং স্নায়ু শান্ত করে। চীন ও থাইল্যান্ডে মাসাজকে বলা হয় ‘চি’ বা ‘প্রাণশক্তি’র ভারসাম্য রক্ষার উপায়। পশ্চিমা বিশ্বে, রোমান ও গ্রিক সভ্যতায় এটি ছিল রাজকীয় রিল্যাক্সেশন পদ্ধতি। আধুনিক কালে সুইডিশ মাসাজ, ডিপ টিস্যু থেরাপি, অ্যারোমাথেরাপি, হট স্টোন বা রিফ্লেক্সোলজির মাধ্যমে এই ঐতিহ্য পেয়েছে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক রূপ।


বডি মাসাজের প্রকারভেদ

১. আয়ুর্বেদিক মাসাজ (অভ্যঙ্গ):
তিলতেল, নারকেল তেল, সরিষা তেল বা ভেষজ তেল গরম করে পুরো শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এটি ডিটক্সিফিকেশন, জয়েন্ট পেইন উপশম ও ঘুম উন্নতিতে কার্যকর।

২. সুইডিশ মাসাজ:
হালকা চাপ ও লম্বা স্ট্রোক ব্যবহার করে করা হয়। এটি রিল্যাক্সেশনের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়, স্ট্রেস কমায় ও রক্তসঞ্চালন বাড়ায়।

৩. ডিপ টিস্যু মাসাজ:
গভীর পেশীতে চাপ প্রয়োগ করে করা হয়। এটি ব্যথা, শক্ত মাংসপেশি ও ক্রনিক টেনশন দূর করতে সহায়ক।

৪. অ্যারোমাথেরাপি মাসাজ:
ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, লেমনগ্রাস, বা ইউক্যালিপটাস তেলের ঘ্রাণ ব্যবহারে মানসিক প্রশান্তি ও স্নায়ু শান্তি পাওয়া যায়।

৫. থাই মাসাজ:
স্ট্রেচিং ও যোগাসনের মতো নড়াচড়া ব্যবহার করে পুরো শরীরকে শিথিল করে। এটি নমনীয়তা বৃদ্ধি ও পেশী ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে।

৬. হট স্টোন মাসাজ:
গরম পাথর দিয়ে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে চাপ প্রয়োগ করা হয়, যা রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে পেশীর টান কমায়।


বডি মাসাজের শারীরিক উপকারিতা

১. রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি

মাসাজের সময় শরীরের পেশীতে মৃদু চাপ ও ঘর্ষণ রক্তপ্রবাহকে সক্রিয় করে। এর ফলে কোষে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, টিস্যুর পুষ্টি হয় এবং শরীর আরও উদ্যমী হয়ে ওঠে।

২. ব্যথা ও ক্লান্তি উপশম

দীর্ঘ সময় কাজ করার পর পেশীতে জমে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ক্লান্তি ও ব্যথার কারণ হয়। মাসাজ এই জমে থাকা টক্সিন দূর করে পেশীকে নমনীয় ও আরামদায়ক করে তোলে।

৩. ঘুমের মান উন্নয়ন

মাসাজের সময় শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা ঘুমকে গভীর ও প্রশান্ত করে। বিশেষ করে ইনসমনিয়া আক্রান্তদের জন্য এটি প্রাকৃতিক ওষুধের মতো।

৪. স্নায়ুতন্ত্রে প্রশান্তি

মাসাজের ছোঁয়ায় প্যারাসিম্প্যাথেটিক নার্ভ সিস্টেম সক্রিয় হয়, যা শরীরকে ‘রিল্যাক্স মোড’-এ নিয়ে যায়। ফলে হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, ও মানসিক টান কমে যায়।

৫. ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি

তেলের ঘর্ষণে মৃত কোষ ঝরে পড়ে, রোমকূপ খোলে ও রক্ত চলাচল সক্রিয় হয়। ফলস্বরূপ ত্বক হয় নরম, মসৃণ ও দীপ্তিময়।


মানসিক ও আবেগিক উপকারিতা

স্ট্রেস কমায়

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় মানসিক চাপ বাড়ে। মাসাজ শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমায় এবং ডোপামিন-সেরোটোনিন বৃদ্ধি করে—ফলে মন হয় হালকা ও সুখী।

উদ্বেগ ও বিষণ্নতা দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বডি মাসাজ উদ্বেগের উপসর্গ ৪০% পর্যন্ত কমাতে পারে। শরীরের ছোঁয়া মস্তিষ্কে নিরাপত্তার বার্তা পাঠায়, যা মানসিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।

আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি

মাসাজের ফলে যখন শরীর ও মন পুনরুজ্জীবিত হয়, তখন আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে। নিজেকে যত্ন নেওয়ার অভ্যাস আত্মসম্মান বৃদ্ধি করে।


নারীদের জন্য বিশেষ উপকারিতা

  • গর্ভাবস্থায়: প্রি-নাটাল মাসাজ পিঠব্যথা, পা ফোলা ও ক্লান্তি কমায়।

  • পিরিয়ডের সময়: হালকা অ্যারোমা বা আয়ুর্বেদিক মাসাজ ক্র্যাম্প ও মুড সুইং কমাতে সাহায্য করে।

  • চামড়ার টান ও স্ট্রেচ মার্কস: তেল মাসাজ ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।

  • হরমোন ভারসাম্য রক্ষা: মাসাজ এন্ডোক্রাইন সিস্টেমকে রিল্যাক্স করে, হরমোন রিলিজের প্রাকৃতিক ছন্দ বজায় রাখে।


পুরুষদের জন্য উপকারিতা

  • দীর্ঘ সময় জিম বা ফিল্ডওয়ার্কে ক্লান্ত পেশী শিথিল হয়।

  • পিঠ, ঘাড় ও কাঁধের টান কমে, যা অফিসে কাজ করা পুরুষদের সাধারণ সমস্যা।

  • বডি মাসাজ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে ও স্লিপ কোয়ালিটি উন্নত করে।

  • শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধার হয়, ফলে ফিটনেস লেভেল বৃদ্ধি পায়।


ঘরে বসে সহজ মাসাজ টিপস

১. তেল বাছাই করুন: নারকেল তেল গরম আবহাওয়ার জন্য, সরিষা তেল শীতে, আর বাদাম তেল সব ঋতুতেই উপযুক্ত।
২. হালকা গরম করুন: তেল হালকা গরম করে ব্যবহার করলে ত্বকে ভালোভাবে মিশে যায়।
৩. বৃত্তাকার গতিতে মাসাজ: ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে মৃদু চাপ দিয়ে বৃত্তাকারভাবে ঘষুন।
৪. পায়ের তলায় বিশেষ যত্ন: রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে মাসাজ করলে ঘুম ভালো হয় ও স্নায়ু শান্ত থাকে।
৫. পরিশেষে গরম জলে স্নান: তেল শোষণের পর গরম জলে স্নান করলে শরীর হালকা ও পরিষ্কার লাগে।


স্পা বা পেশাদার মাসাজের অভিজ্ঞতা

একটি প্রশান্তিপূর্ণ পরিবেশ, হালকা সুর, অ্যারোমার গন্ধ, নরম আলো এই সব মিলিয়ে পেশাদার মাসাজ থেরাপি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। থেরাপিস্টের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় শরীর যেন সুরের তালে তালে খুলে যায়। অনেক সময় হট অয়েল, স্টোন, বা হার্বাল পাউডার ব্যবহার করা হয়, যা আরও গভীর রিল্যাক্সেশন দেয়। আধুনিক শহুরে জীবনে এই অভিজ্ঞতা যেন শরীর ও মনের জন্য এক ‘ডিটক্স রিচুয়াল’।


বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বডি মাসাজ

বিজ্ঞানীরা বলেন, মাসাজ শরীরের ‘লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম’ সক্রিয় করে টক্সিন বের করে দেয়। রক্তচাপ, হার্টবিট ও কর্টিসল মাত্রা কমে যায়। এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে—মাত্র ৩০ মিনিটের মাসাজেও মানুষের স্ট্রেস লেভেল ২৫% কমে এবং ‘হ্যাপিনেস হরমোন’ প্রায় দ্বিগুণ হয়।


কিছু সতর্কতা

  • জ্বর, ইনফেকশন, বা ত্বকের ঘা থাকলে মাসাজ এড়িয়ে চলুন।

  • গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শে করুন।

  • অ্যালার্জি থাকলে তেল ব্যবহার করার আগে প্যাচ টেস্ট করুন।

  • অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে পেশী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টই শ্রেয়।

বডি মাসাজ কেবল বিলাসিতা নয়, এটি এক বিজ্ঞানসম্মত যত্নের প্রক্রিয়া। এটি শরীরের ক্লান্তি দূর করে, মনকে প্রশান্ত করে ও আত্মাকে সতেজ করে তোলে। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত মানুষ এই ছোঁয়ার জাদুকেই বিশ্বাস করেছে। যেমন আয়ুর্বেদ বলে “অভ্যঙ্গং চ স্বাস্থ্যকরম্‌” অর্থাৎ বডি মাসাজই হলো সুস্থ জীবনের পথ। তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখুন। নিজের শরীরের প্রতি একটু যত্ন, একটু ভালোবাসা এই ছোট্ট রিচুয়ালেই লুকিয়ে আছে জীবনের শান্তি ও সুস্থতার আসল ম্যাজিক। 

Archive

Most Popular