11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাচ্চাদের জন্য কতটা চিনি নিরাপদ, আর কোনটা এড়িয়ে চলবেন? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


শিশুরা মিষ্টি খাবার পছন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক। চকোলেট, কেক, বিস্কুট, মিষ্টি পানীয় কিংবা আইসক্রিম এসব খাবারের প্রতি ছোটদের আকর্ষণ সবসময়ই বেশি থাকে। অনেক সময় বাবা-মাও সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বা আবদার মেটাতে মিষ্টি খাবার দিতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিদ্যার মতে, শিশুদের অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এখন অনেক অভিভাবকের মধ্যেই প্রশ্ন জাগছে বাচ্চাদের জন্য ঠিক কতটা চিনি নিরাপদ? এবং কোন ধরনের চিনি বা মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?

পুষ্টিবিদদের মতে, চিনি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ কোনও খাদ্য নয়। শরীরের শক্তি উৎপাদনের জন্য কার্বোহাইড্রেটের প্রয়োজন হয়, আর চিনিও এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন শিশুরা অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি গ্রহণ করতে শুরু করে। বর্তমান সময়ে শিশুদের খাদ্যতালিকায় এমন অনেক খাবার ঢুকে পড়েছে, যেখানে অজান্তেই প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে। ফলে শিশুরা দিনে কতটা চিনি খাচ্ছে, তা অনেক সময় বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুদের দৈনিক মোট ক্যালরির মাত্র একটি ছোট অংশই হওয়া উচিত অতিরিক্ত চিনি থেকে। সাধারণভাবে বলা হয়, পাঁচ থেকে দশ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে প্রায় ২০–২৫ গ্রাম অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সীমা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশুই এই সীমার দ্বিগুণ বা তারও বেশি চিনি খেয়ে ফেলছে। এই অতিরিক্ত চিনির বড় উৎস হল প্যাকেটজাত খাবার। বাজারে পাওয়া নানা ধরনের বিস্কুট, কেক, চকোলেট, মিষ্টি সিরিয়াল, ফ্লেভারড দই কিংবা সফট ড্রিঙ্কে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে। এগুলো অনেক সময় এতটাই আকর্ষণীয়ভাবে বাজারজাত করা হয় যে শিশুরা সহজেই সেগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বাবা-মাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে এই খাবারগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অতিরিক্ত চিনি।

অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে শিশুদের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হল দাঁতের ক্ষয়। মিষ্টি খাবার মুখের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ছোট বয়সেই দাঁতের গর্ত বা ব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি শিশুদের ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। বর্তমানে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার সমস্যা দ্রুত বাড়ছে, আর তার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবারের। স্থূলতা আবার ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

শুধু শারীরিক নয়, অতিরিক্ত চিনি শিশুদের আচরণ ও মনোযোগের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বেশি চিনি খাওয়ার ফলে অনেক সময় শিশুরা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে পড়ে বা মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হয়। তাহলে কি শিশুদের সম্পূর্ণভাবে মিষ্টি খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলেন, তা নয়। বরং প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। শিশুরা মাঝেমধ্যে মিষ্টি খাবার খেতে পারে, তবে তা যেন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত না হয়।

প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া মিষ্টি সাধারণত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। যেমন ফলের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চিনি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, কারণ ফলের সঙ্গে থাকে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। ফলে শিশুরা যদি মিষ্টি খেতে চায়, তাহলে ফল একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। বাড়িতে তৈরি খাবারও একটি ভালো উপায়। বাড়িতে তৈরি পায়েস, ক্ষীর বা অন্যান্য মিষ্টি খাবারে চিনি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে শিশুরা মিষ্টি স্বাদ পায়, আবার অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকিও কম থাকে।

অভিভাবকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল শিশুদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবারের গুরুত্ব বোঝানো যায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। এছাড়া প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় তার লেবেল পড়ার অভ্যাসও জরুরি। অনেক সময় “লো ফ্যাট” বা “হেলদি” লেখা থাকলেও সেই খাবারে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকতে পারে। তাই উপাদানের তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।

শিশুদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবা-মার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে যদি স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে শিশুরাও সেই অভ্যাস সহজেই গ্রহণ করে। মিষ্টি খাবার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং পরিমিতি বজায় রাখাই হল আসল কথা। সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখলে শিশুদের সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

Archive

Most Popular