স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শীতকাল এলেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এক ধরনের আরাম ও উৎসবের আমেজ ফিরে আসে। তবে এই ঋতুর সঙ্গে সঙ্গেই ত্বক ও চুলের নানা সমস্যাও দেখা দেয়। ঠান্ডা আবহাওয়া, শুষ্ক বাতাস এবং আর্দ্রতার অভাবের কারণে ত্বক তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারায়, চুল হয়ে পড়ে রুক্ষ ও প্রাণহীন। অনেকেই এই সময় শুষ্ক ত্বক, ফাটা হাত-পা, ঠোঁট ফেটে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন। তাই শীতকালে ত্বক ও চুলের বাড়তি যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শীতকালে ত্বকের প্রধান সমস্যা হল শুষ্কতা। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কমে যাওয়ায় ত্বকের প্রাকৃতিক তেল দ্রুত শুকিয়ে যায়। এর ফলে ত্বক টানটান হয়ে ওঠে, চুলকানি ও খসখসে ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে মুখ, হাত ও পা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়মিত ত্বক আর্দ্র রাখা না গেলে ফাটল ও অস্বস্তি বাড়তে থাকে। এই সময় ত্বকের যত্নে ঘরোয়া তেল অত্যন্ত কার্যকর। স্নানের আগে হালকা গরম সর্ষের তেল বা নারকেল তেল সারা শরীরে মালিশ করলে ত্বক নরম ও মসৃণ থাকে। তেলে থাকা প্রাকৃতিক ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের গভীরে পুষ্টি জোগায় এবং রক্তসঞ্চালন বাড়ায়। সপ্তাহে কয়েকদিন এই অভ্যাস বজায় রাখলে শুষ্কতা অনেকটাই কমে যায়।
শীতকালে মুখের ত্বকের জন্য দুধ ও মধুর ব্যবহার বিশেষ উপকারী। কাঁচা দুধ ত্বক পরিষ্কার করে এবং মধু ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। দুধের সঙ্গে অল্প মধু মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেললে মুখের শুষ্কতা কমে এবং ত্বক উজ্জ্বল দেখায়। একইভাবে বেসন, দই ও সামান্য হলুদ মিশিয়ে ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে ত্বক পুষ্টি পায় এবং প্রাকৃতিক জেল্লা ফিরে আসে। শীতকালে ঠোঁটের যত্নও খুব জরুরি। ঠোঁটের ত্বক খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় শীতের প্রভাব সেখানে দ্রুত পড়ে। নিয়মিত মধু ও চিনি দিয়ে হালকা স্ক্রাব করলে মৃত কোষ দূর হয়। রাতে ঘুমোনোর আগে ঘি বা নারকেল তেল ঠোঁটে লাগালে ফাটা ঠোঁটের সমস্যা কমে এবং ঠোঁট নরম থাকে। ত্বকের পাশাপাশি চুলের যত্নেও শীতকালে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন। এই সময় মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে খুশকির সমস্যা দেখা দেয় এবং চুল পড়া বেড়ে যায়। নিয়মিত উষ্ণ তেলে মাথায় মালিশ করলে মাথার ত্বক আর্দ্র থাকে এবং চুলের গোড়া শক্ত হয়। নারকেল তেল, তিলের তেল বা সর্ষের তেল এই কাজে খুবই উপযোগী।
চুলের পুষ্টির জন্য ঘরোয়া হেয়ার প্যাকও বেশ কার্যকর। ডিম ও দইয়ের মিশ্রণ চুলে লাগালে চুল নরম, মসৃণ ও উজ্জ্বল হয়। এছাড়া মেথি ভেজানো পেস্ট খুশকি ও চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে। অ্যালোভেরা জেল সরাসরি মাথার ত্বকে ব্যবহার করলে শুষ্কতা কমে এবং চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় থাকে। শীতকালে শুধু বাহ্যিক যত্ন নয়, খাদ্যাভ্যাসও ত্বক ও চুলের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা, মৌসুমি ফল ও সবজি খাওয়া, বাদাম, তিল ও খেজুরের মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর ভেতর থেকে সুস্থ থাকে। এর প্রভাব ত্বক ও চুলেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
তবে শীতকালে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। অতিরিক্ত গরম জল দিয়ে স্নান করলে ত্বকের স্বাভাবিক তেল নষ্ট হয়ে যায়। অ্যালকোহলযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত। বাইরে বেরোনোর সময় ময়েশ্চারাইজার ও প্রয়োজনে সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ত্বক সুরক্ষিত থাকে।
সবশেষে বলা যায়, শীতকাল মানেই সৌন্দর্যচর্চার জন্য বাড়তি খরচ নয়। আমাদের ঘরেই থাকা সহজলভ্য উপাদান দিয়ে নিয়মিত যত্ন নিলেই ত্বক ও চুল সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব। প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া উপায়ে যত্ন নিলে শীতকালও হয়ে উঠতে পারে সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্যের আনন্দময় সময়।