স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শীতের মৌসুম শুরু হলেই আমাদের লাইফস্টাইলে বেশ কিছু পরিবর্তন চলে আসে। ঠান্ডা বাতাস, কম তাপমাত্রা, রোদ কম পাওয়া সব মিলিয়ে শরীরের সঙ্গে ত্বকের ওপরেও এর বিশেষ প্রভাব পড়ে। শীতে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় ত্বকের ন্যাচারাল ময়েশ্চার দ্রুত হ্রাস পায়। ফলে ত্বক হয়ে পড়ে রুক্ষ, শুষ্ক, টানটান ও নিস্তেজ। বিশেষ করে যাদের ড্রাইস্কিন, তাদের সমস্যা আরও প্রকট হয়। এ সময় অনেকেই বাহ্যিক যত্ন যেমন ময়েশ্চারাইজার, লিপ বাম, নানারকম কসমেটিক ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, কেবল বাইরে কিছু লাগালেই ত্বক সুস্থ থাকে না; বরং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা আসে ভেতর থেকে পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে। সেই ভেতরের পুষ্টির সেরা উৎস হলো মৌসুমি ফল। শীতকাল এমন কিছু ফল নিয়ে আসে, যেগুলোতে থাকে অসাধারণ স্কিন-ফ্রেন্ডলি উপাদান। এই ফলগুলোর নিয়মিত গ্রহণ ত্বককে শুধু উজ্জ্বলই করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে রাখে সুস্থ, তরুণ ও টাইট।
শীতের ফলগুলো বিশেষ করে ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফলিক অ্যাসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, ফাইবার ও নানারকম ফাইটোনিউট্রিয়েন্টে সমৃদ্ধ। এই উপাদানগুলো ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়। কোলাজেন কমতে থাকলে ত্বক ঢিলে হয়ে যায় এবং বলিরেখা দেখা দেয়। শীতের ফল ত্বকের এই ন্যাচারাল কোলাজেন ধরে রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। ফলে এন্টি-এজিং প্রক্রিয়া ধীর হয়। পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি-র্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে স্কিনকে রক্ষা করে। শহরের দূষণ, স্ট্রেস, কম ঘুম সব মিলিয়ে শরীরে যে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়, তা ত্বকের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। শীতের ফল তা থেকে স্কিনকে সুরক্ষা দেয়।
শীতকালে জল খাওয়ার প্রবণতা কম থাকে, কারণ শরীর থেকে ঘাম কম বের হয়। ফলে শরীরের হাইড্রেশন লেভেল কমতে থাকে। অনেকেই এই বদলের জন্য বুঝতেও পারেন না যে ত্বকের শুষ্কতার একটি প্রধান কারণ হলো শরীরের জলশূন্যতা। শীতের ফল যেমন কমলা, মাল্টা, আঙুর, ড্রাগনফ্রুট, কিউই এগুলোতে রয়েছে প্রাকৃতিক জল। তাই এগুলো স্কিনকে স্বাভাবিকভাবেই হাইড্রেটেড রাখে। হাইড্রেশন ঠিক থাকলে ত্বক চকচকে দেখায়, রুক্ষতা কমে এবং নরম থাকে।
ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল শীতের সময়ে বেশি পাওয়া যায়। যেমন কমলা ও মাল্টা। এদের মধ্যে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড ত্বকের পিগমেন্টেশন কমাতে ভূমিকা রাখে। যাদের ত্বকে দাগ, ফ্রিকলস, ব্ল্যাক স্পট বা অ্যাকনের দাগ রয়েছে, তাদের জন্য এই ফল অত্যন্ত কার্যকর। একই সঙ্গে কমলার খোসায় এমন উপাদান আছে যা স্কিন এক্সফোলিয়েশনে সাহায্য করে। অনেকেই কমলার খোসা শুকিয়ে পাউডার বানিয়ে ফেস প্যাক হিসেবে ব্যবহার করেন যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। ফলে কমলা খাওয়া ও স্কিনে প্রয়োগ দুইভাবেই স্কিন গ্লো পেতে সাহায্য করে।
আপেল শীতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ফল। এতে রয়েছে ভিটামিন ই, যা ত্বকের প্রাকৃতিক ময়েশ্চার ধরে রাখতে সাহায্য করে। আপেল ত্বকের ওপর বাহ্যিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধে সক্ষম। নিয়মিত আপেল খেলে স্কিন আরও টাইট দেখায় এবং বয়সের ছাপ কম লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া আপেলের ফাইবার শরীরের ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে, ফলে ভেতর থেকে স্কিন পরিস্কার হয় ও গ্লো প্রকাশ পায়। আপেলের পেস্ট সামান্য দুধ মিশিয়ে ফেসে লাগালে ত্বক হয় রিফ্রেশড ও সফট।
আঙুর শীতের একটি অত্যন্ত স্কিন-ফ্রেন্ডলি ফল। এতে থাকে রেসভেরেট্রল নামক একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বকের কোষ পুনর্নির্মাণে সাহায্য করে। ফলে ত্বক ভিতর থেকে নতুন হয়ে ওঠে। পাশাপাশি আঙুর ডিটক্সিফায়ার হিসেবেও দারুণ কাজ করে। ফলে যারা ধুলোবালির পরিবেশে থাকেন, তাদের জন্য আঙুর বিশেষ উপকারী। আঙুরের রস ত্বকে প্রয়োগ করলে স্কিন ইনস্ট্যান্ট উজ্জ্বল দেখায় এবং ক্লান্ত ভাব দূর হয়।
কিউই ফল দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই ত্বকের জন্য উপকারী। এতে রয়েছে ভিটামিন সি ও ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা ত্বকের ইনফ্লেমেশন কমায়। শীতের ঠান্ডায় যাদের স্কিন লাল হয়ে যায়, কিউই তাদের জন্য উপকারী। এই ফল শরীরকে দ্রুত হাইড্রেটও করে। নিয়মিত কিউই খেলে ত্বকের গঠন দৃঢ় হয় ও স্কিন আরও মসৃণ দেখায়।
স্ট্রবেরি শীতের অন্যতম জনপ্রিয় ফল। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর এই ফল স্কিনকে মুহূর্তে সতেজ করে তোলে। ব্রণপ্রবণ ত্বকে স্ট্রবেরি বিশেষ কার্যকর, কারণ এতে থাকা স্যালিসিলিক অ্যাসিড রোমছিদ্র খুলে দেয়। স্ট্রবেরি খেলে অভ্যন্তরীণভাবে যেমন উপকার হয়, তেমনই পেস্ট করে মুখে লাগালে ব্ল্যাকহেডস ও অ্যাকনে সমস্যা কমে। ত্বক হয় উজ্জ্বল ও ক্লিন।
শীতকালে সহজলভ্য আরেক ফল হলো কলা। এতে আছে পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি৬ যা বিশেষভাবে ড্রাইস্কিনের জন্য উপকারী। যারা খুবই শুষ্ক ত্বকের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের খাদ্যতালিকায় কলা অবশ্যই থাকা উচিত। কলা ত্বকের ন্যাচারাল স্মুথনেস ফিরিয়ে আনে এবং রুক্ষভাব দূর করে। আবার কলার পেস্টে অ্যালোভেরা মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বক দ্রুত নরম হয়।
আনারসেও রয়েছে একটি বিশেষ এনজাইম ব্রোমেলিন, যা মৃত ত্বক কোষ তুলে ফেলে স্কিন পরিষ্কার রাখে। তবে আনারস ব্যবহার করতে হয় সাবধানে, কারণ এতে অ্যাসিডের মাত্রা বেশি। সেনসিটিভ স্কিনে সরাসরি লাগালে জ্বালা করতে পারে। কিন্তু খাদ্যতালিকায় আনারস রাখলে স্কিন স্বাভাবিকভাবেই ডিটক্স হয়।
পেঁপে আমাদের দেশেও সহজে পাওয়া যায় এবং শীতে এর গুণ আরও উপকারী। এতে থাকা প্যাপন ত্বকে জমে থাকা মৃত কোষ কমায় এবং স্কিনের রং উজ্জ্বল করে। ট্যান দূর করতেও পেঁপে দারুণ ফল দেয়। নিয়মিত পেঁপে খেলে ত্বকের দাগছোপ কমে এবং স্কিন হয় ন্যাচারালি গ্লোয়িং। পেঁপে আর সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে মুখে লাগালে ব্লেমিশ কমে যায়।
ড্রাগনফ্রুট অপেক্ষাকৃত নতুন হলেও স্কিনকেয়ারে এর গুরুত্ব অনেক। এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা স্ট্রেসড স্কিনকে রিপেয়ার করে। যারা খুব বেশি কাজের চাপ বা অনিদ্রায় ভোগেন, তাদের স্কিনে ক্লান্ত ভাব দেখা যায়। ড্রাগনফ্রুট সেই ক্লান্তি দূর করে স্কিনকে ভিতর থেকে পুনরুদ্ধার করে।
এইসব ফলের রস বা স্মুদি প্রস্তুত করেও খাওয়া যায়। সকালে খালি পেটে কোনো একটি ফল বা স্মুদি খেলে শরীর দ্রুত ভিটামিন শোষণ করে এবং স্কিন সেল রিনিউ প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হয়। অনেকেই জুস বানানোর সময় চিনি যোগ করেন, যা ঠিক নয়। প্রাকৃতিক মিষ্টিই ত্বকের জন্য সেরা।
শুধু ফল খাওয়ার অভ্যাস করাই নয়, শীতের ফল দিয়ে DIY স্কিনকেয়ার করলেও দারুণ ফল পাওয়া যায়। যেমন কমলার খোসার পাউডার ও মধু মিশিয়ে ব্রাইটেনিং প্যাক বানানো যায়; স্ট্রবেরি পেস্ট দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে অ্যাকনে-প্রোন স্কিনে ব্যবহার করা যায়; কলা ও অ্যালোভেরা জেল মিলিয়ে রিফ্রেশিং মাস্ক তৈরি করা যায়। তবে যাদের স্কিন খুব সেনসিটিভ, তারা মুখে ফল লাগানোর আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করবেন।
শীতে ত্বকের যত্নে হাইড্রেশন অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ জল পান করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতেও ভুললে চলবে না। কারণ শীতের রোদ থেকে UV রে-এর ক্ষতি হয়। অনেকেই মনে করেন, শীতে সানস্ক্রিন লাগানো দরকার নেই এ ধারণা ভুল। নিয়মিত জল পান, সানস্ক্রিন এবং ফল এই তিনের মিশ্রণই স্কিনকে শীতে গ্লোয়িং রাখার মূল চাবিকাঠি।
সর্বোপরি বলা যায় বিউটি কেয়ার শুধু বাইরের প্রসাধনী দিয়ে হয় না। ত্বকের আসল স্বাস্থ্য নির্ভর করে আমরা ভেতর থেকে কী খাচ্ছি তার ওপর। শীতের ফলের পুষ্টিগুণ ত্বককে যে অনন্যভাবে সাহায্য করতে পারে, তার প্রমাণ আমরা কিছুদিন নিয়মিত ফল খেলে নিজেই দেখতে পাব। তাই এই শীতে প্লেটে রঙিন ফল রাখুন প্রতিদিন। কমলা, আপেল, কিউই, স্ট্রবেরি, আঙুর পছন্দ করুন যেটা ইচ্ছা! প্রকৃতির এই উপহারগুলোই আপনার ত্বকে আনবে উজ্জ্বলতার সেই খোঁজ,
স্কিনের ন্যাচারাল উইন্টার গ্লো।