স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
বর্তমান সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ, পেশি গঠন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কিংবা সার্বিক ফিটনেস সব ক্ষেত্রেই “হাই প্রোটিন ডায়েট” শব্দবন্ধটি খুব জনপ্রিয়। জিমপ্রেমী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্ক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ অনেকেই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকছেন। এমনকি বিভিন্ন ডায়েট পদ্ধতি যেমন Keto Diet বা Atkins Diet-তেও প্রোটিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হল হাই প্রোটিন ডায়েট মানেই কি বেশি করে ডিম, মাংস, প্রোটিন শেক? নাকি এর পেছনে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক নিয়ম? সঠিক জ্ঞান ও পরিকল্পনা ছাড়া উচ্চ প্রোটিন গ্রহণ শরীরের উপকারের বদলে ক্ষতিও করতে পারে। তাই হাই প্রোটিন ডায়েট শুরু করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
প্রথমেই বুঝতে হবে, প্রোটিন আমাদের শরীরের অন্যতম প্রধান পুষ্টি উপাদান। পেশি, ত্বক, চুল, নখ সবকিছুর গঠনে প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। শরীরের কোষ মেরামত ও নতুন কোষ তৈরিতেও এটি সাহায্য করে। সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়। তবে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা পেশি গঠনের লক্ষ্য রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তা কিছুটা বাড়তে পারে। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
হাই প্রোটিন ডায়েট মানেই শুধু মাংস বা ডিম নয়। প্রোটিনের উৎস হতে পারে প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ দুই ধরনের খাবারই। ডিম, মুরগির মাংস, মাছ, দুধ, দই, পনিরের মতো প্রাণিজ উৎসের পাশাপাশি ডাল, ছোলা, মুগ, রাজমা, সয়াবিন, টোফু, বাদাম, বীজ ইত্যাদিও চমৎকার প্রোটিনের উৎস। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা জরুরি, যাতে শরীর অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ থেকেও বঞ্চিত না হয়। হাই প্রোটিন ডায়েটের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো সুষমতা বজায় রাখা। অনেকেই প্রোটিন বাড়াতে গিয়ে কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট একেবারে কমিয়ে দেন। এটি ঠিক নয়। শরীরের শক্তির প্রধান উৎস কার্বোহাইড্রেট। একেবারে কমিয়ে দিলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই ভাত, রুটি, ওটস, ব্রাউন রাইস, মিলেট ইত্যাদি স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট পরিমিত পরিমাণে রাখা উচিত। তেমনি ভালো ফ্যাট যেমন বাদাম, বীজ, সর্ষের তেল বা অলিভ অয়েল খাদ্যতালিকায় থাকা প্রয়োজন।
জল গ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশি প্রোটিন গ্রহণ করলে কিডনির ওপর চাপ বাড়তে পারে, কারণ প্রোটিন ভাঙার ফলে শরীরে ইউরিয়া তৈরি হয়, যা নির্গত করতে জল প্রয়োজন। তাই হাই প্রোটিন ডায়েট করলে পর্যাপ্ত জল পান করা জরুরি। দিনে অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার জল খাওয়া ভালো, তবে ব্যক্তিভেদে এই পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী জল পান করা উচিত।
প্রোটিন একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে সারা দিনে ভাগ করে খাওয়া ভালো। সকালের জলখাবারে, দুপুরের খাবারে, বিকেলের স্ন্যাকসে এবং রাতের খাবারে প্রতিটি সময়ে কিছু না কিছু প্রোটিন রাখা উচিত। এতে শরীর সহজে তা গ্রহণ করতে পারে এবং পেশি গঠনে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, সকালে ডিম বা দই, দুপুরে ডাল ও মাছ/মুরগি, বিকেলে বাদাম বা ছোলা, রাতে হালকা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। হাই প্রোটিন ডায়েট শুরু করার আগে নিজের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানা জরুরি। যাদের কিডনির সমস্যা, লিভারের সমস্যা বা গাউট রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রোটিন ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। হঠাৎ করে খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়; ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনাই ভালো।
তবে শুধু প্রোটিন বাড়ালেই ওজন কমবে এমন ধারণা ঠিক নয়। ওজন কমাতে গেলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ ও খরচের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও সমান জরুরি। প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
প্রসেসড প্রোটিন বা অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। বাজারে নানা ধরনের প্রোটিন পাউডার বা বার পাওয়া যায়, কিন্তু সবই যে সবার জন্য উপযুক্ত, তা নয়। প্রাকৃতিক খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া সবসময়ই বেশি নিরাপদ ও উপকারী। সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, হাই প্রোটিন ডায়েট কোনো ম্যাজিক নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস, যা সঠিক নিয়ম মেনে করলে উপকার পাওয়া যায়। শরীরের প্রয়োজন বুঝে, সুষম খাদ্য গ্রহণ করে, পর্যাপ্ত জল পান করে এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করলে তবেই হাই প্রোটিন ডায়েট কার্যকর হবে। স্বাস্থ্যই সম্পদ তাই সচেতন থাকুন, নিয়ম মেনে চলুন, আর সুস্থ জীবনের পথে এগিয়ে চলুন।