19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মেঘ, কুয়াশা আর উত্তরবঙ্গ!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


শীতের সকালে জানলার বাইরে তাকালেই দেখা যায় এক ধূসর জগৎ মাটির কাছ ঘেঁষে নামা কুয়াশা, দূরে পাহাড়ের কোলে ঝুলে থাকা মেঘের পরত, আর তার ভেতর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলা এক চিলতে ট্রেন। এই দৃশ্যের নাম উত্তরবঙ্গ। মেঘ আর কুয়াশা যেন এখানে প্রকৃতির দু’টি অঙ্গ  কখনও তারা রহস্যে ভরিয়ে তোলে ডুয়ার্সের অরণ্য, কখনও আলতো পরশে ঢেকে দেয় দার্জিলিং বা কালিম্পংয়ের পথঘাট।উত্তরবঙ্গের সৌন্দর্য শুধু তার পাহাড়ে নয়, তার ভেতরের মেজাজে। এখানে প্রকৃতি প্রতিদিন নিজের রং বদলায় সকালে কুয়াশার সাদা, দুপুরে চা-বাগানের সবুজ, আর বিকেলে পাহাড়ের গায়ে মেঘের ছায়া।


বাংলার উত্তর প্রান্তের এই অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে অনন্য। পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে ভুটান ও সিকিম, পূর্বে আসাম চারদিকের পাহাড়ি প্রান্তরের মাঝে উত্তরবঙ্গ যেন এক সবুজ উপত্যকা। এখানকার বড় নদীগুলি তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা, কালজানি, পাহাড় থেকে নেমে সমতলে ছুটে গেছে জীবনের ছন্দ বয়ে নিয়ে।


এই অঞ্চলের জলবায়ু উপক্রান্তীয় হলেও পাহাড়ি এলাকায় শীত বেশ দীর্ঘ ও শীতল। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানকার সকাল শুরু হয় ঘন কুয়াশায়। ভোরের আলো ভেদ করে দেখা যায় না এক হাত দূরের পথও। আর বর্ষাকালে? তখন মেঘ পাহাড় ছুঁয়ে নামে, জলবায়ু হয় স্যাঁতস্যাঁতে, আকাশে খেলা করে অসংখ্য মেঘের গালিচা। উত্তরবঙ্গ মানেই প্রথমেই মনে পড়ে দার্জিলিং রাণী পাহাড়। এখানে মেঘের রূপ যেন প্রতিদিন বদলে যায়। ভোরে যখন সূর্যের প্রথম রশ্মি কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে পড়ে, তখন মেঘগুলো যেন সোনালি ধোঁয়ায় মিশে যায়। দুপুরে সেগুলো আবার শহরের গলি গলি ঘুরে বেড়ায়, চা-বাগানের মাথায় বসে বিশ্রাম নেয়।


কালিম্পং একটু অন্যরকম এখানে মেঘ আসে ধীরে ধীরে, ঘন কুয়াশার সঙ্গে হাত মেলায়। শহরের পথে হাঁটলে মনে হয়, কেউ যেন তুলো ভিজিয়ে মাটির ওপরে বিছিয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের কোলে থাকা মঙ্কার মন্দির থেকে ভেসে আসে ঘণ্টার শব্দ, আর তার ভেতর হারিয়ে যায় মেঘের দল।পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত ডুয়ার্স অঞ্চল লাটাগুড়ি, মাদারিহাট, চা-বাগান, বন ও নদী মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত সৌন্দর্য। এখানে শীতের কুয়াশা শুধু প্রকৃতিকে নয়, মানুষকেও ঢেকে ফেলে এক অচেনা আবেশে। ভোরবেলা যখন সূর্যের আলো কুয়াশার পর্দা ছিঁড়ে পড়ে গাছের গায়ে, তখন প্রতিটি শিশিরবিন্দুতে ঝলমল করে ওঠে রূপকথা।


গরুমারা, জলদাপাড়া, চিলাপাতা এই নামগুলো শুধু বন নয়, কুয়াশার রাজ্যও। শীতের সকালে গরুমারার পথে হাঁটলে হঠাৎ সামনেই উঠে দাঁড়ায় এক গন্ডার বা হাতির ছায়া কুয়াশার ভিতর থেকে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে জঙ্গল।

ডুয়ার্সের কুয়াশা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকেও মিলিয়ে দেয়, মানুষও যেন এই কুয়াশার অংশ হয়ে যায়।

উত্তরবঙ্গের নদীগুলো যেন কুয়াশার সঙ্গে চিরপরিচিত।

ভোরবেলা তিস্তা নদীর তীরে দাঁড়ালে দেখা যায়, জল আর কুয়াশা একাকার হয়ে গেছে। দূরের পাহাড়ের রূপরেখা প্রায় অদৃশ্য শুধু জল, হাওয়া, আর ভেসে থাকা মেঘের কণা। এই সৌন্দর্যের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি আছে, এক অন্তর্মুখী ভাব।


চা-বাগানের শ্রমিকেরা তখন কাজে বেরিয়ে পড়েছেন মাথায় গামছা, হাতে বাঁশের ঝুড়ি। কুয়াশা পেরিয়ে তাদের হাঁটতে দেখা যায় যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম।

উত্তরবঙ্গের মানুষ মেঘ আর কুয়াশার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বেঁচে থাকে। তাদের জীবনে প্রকৃতির পরিবর্তন মানে শুধু আবহাওয়া নয়, জীবনযাত্রারও পরিবর্তন।

চা-বাগানের শ্রমিকরা কুয়াশার ভেতর দিন শুরু করেন গরম চা হাতে নিয়ে।

কৃষকরা ভোরের মেঘে ভেজা মাটিতে কাজ করেন, কারণ তারা জানেন এই কুয়াশাই তাদের ফসলের সুরক্ষা। পাহাড়ি হোটেলের মালিকেরা জানেন, ডিসেম্বরের ঘন মেঘ মানেই পর্যটকের ভিড়। প্রকৃতি এখানে কেবল দৃশ্য নয়, জীবনের অংশ।


মেঘ আর কুয়াশার টানেই পর্যটকেরা ভিড় করেন উত্তরবঙ্গে। দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, রিশপ, লেপচাজগত, তাবাক প্রতিটি জায়গা যেন আলাদা মেজাজের। অনেকে বলেন, “দার্জিলিংয়ে সূর্যোদয় না দেখলে প্রেম অসম্পূর্ণ থেকে যায়।” আবার মিরিকের লেকের ধারে বসে কুয়াশা নামার মুহূর্তে মনে হয়, সময় থেমে গেছে। ডুয়ার্সের হোমস্টে গুলিতে সকালে যখন কুয়াশা জানলার কাচে ঠেকে, তখন তার সঙ্গে মিশে যায় সোঁদা গন্ধ, চা-পাতার সুবাস, আর পাখির ডাক। এই মেঘ-কুয়াশার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে উত্তরবঙ্গের রোমান্স।


বাংলা সাহিত্যেও উত্তরবঙ্গের মেঘ-কুয়াশা এক বিশেষ স্থান পেয়েছে।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “আরণ্যক”-এ উত্তরবঙ্গের বনভূমির নীরবতা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় পাহাড়ের মেঘ, বা বুদ্ধদেব গুহর গল্পে ডুয়ার্সের কুয়াশা সবই এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক আবেগকে অমর করে রেখেছে। অনেকে বলেন, উত্তরবঙ্গ মানেই “কবিতার দেশ” যেখানে প্রতিটি সকাল একটি নতুন স্তবক, আর প্রতিটি সন্ধ্যা এক অপূর্ণ প্রেমের উপসংহার।


উত্তরবঙ্গের উৎসব ও লোকসংস্কৃতিতেও মেঘ-কুয়াশার প্রভাব স্পষ্ট।ভুটিয়া ও লেপচা সম্প্রদায়ের গীতিতে মেঘের আহ্বান শোনা যায়। তামাংদের নাচে কুয়াশার সাদা চাদর যেন প্রতীক হয়ে ওঠে নতুন দিনের সূচনা।চা-বাগানের শ্রমিকদের গান “হিলি হিলি চা পাত তোলো...” যেন কুয়াশা ছুঁয়ে বয়ে যায়। প্রতিটি সুরে, প্রতিটি ছন্দে প্রকৃতির স্পন্দন মিশে আছে।


তবে আজকের উত্তরবঙ্গের মেঘ-কুয়াশা আগের মতো স্থির নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টি ও কুয়াশার ধরণেও এসেছে অস্বাভাবিকতা। যেখানে আগে নভেম্বর থেকেই ঘন কুয়াশা নামত, সেখানে এখন ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

চা-বাগানে ফসলের উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়ছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, “মেঘ কমে গেলে দার্জিলিংয়ের মেজাজই ফিকে হয়ে যায়।” এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা আজ জরুরি— কারণ প্রকৃতি যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে উত্তরবঙ্গের সৌন্দর্যও হারিয়ে যাবে তার চিরচেনা ছন্দ।


উত্তরবঙ্গ শেখায় ধৈর্য আর প্রত্যাশা। এখানকার মানুষ জানে আজ যদি মেঘে ঢেকে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাল সে আবার সোনালি আলোয় ফুটে উঠবে। এই অপেক্ষার ভেতরেই জীবনের দর্শন অন্ধকারের পরেই আসে আলো, কুয়াশার পরেই দেখা দেয় আকাশ! উত্তরবঙ্গ মানে শুধু ভৌগোলিক একটি অঞ্চল নয়, এটি এক অনুভবের নাম— যেখানে মেঘ, কুয়াশা আর মানুষের জীবন মিশে যায় একসূত্রে।

এই ভূমি আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই সত্যিকার সৌন্দর্য।

মেঘে ঢেকে থাকা পাহাড় যেমন প্রকৃতির রহস্য, তেমনি কুয়াশায় ঢাকা সকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবনের কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। তাই উত্তরবঙ্গ মানে কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা এক স্বপ্ন, মেঘের ছায়ায় ভিজে থাকা এক চিরন্তন কবিতা।

Archive

Most Popular