স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
মাসিক বা পিরিয়ড নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই প্রক্রিয়া ঘটে এবং এর মাধ্যমে শরীরের প্রজনন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চক্র সম্পূর্ণ হয়। অনেক নারীর ক্ষেত্রেই মাসিকের তারিখ মোটামুটি নিয়মিত থাকে। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় পিরিয়ড নির্ধারিত সময়ে হয় না, দেরি হয়ে যায়। তখন অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান এটা কি কোনও বড় সমস্যার ইঙ্গিত, না কি অন্য কোনও স্বাভাবিক কারণ রয়েছে?
প্রথমেই বলা দরকার, পিরিয়ড দেরিতে হওয়া সবসময় বিপদের লক্ষণ নয়। অনেক সময় শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনের কারণেও মাসিকের সময়সূচিতে সামান্য ওঠানামা হতে পারে। সাধারণত একটি স্বাভাবিক মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হতে পারে। তাই এক-দু’দিন এদিক-ওদিক হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে যদি নিয়মিতভাবে পিরিয়ড দেরিতে হয় বা দীর্ঘ সময় ধরে মাসিক না হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এর পিছনে নানা কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় জীবনযাত্রার পরিবর্তন, মানসিক চাপ বা খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবেও মাসিকের সময় বদলে যেতে পারে।
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস পিরিয়ড দেরি হওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ। কাজের চাপ, পড়াশোনার দুশ্চিন্তা বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য সাময়িকভাবে বদলে যেতে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে মাসিক চক্রও প্রভাবিত হতে পারে। হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়াও পিরিয়ড দেরি হওয়ার কারণ হতে পারে। শরীরের ওজন এবং হরমোনের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। খুব দ্রুত ওজন কমানো, কঠোর ডায়েট করা বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করার ফলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, যার প্রভাব মাসিক চক্রের ওপর পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হরমোনজনিত সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় বা প্রজনন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যার জন্যও মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক নারীর ক্ষেত্রে Polycystic Ovary Syndrome বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের কারণে পিরিয়ড দেরিতে হতে পারে বা অনিয়মিত হতে পারে। এই অবস্থায় শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বদলে যায় এবং ডিম্বস্ফোটনের প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যাও অনেক সময় মাসিকের ওপর প্রভাব ফেলে। শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে বা বেড়ে গেলে মাসিক চক্র অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে পিরিয়ড দেরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া কিছু ওষুধের প্রভাবেও মাসিক দেরিতে হতে পারে। বিশেষ করে হরমোন সম্পর্কিত ওষুধ বা জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু পদ্ধতি মাসিক চক্রে পরিবর্তন আনতে পারে। তাই নতুন কোনও ওষুধ শুরু করার পর যদি মাসিকের সময়সূচিতে পরিবর্তন দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। বিয়ের পর বা যৌনজীবন শুরু হওয়ার পর অনেকের প্রথমেই মনে হয় পিরিয়ড দেরি মানেই কি গর্ভধারণ? সত্যিই, গর্ভধারণ মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। যদি পিরিয়ড অনেকদিন দেরি করে এবং অন্য কিছু লক্ষণও দেখা যায়, তাহলে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা দরকার।
তবে সব ক্ষেত্রেই যে এটি বড় কোনও সমস্যার ইঙ্গিত, তা নয়। অনেক সময় পরিবেশ পরিবর্তন, ভ্রমণ, ঘুমের অনিয়ম বা দৈনন্দিন রুটিন বদলে গেলেও মাসিকের সময়সূচি সাময়িকভাবে বদলে যেতে পারে। নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাসিকের তারিখ, সময়কাল এবং অন্য কোনও পরিবর্তন লক্ষ্য করলে তা মনে রাখা ভালো। এখন অনেকেই ক্যালেন্ডার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাসিক চক্র নথিভুক্ত রাখেন, যা ভবিষ্যতে কোনও সমস্যা হলে বুঝতে সুবিধা হয়।
পিরিয়ড দেরিতে হওয়া মানেই সবসময় ভয়ের কারণ নয়। কিন্তু যদি এটি বারবার ঘটে বা দীর্ঘদিন ধরে মাসিক না হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সময়মতো সমস্যার কারণ জানা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াও সহজ হয়। নারীর স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নিয়মিত মাসিক। তাই শরীরের এই স্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।