19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পাহাড়, জলপ্রপাত ও প্রাচীন দুর্গে ঘেরা বিহারের সাসারাম!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


পাহাড়, জলপ্রপাত আর ইতিহাসের গর্বে ঘেরা বিহারের এক অনন্য শহর সাসারাম। প্রকৃতি ও অতীতের মেলবন্ধনে এই জনপদ যেন এক শান্ত অথচ সমৃদ্ধ অধ্যায়। গ্রীষ্মের সবুজ, বর্ষার উচ্ছ্বাস কিংবা শীতের মোলায়েম রোদ সব ঋতুতেই সাসারাম আপন রূপে আকর্ষণীয়। বিহারের রোহতাস জেলায় অবস্থিত সাসারাম একদিকে আফগান শাসক শেরশাহ সূরির স্মৃতিধন্য, অন্যদিকে কাইমুর পাহাড়মালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুশোভিত। এক সময় এটি ছিল সূর সাম্রাজ্যের রাজধানী। আজও সেই ইতিহাসের ছাপ শহরের স্থাপত্যে, সমাধিতে ও দুর্গে স্পষ্ট।

সাসারামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে শেরশাহ সূরি-র সমাধি। ১৬শ শতকে নির্মিত এই সমাধিটি একটি বিশাল কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝখানে অবস্থিত। লাল বেলেপাথরের তৈরি এই অষ্টভুজ স্থাপত্য ভারতীয়-ইসলামিক শৈলীর অনন্য উদাহরণ। জলঘেরা প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে থাকা সমাধিটি সূর্যাস্তের সময় অপূর্ব দেখায়। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এটি এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সাসারাম থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কাইমুর পাহাড়ের উপর অবস্থিত রোহতাসগড় দুর্গ। প্রাচীন এই দুর্গ বহু রাজবংশের সাক্ষী। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় দুর্গে উঠতে কিছুটা কষ্ট হলেও উপর থেকে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য মন জুড়িয়ে দেয়। দুর্গের ভিতরে প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ ও জলাধারের ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের গল্প বলে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সাসারামের আর এক আকর্ষণ তুতলা ভবানী জলপ্রপাত। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা সাদা জলরাশি বর্ষাকালে বিশেষ মনোরম। সবুজ বনাঞ্চল ও পাহাড়ঘেরা পরিবেশে এই জলপ্রপাত পিকনিক ও ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ।

সাসারামের আশেপাশে কাইমুর পাহাড় অঞ্চলে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রের নিদর্শন। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহীদের কাছে এটি এক বিশেষ আকর্ষণ।

কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন?

আপনার মতো কলকাতা-নিবাসী ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সাসারাম পৌঁছনো খুব কঠিন নয়।

ট্রেনে: কলকাতার হাওড়া জংশন থেকে সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায় সাসারাম স্টেশনের জন্য। হাওড়া-নিউ দিল্লি রুটের বহু এক্সপ্রেস ট্রেন সাসারামে থামে। সময় লাগে আনুমানিক ৭–৯ ঘণ্টা। রাতের ট্রেন ধরলে সকালে পৌঁছে দিনভর ঘোরা যায়।

সড়কপথে: কলকাতা থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে সাসারাম। গাড়িতে গেলে প্রায় ১০–১২ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে দীর্ঘ পথ হওয়ায় ট্রেনই সুবিধাজনক।

বিমানে: নিকটতম বিমানবন্দর পাটনা। পাটনা বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে সাসারাম প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। পাটনা থেকে গাড়ি বা ট্রেনে সাসারাম যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন?

সাসারামে বড় বিলাসবহুল হোটেল কম, তবে মাঝারি মানের হোটেল ও লজ রয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে একাধিক বাজেট হোটেল আছে, যেখানে প্রতিরাত ১০০০–২৫০০ টাকার মধ্যে ঘর পাওয়া যায়। কিছু পর্যটক লজ ও ধর্মশালাও রয়েছে। রোহতাসগড় দুর্গ এলাকায় থাকার ব্যবস্থা সীমিত, তাই শহরেই থাকা ভালো। পর্যটনের মৌসুমে (শীতকাল ও বর্ষা) আগে থেকে বুকিং করে নেওয়া উত্তম।

এখানে এলে কী খাবেন?

বিহারের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সাসারামে গেলে স্থানীয় স্বাদ অবশ্যই গ্রহণ করুন।

লিট্টি-চোখা: বিহারের ঐতিহ্যবাহী খাবার লিট্টি-চোখা এখানে খুব জনপ্রিয়। সেঁকা আটার বলের ভিতরে সত্তুর পুর, সঙ্গে আলু বা বেগুনের চোখা সরল অথচ তৃপ্তিদায়ক।

ছাতুর পরোটা: সকালে বা বিকেলের জলখাবারে ছাতুর পুর ভরা পরোটা বেশ সুস্বাদু।

ক্ষীর ও মিষ্টি: স্থানীয় দোকানে পাওয়া যায় দুধের ক্ষীর ও বিভিন্ন দেশি মিষ্টি।

এছাড়াও চাট, কচুরি-তরকারি, নানাবিধ তেলেভাজা সবই সহজলভ্য।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ এই সময় সাসারাম ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো। শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে। বর্ষাকালে জলপ্রপাতের রূপ বাড়ে, তবে পাহাড়ি পথে সতর্ক থাকতে হয়। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

১.দুর্গে উঠতে আরামদায়ক জুতো পরুন।

২.বর্ষায় পিচ্ছিল পথে সাবধানে চলুন।

৩.পানীয় জল সঙ্গে রাখুন।

৪.স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্থানের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন।

সাসারাম এমন এক ভ্রমণস্থল যেখানে একই সঙ্গে মেলে ইতিহাসের গাম্ভীর্য ও প্রকৃতির উচ্ছ্বাস। কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শেরশাহ সূরির সমাধি যেমন অতীতের গৌরব মনে করিয়ে দেয়, তেমনি পাহাড়চূড়ার দুর্গ ও ঝরনার সাদা জলরাশি মনকে এনে দেয় প্রশান্তি। কলকাতা থেকে অল্প পরিকল্পনায় সহজেই ঘুরে আসা যায় এই ঐতিহাসিক শহরে। প্রকৃতি, স্থাপত্য ও ইতিহাস তিনের মিলনে সাসারাম সত্যিই এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য। আপনি যদি ইতিহাসভিত্তিক ফিচার লেখেন কিংবা প্রকৃতি-ভ্রমণের স্বাদ খুঁজে থাকেন, সাসারাম আপনার কলমে ও মনে এক নতুন অধ্যায় যোগ করবেই।

Archive

Most Popular