স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
মাতৃত্ব এক মহৎ ও প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা। তবে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর গর্ভধারণ করলে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। বর্তমান সময়ে শিক্ষা, ক্যারিয়ার, আর্থিক স্থিতি, এবং জীবন পরিকল্পনার কারণে অনেক নারী ৩৫ বছর বা তার পর গর্ভধারণ করছেন, যা আগে সমাজে খুব একটা দেখা যেত না। যদিও এটা একাধারে স্বাধীনতার প্রতিফলন, তেমনি রয়েছে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, যা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
প্রাচীনকাল:
প্রাচীন সমাজে মেয়েদের অল্প বয়সেই (১৫-২০ বছরের মধ্যে) বিয়ে ও সন্তান ধারণ ছিল প্রচলিত। বেশি বয়সে মাতৃত্ব ছিল বিরল এবং সমাজে অনেক সময় তা অস্বাভাবিক বলে মনে করা হতো।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী:
শিক্ষার প্রসার, নারীর কর্মসংস্থান ও নারীবাদের উত্থানের ফলে ২০শ শতকে নারীরা পরিবার শুরু করার সিদ্ধান্তকে বিলম্বিত করতে শুরু করেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে ৩০ বছর বা তার পর মা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
ভারতের প্রেক্ষাপট:
ভারতেও ১৯৯০-এর দশক থেকে শহরাঞ্চলে নারীরা ক্যারিয়ার ও আর্থিক স্থিতি অর্জনের পর মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন। এতে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ে, তবে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি না থাকলে ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বর্তমানে:
উন্নত চিকিৎসা, IVF ও ফার্টিলিটি প্রযুক্তির কারণে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে সন্তান ধারণ সম্ভব হলেও, ঝুঁকিগুলো এখনও বিদ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) ৩৫-এর পরে গর্ভধারণকে "অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ" বলে অভিহিত করেছে।
বেশি বয়সে মাতৃত্ব (সাধারণত ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে প্রথমবার মা হওয়া) বর্তমান যুগে অনেক নারীর জন্য স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের মধ্যে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এতে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতিকর দিক রয়েছে মায়ের দিক থেকেও এবং শিশুর দিক থেকেও।
নিচে বিষয়টির প্রধান ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
গর্ভধারণে জটিলতা:
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর গুণমান ও পরিমাণ কমে যায়।
ফলস্বরূপ, গর্ভধারণে দেরি বা বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গর্ভকালীন জটিলতা:
উচ্চ রক্তচাপ (প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া)
গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (গর্ভাবস্থায় হওয়া ডায়াবেটিস)
গর্ভপাত বা মৃতভ্রুণ হওয়ার আশঙ্কা
সিজারিয়ানের সম্ভাবনা বেশি:
বেশি বয়সে প্রাকৃতিক প্রসব কঠিন হয়ে পড়ে, তাই অনেক সময় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।
জরায়ুর জটিলতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা:
বয়সজনিত কারণে হরমোন ভারসাম্যহীনতা বা অন্যান্য গাইনোকলজিক সমস্যা থাকতেই পারে।
জেনেটিক সমস্যা:
বেশি বয়সে মাতৃত্বে শিশুদের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম বা অন্যান্য ক্রোমোজোমজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
প্রিম্যাচিউর (অকাল) জন্ম ও কম ওজন:
শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে সমস্যা হতে পারে।
জন্মের পর নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যা:
ভাষা, বুদ্ধিমত্তা বা আচরণগত বিকাশে দেরি হতে পারে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা, নিয়মিত প্রি-নাটাল কেয়ার, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবান জীবনযাপনের মাধ্যমে এই ঝুঁকিগুলোর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই বেশি বয়সে মাতৃত্ব মানেই বিপদ নয়, তবে এটি নিরাপদ রাখতে হলে অতিরিক্ত সচেতনতা ও চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি বয়সে মাতৃত্ব আজ আর অস্বাভাবিক নয়, বরং অনেক সময় তা পরিকল্পিত, সচেতন সিদ্ধান্তের ফল। তবে এই বয়সে গর্ভধারণ করলে শারীরিক প্রস্তুতি, পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সচেতনতা ও আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে সুস্থ মাতৃত্ব সম্ভব। তাই এই বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা ও স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসার একান্ত প্রয়োজন।