স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
বর্তমান সময়ে হৃদরোগ বা হার্টের সমস্যা দ্রুত বাড়ছে। এক সময় মনে করা হতো বয়স্কদের মধ্যেই এই রোগ বেশি দেখা যায়, কিন্তু এখন অনেক কম বয়সী মানুষও হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, এর অন্যতম বড় কারণ হলো আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস। অনিয়মিত খাবার, অতিরিক্ত ফাস্টফুড, মানসিক চাপ, কম শারীরিক পরিশ্রম সব মিলিয়ে হৃদযন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
সাধারণভাবে আমরা জানি যে অতিরিক্ত তেল, চিনি ও ময়দা শরীরের জন্য ভালো নয়। এগুলি দীর্ঘদিন বেশি খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু এই তিনটি উপাদানই নয়, এমন আরও কিছু খাবার রয়েছে যেগুলি নিয়মিত খেলে হৃদযন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই হার্ট সুস্থ রাখতে চাইলে খাদ্যাভ্যাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা জরুরি।
প্রথমেই বলা যায় অতিরিক্ত লবণের কথা। লবণ আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত লবণ খাওয়া উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা হৃদযন্ত্রের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় আমরা সরাসরি খাবারে বেশি লবণ না দিলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম ঢুকে যায়। চিপস, প্যাকেটজাত স্যুপ, সস বা প্রক্রিয়াজাত মাংসে সাধারণত লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। ফাস্টফুড ও ভাজাভুজি খাবারও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধরনের খাবারে সাধারণত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। এই ফ্যাট শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে ধমনীর ভেতরে জমে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রক্রিয়াজাত মাংসও হার্টের জন্য খুব একটা ভালো নয়। সসেজ, সালামি বা বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত মাংসে লবণ ও সংরক্ষণকারী রাসায়নিকের পরিমাণ বেশি থাকে। এগুলি দীর্ঘদিন বেশি খেলে উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত মিষ্টিজাত খাবারও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চিনি শুধু ওজন বাড়ায় না, বরং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়। আর ডায়াবেটিস হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ। কার্বনেটেড পানীয় বা সফট ড্রিঙ্কসও শরীরের জন্য খুব একটা উপকারী নয়। এই ধরনের পানীয়তে সাধারণত প্রচুর চিনি থাকে এবং নিয়মিত পান করলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে। এর ফলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হার্ট সুস্থ রাখতে শুধু কিছু খাবার বাদ দিলেই হবে না, বরং খাদ্যতালিকায় কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার যোগ করাও জরুরি। যেমন তাজা ফল ও সবজি, শাকপাতা, বাদাম, ডাল ও পূর্ণ শস্যজাত খাবার। এগুলিতে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত মাছ খাওয়াও উপকারী হতে পারে। অনেক মাছেই ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো বলে মনে করা হয়। একইভাবে পরিমিত পরিমাণে বাদাম ও বীজজাত খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাত্রার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় আমরা সহজ ও দ্রুত পাওয়া যায় এমন খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ি। কিন্তু দীর্ঘদিন এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সচেতনভাবে খাবার নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। হার্ট সুস্থ রাখতে শুধু তেল, চিনি ও ময়দা কমানোই যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত লবণ, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং মিষ্টিজাত পানীয় থেকেও দূরে থাকা দরকার। একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করলে হৃদযন্ত্রকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব। নিজের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই অনেক সময় বড় ধরনের রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।