স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
ট্রেন্ডে যখন ক্রিয়েটিভ থেরাপি
আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা বা আত্মবিশ্বাসহীনতা যেন নিত্যসঙ্গী। কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা, সম্পর্ক বা সামাজিক অবস্থানসব কিছুতেই যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। এর মধ্যেই নিজের মনের ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। ঠিক সেই সময়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘ক্রিয়েটিভ থেরাপি’ বা সৃজনশীল থেরাপি—যেখানে শিল্প, সংগীত, নৃত্য, লেখা, বা এমনকি রান্নাও হয়ে উঠতে পারে মনের ওষুধ।
কী এই ক্রিয়েটিভ থেরাপি?
ক্রিয়েটিভ থেরাপি হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতি, চিন্তা, বা যন্ত্রণাকে প্রকাশ করে শিল্প বা সৃজনশীলতার মাধ্যমে। এটি শুধুমাত্র আঁকা বা গান নয়—এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কবিতা লেখা, হস্তশিল্প, নাটক, নৃত্য, ফটোগ্রাফি, এমনকি গল্প বলাও। উদ্দেশ্য একটাই মনের গভীরে জমে থাকা চাপ ও নেতিবাচক ভাবনাকে মুক্ত করা, আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মস্তিষ্ক যখন কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হয়, তখন ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো সুখ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা উদ্বেগ কমিয়ে দেয় এবং মনকে প্রশান্ত করে।
বিভিন্ন রকম থেরাপি:
১. আর্ট থেরাপি:
রঙ, আকার, রেখা—সবই এখানে এক একটি ভাষা। যারা কথা দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না, তাঁরা তুলি বা রঙের মাধ্যমে নিজের মনের কথা বলেন। অনেক শিশু ও বয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে এটি মানসিক সুস্থতার এক কার্যকর পথ।
২. মিউজিক থেরাপি:
সংগীত মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মানসিক আঘাত বা ডিপ্রেশন কাটাতে সংগীত থেরাপি ব্যবহার করা হয় বিশ্বজুড়ে। যন্ত্রসঙ্গীত শোনা, বাজানো বা গাওয়া—সবকিছুই এই থেরাপির অংশ।
৩. ডান্স মুভমেন্ট থেরাপি:
শরীরের নড়াচড়া, ভঙ্গি ও রিদমের মাধ্যমে মনোভাব প্রকাশ করা হয় এই থেরাপিতে। যারা ট্রমা বা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন, তাঁদের জন্য নাচের মুক্তি হতে পারে আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর।
৪. রাইটিং থেরাপি: নিজের মনের ভাব কাগজে লেখা ডায়েরি, কবিতা, বা চিঠির মাধ্যমে মানুষকে নিজের আবেগ চিনতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত লেখার অভ্যাস আত্মবিশ্বাস বাড়ায় ও মানসিক চাপ কমায়।
৫. ড্রামা বা রোল-প্লে থেরাপি: এখানে চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষ নিজের ভয়, ক্রোধ বা দুঃখের মুখোমুখি হয়। থিয়েটার গ্রুপ বা থেরাপি সেশনে এটি ব্যবহার করা হয় ব্যক্তিত্ব বিকাশে।
কেন এখন ট্রেন্ডে ক্রিয়েটিভ থেরাপি?
আজকের প্রজন্ম নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, অনলাইন আর্ট-থেরাপি ক্লাস, কিংবা ‘হিলিং থ্রু ক্রিয়েটিভিটি’ কর্মশালা—সবই মানুষকে এই থেরাপির প্রতি আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে, যখন নিঃসঙ্গতা ও উদ্বেগ বেড়েছে, তখন ক্রিয়েটিভ থেরাপি অনেকের কাছে আত্মমুক্তির দরজা খুলে দিয়েছে। অনেকে বলেন, “আমরা শুধু সারাতে চাই না, আমরা আবার নিজের ভেতরে শান্তি খুঁজতে চাই।” এই শান্তি খোঁজার যাত্রাতেই সৃষ্টিশীলতা হয়ে উঠেছে পথপ্রদর্শক।
বিশেষজ্ঞদের মত
মনোবিজ্ঞানী ডঃ সোনালি দত্ত জানান,
> “ক্রিয়েটিভ থেরাপি শুধু মানসিক রোগের চিকিৎসা নয়, এটি আত্মবিকাশেরও মাধ্যম। যারা নিয়মিত কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি দেখা যায়।”
অন্যদিকে আর্ট থেরাপিস্ট ঈশা সেনের মতে,
> “রঙ বা শব্দ যখন আবেগের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন মন নিজের নিরাময়ের পথ খুঁজে নেয়। থেরাপিস্ট কেবল সেই পথে আলোকবর্তিকা।”
স্কুল, কর্পোরেট অফিস, এমনকি হাসপাতালেও এখন ক্রিয়েটিভ থেরাপি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। শিশুদের মানসিক বিকাশে, প্রবীণদের বিষণ্ণতা দূর করতে কিংবা নারী স্বনির্ভরতা প্রকল্পে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষত এই থেরাপি আত্মপ্রকাশের এক নিরাপদ জায়গা তৈরি করে যেখানে তাঁরা বিচারভীতিহীনভাবে নিজের অভ্যন্তরীণ সত্তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। মানুষের মনের ক্ষত প্রায়ই অদৃশ্য। ওষুধে দেহ সারানো যায়, কিন্তু মনকে সারাতে প্রয়োজন ভালোবাসা, সৃষ্টিশীলতা ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা। সেই কারণেই আজ ক্রিয়েটিভ থেরাপি কেবল এক ‘ট্রেন্ড’ নয়, এটি এক নতুন যুগের মানসিক আন্দোলন যেখানে মানুষ শেখাচ্ছে, “নিজেকে বোঝাও, নিজেকে ভালোবাসো, আর নিজের সৃষ্টিতে খুঁজে নাও শান্তি।”