19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

একাকিত্বের অবসর

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



অফিস, পরিবার, সম্পর্ক সব দায়িত্বের ঘূর্ণির মধ্যে হারিয়ে যায় আমাদের নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্তগুলো। জীবনের ব্যস্ত রুটিনে একসময় এসে দেখা দেয় নিঃসঙ্গতা, আবার অনেক সময় সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই জন্ম নেয় নতুন এক অবসর যেখানে মানুষ নিজেকে খুঁজে নেয়, নিজের ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতির সঙ্গে একান্তে সময় কাটায়। এই ‘একাকিত্বের অবসর’-এর গল্প আজ অনেকেরই জীবনের অঙ্গ।


একাকিত্ব মানেই কি নিঃসঙ্গতা?


আমাদের সমাজে “একাকিত্ব” শব্দটির সঙ্গে প্রায়ই জুড়ে দেওয়া হয় বিষণ্ণতার ছাপ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, একাকিত্ব সবসময় নেতিবাচক নয়। এটি হতে পারে আত্মমগ্নতার এক পরিণত রূপ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের কণ্ঠ শুনতে শেখে।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একাকিত্বের মুহূর্ত মানুষকে দেয় আত্মসমীক্ষার সুযোগ। ক্রমাগত বাইরের জগতের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই নিজের ভেতরেও একটা বিশাল জগৎ আছে।


একাকিত্ব মানে একলা থাকা নয়, বরং নিজের সঙ্গে থাকা। একাকিত্বের রূপ সব বয়সে এক নয়। কৈশোরে, এটি হয়তো হয় বন্ধুর অভাব বা নিজের পরিচয় খোঁজার অস্থিরতা। মধ্যবয়সে, এটি হয়ে ওঠে ক্লান্তি আর দায়িত্বের ভেতর নিজের হারিয়ে যাওয়ার প্রতিচ্ছবি।


বৃদ্ধাবস্থায়, এটি নেমে আসে নিঃশব্দ সঙ্গী হয়ে সন্তানদের দূরবাস, অবসরপ্রাপ্ত জীবনের একঘেয়েমি বা সঙ্গীহীন সময়ের ভারে। কিন্তু প্রতিটি বয়সেই এই একাকিত্বকে যদি দেখা যায় এক ধরনের সৃজনশীল অবসর হিসেবে, তবে জীবন অনেক বেশি পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একাকিত্ব অনেক সময়েই সৃষ্টির জননী। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা অসংখ্য শিল্পীর জীবনে একাকিত্বই হয়ে উঠেছে প্রেরণার উৎস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের নিসর্গে একা বসে লিখেছিলেন অসংখ্য গান ও কবিতা। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ নিজের নিঃসঙ্গ সময়েই আঁকেন পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত চিত্রগুলো।


আজকের দিনেও অনেক মানুষ এই ‘একাকিত্বের অবসর’-কেই বেছে নিচ্ছেন নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য, কেউ শুরু করছেন পেইন্টিং, কেউ লিখছেন দিনলিপি, কেউ গাছ লাগাচ্ছেন, কেউ শিখছেন মেডিটেশন। এইসব কর্মকাণ্ড শুধু সময় কাটানোর উপায় নয়, বরং নিজের ভিতরকার শান্তি খুঁজে পাওয়ার পথ।


আজকের যুগে আমরা সবাই connect থাকি সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও কল, মেসেজিং অ্যাপ দিয়ে। তবু কেন এত মানুষ বলে, “আমি একা”?

কারণ, ডিজিটাল যোগাযোগ অনেক সময় আবেগের সংযোগ তৈরি করে না। বাহ্যিক কোলাহলের মধ্যে ভেতরের শূন্যতা আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক ক্লান্তি, তুলনামূলক অবসাদ ও আত্মঅবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ফলে ‘একাকিত্বের অবসর’ যা একসময় ছিল প্রশান্তির তা আজ অনেকের কাছে একরকম অস্থিরতার নাম। তবে সচেতনভাবে সময় বেছে নেওয়া যেখানে মোবাইল, নোটিফিকেশন, স্ক্রিন থেকে দূরে থেকে নিজের সঙ্গে কথা বলা, এই চর্চা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।


একাকিত্বকে ভয় না পেয়ে, বরং এটিকে নিজের উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিছু সহজ উপায় এখানে দেওয়া হলো:


নিজেকে সময় দিন।প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা মোবাইল বা টেলিভিশন ছাড়া নিজের সঙ্গে সময় কাটান। চুপচাপ বসে থাকুন, জানালার বাইরে তাকান, একটা কফির কাপ নিয়ে ভাবুন জীবনে কী চান, কী পেয়েছেন, আর কী পরিবর্তন আনতে চান।


নতুন কিছু শেখা শুরু করুন। অবসর মানে থেমে থাকা নয়। এটি শেখার সময়। নতুন ভাষা, বাদ্যযন্ত্র, রান্না, বা লেখালিখি যেকোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুন।


প্রকৃতির সংস্পর্শে আসুন। গাছের সঙ্গে সময় কাটানো, হাঁটতে যাওয়া, বাগান করা এসব ক্রিয়াকলাপ একাকিত্ব দূর করার অন্যতম উপায়।


লিখে ফেলুন আপনার অনুভূতি। দিনলিপি লেখা বা ছোট নোট রাখা মানসিক চাপ কমায়। লিখতে লিখতেই অনেক অমীমাংসিত ভাবনা মুছে যায়।


নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। নিজেকে ছোট করবেন না। একাকিত্ব কোনো ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। এটি নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার আহ্বান।


কলকাতার মনোবিদ ড. রীতা ভট্টাচার্য বলেন,


> “মানুষ একা থাকলে নিজের অনুভূতিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শেখে। তবে এই সময়টাকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে সেটি অবসাদে রূপ নিতে পারে। তাই একাকিত্বকে নেতিবাচক না ভেবে আত্মসমীক্ষার সময় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।”


তিনি আরও জানান,


> “সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি হলেও, মানসিক শান্তির জন্য প্রত্যেকেরই কিছু ‘নিজস্ব সময়’ থাকা দরকার। সেটাই আসল অবসর।”


আজকের অনেক নারী যাঁরা একা থাকেন, বা সন্তানরা দূরে থাকে তাঁরা একাকিত্বকে জীবনের অন্তিম নয়, বরং নতুন শুরু হিসেবে গ্রহণ করছেন।

কে-জনী আবার শুরু করেছেন অনলাইন ক্লাস নিয়ে শিক্ষাদান, কেউ বাগান করে সুখ খুঁজে পেয়েছেন, কেউ আবার রান্নার ব্লগ বা ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন।এই একাকিত্ব তাঁদের ক্লান্ত করেনি, বরং দিয়েছে নতুন পরিচয়ের সন্ধান।


অনেক সাধক, যোগী বা দার্শনিক একাকিত্বকেই বেছে নিয়েছেন জ্ঞানের পথ হিসেবে। একা থাকা তাঁদের কাছে ছিল মন-প্রশান্তির সাধনা। আজকের মানুষও ধ্যান, যোগ, প্রার্থনা বা নিঃশব্দ প্রার্থনার মাধ্যমে খুঁজে নিতে পারেন সেই শান্তি।একাকিত্বের অবসরে মনের দরজা খুলে যায়—যেখানে ঈশ্বর, প্রকৃতি আর আত্মার মিলন ঘটে নিঃশব্দে।


যেখানে সমাজ একাকিত্বকে ‘দুঃখ’ হিসেবে দেখে, সেখানে আসলে এটি হতে পারে নিজেকে চেনার সবচেয়ে সুন্দর সময়।

একজন মানুষ যখন নিজের সঙ্গে কথা বলতে শেখে, তখন সে বাইরের সবকিছুর মূল্য আরও ভালোভাবে বোঝে। একাকিত্ব শেখায় অপেক্ষার মানে, সময়ের মূল্য, সম্পর্কের গভীরতা, এবং নিজের মনের প্রতি দায়বদ্ধতা। একাকিত্বের অবসর কোনো শূন্য সময় নয়, বরং জীবনের এক নীরব সুর যেখানে মানুষ নিজের ভিতরকার আলোকে চিনতে শেখে। এ এক শান্ত সময়, যেখানে কোলাহল নেই, শুধু আছে মনন, সৃজন, এবং আত্মপ্রত্যয়ের স্বর। তাই একাকিত্বকে ভয় পাবেন না। বরং একে ভালোবেসে নিজের জীবনের অংশ করে নিন। কারণ, এই একাকিত্বই একদিন আপনাকে শেখাবে

“ভেতরের নীরবতাতেও গান বাজে, যদি মন শুনতে চায়।”

Archive

Most Popular