প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
একেবারে ঝকঝকে হবে রুপোর গয়না, ঘরোয়া টোটকাতেই এবার ম্যাজিক!
রুপোর গয়নার প্রতি আকর্ষণ বাঙালি ঘরে নতুন কিছু নয়। শাঁখা-পলা, নূপুর, পায়েল, আংটি রুপোর নানা গয়না শুধু সাজের অংশ নয়, অনেক সময় আবেগেরও অংশ হয়ে ওঠে। অনেক বাড়িতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রুপোর গয়না ব্যবহার করার চল রয়েছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য রুপোর বালা বা নূপুর, আবার বড়দের জন্য সূক্ষ্ম কারুকাজ করা রুপোর অলঙ্কার সব মিলিয়ে রুপোর গয়নার আবেদন আলাদা। কিন্তু একটি সমস্যা প্রায় সকলেরই হয় কিছুদিন ব্যবহার করার পরেই রুপোর গয়না কালচে হয়ে যায়, তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা যেন হারিয়ে ফেলে। তখন অনেকেই ভাবেন, গয়নাটি বুঝি নষ্ট হয়ে গেল। অথচ সামান্য কিছু ঘরোয়া উপায়েই সেই হারানো জেল্লা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
রুপোর গয়না কালচে হওয়ার পেছনে মূল কারণ হল রাসায়নিক বিক্রিয়া। বাতাসে থাকা সালফার বা আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে রুপোর উপর একটি কালো স্তর তৈরি হয়, যাকে টার্নিশ বলা হয়। এটি গয়নার ক্ষতি করে না, কিন্তু তার সৌন্দর্য অনেকটাই কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যেসব গয়না নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না, সেগুলো আলমারিতে বা বাক্সে পড়ে থাকতে থাকতে দ্রুত কালো হয়ে যেতে পারে। তাই রুপোর গয়না পরিষ্কার রাখা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই রুপোর গয়না পরিষ্কার করতে জুয়েলারি দোকানে দেন। কিন্তু প্রতিবার দোকানে যাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। তার উপর এতে বাড়তি খরচও হয়। অথচ বাড়িতেই এমন কিছু সহজ উপায় রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করলে খুব সহজেই গয়নার পুরোনো উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনা যায়। সবচেয়ে পরিচিত একটি উপায় হল বেকিং সোডা ব্যবহার করা। একটি বাটিতে সামান্য বেকিং সোডা নিয়ে তাতে একটু জল মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করতে হয়। তারপর একটি নরম কাপড় বা পুরোনো টুথব্রাশ দিয়ে সেই পেস্ট আলতো করে গয়নার উপর ঘষে নিলে কালো দাগ ধীরে ধীরে উঠে যেতে শুরু করে। এরপর পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিলে গয়নাটি অনেকটাই ঝকঝকে হয়ে ওঠে।
আরেকটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হল লেবু এবং লবণ ব্যবহার করা। লেবুর প্রাকৃতিক অম্লীয় উপাদান রুপোর উপর জমে থাকা ময়লা বা কালো স্তর পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। একটি বাটিতে সামান্য লেবুর রস ও এক চিমটে লবণ মিশিয়ে সেই মিশ্রণে গয়নাটি কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। পরে পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে নিলে গয়নাটি আগের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অনেকেই টুথপেস্ট দিয়েও রুপোর গয়না পরিষ্কার করেন। সামান্য টুথপেস্ট নিয়ে একটি নরম ব্রাশ দিয়ে গয়নার উপর আলতোভাবে ঘষে দিলে জমে থাকা ময়লা সহজেই উঠে আসে। তবে এখানে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত জোরে ঘষা উচিত নয়, কারণ এতে সূক্ষ্ম কারুকাজের ক্ষতি হতে পারে।
আরেকটি বেশ কার্যকর ঘরোয়া পদ্ধতি হল অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ব্যবহার করা। একটি বাটির মধ্যে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বিছিয়ে তার উপর রুপোর গয়না রাখা হয়। এরপর তাতে গরম জল এবং সামান্য বেকিং সোডা মিশিয়ে দিলে একটি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা রুপোর কালচে স্তর দূর করতে সাহায্য করে। কয়েক মিনিট পরে গয়না তুলে পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে নিলে তার উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। রুপোর গয়না পরিষ্কার করার পাশাপাশি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, পরিষ্কার করার পরও কিছুদিনের মধ্যেই গয়না আবার কালচে হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হল আর্দ্রতা এবং বাতাসের সংস্পর্শ। তাই গয়না সবসময় শুকনো জায়গায় রাখা উচিত। কাপড়ের ছোট পাউচ বা এয়ারটাইট বাক্সে রাখলে ভালো হয়। অনেকেই গয়নার সঙ্গে সিলিকা জেল প্যাকেট রাখেন, যাতে আর্দ্রতা কম থাকে।
গয়না ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। সুগন্ধি, হেয়ার স্প্রে, লোশন বা বিভিন্ন প্রসাধনীতে থাকা রাসায়নিক উপাদান রুপোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসব ব্যবহার করার পর গয়না পরা ভালো। আবার স্নানের সময় বা জল লাগার সম্ভাবনা থাকলে গয়না খুলে রাখা উচিত। অনেকের বাড়িতেই পুরোনো রুপোর গয়না থাকে, যেগুলো হয়তো অনেক বছর ধরে ব্যবহার করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো এতটাই কালো হয়ে যায় যে অনেকেই আর ব্যবহার করতে চান না। কিন্তু একটু যত্ন নিলেই সেই গয়নাগুলো আবার নতুনের মতো হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু গয়নার সৌন্দর্যই ফিরে আসে না, পারিবারিক স্মৃতিও নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
রুপোর গয়না শুধু অলঙ্কার নয়, অনেক সময় তা ঐতিহ্যেরও অংশ। তাই তার যত্ন নেওয়া জরুরি। বাজারের দামি ক্লিনার ব্যবহার না করেও খুব সহজ কিছু ঘরোয়া উপায়েই রুপোর গয়নার হারানো জেল্লা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একটু সময় ও যত্ন নিলেই সেই গয়না আবার ঝলমল করে উঠবে। রুপোর গয়না পরিষ্কার রাখা কোনও কঠিন কাজ নয়। বরং বাড়ির রান্নাঘরেই থাকা কিছু সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করে খুব সহজেই এই কাজ করা যায়। নিয়মিত যত্ন এবং সঠিক সংরক্ষণ করলে রুপোর গয়না বহু বছর ধরে তার সৌন্দর্য বজায় রাখতে পারে। আর সেই ঝকঝকে গয়নাই আবার সাজের মুহূর্তকে করে তোলে আরও বিশেষ।