27th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বিচ্ছেদের পর নিজেকে কীভাবে সামলাবেন? নতুন করে শুরু করার বাস্তব উপায়।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


জীবনের সব সম্পর্ক চিরস্থায়ী হয় না। কখনও মতের অমিল, কখনও পরিস্থিতির চাপে, আবার কখনও পারস্পরিক সিদ্ধান্তে একটি সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও তার মানসিক অভিঘাত অনেক দিন পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ নিজেকে অসহায়, একা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি বলে মনে করতে পারেন।

বিচ্ছেদ শুধু একজন মানুষকে হারানোর অভিজ্ঞতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু স্মৃতি, অভ্যাস, পরিকল্পনা এবং আবেগ। তাই বিচ্ছেদের পর দুঃখ, রাগ, হতাশা, শূন্যতা কিংবা অপরাধবোধ অনুভব করা খুবই স্বাভাবিক। অনেকেই নিজেকে দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বাস্তবে মানসিক ক্ষত সারতে সময় লাগে। তাই প্রথমেই নিজের অনুভূতিগুলিকে অস্বীকার না করে সেগুলিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া জরুরি। বিচ্ছেদের পর সবচেয়ে বড় ভুলগুলির একটি হল নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া। অনেকেই বন্ধু, পরিবার বা পরিচিতদের থেকে দূরে সরে যান। অথচ এই সময়ে কাছের মানুষদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অনুভূতির কথা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নিলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে। সব সমস্যা একা সামলানোর চেষ্টা না করে প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াও পরিণত মানসিকতার পরিচয়।

অনেকেরই অভ্যাস হয়ে যায় পুরনো ছবি দেখা, পুরনো মেসেজ পড়া বা বারবার অতীত নিয়ে ভাবা। কিছুটা সময় স্মৃতি মনে পড়া স্বাভাবিক হলেও সারাক্ষণ অতীতের মধ্যে ডুবে থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ধীরে ধীরে সেই স্মৃতিগুলির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা দরকার। এর অর্থ অতীতকে মুছে ফেলা নয়, বরং তাকে জীবনের একটি অধ্যায় হিসেবে গ্রহণ করা। বিচ্ছেদের পর আত্মসম্মানবোধেও আঘাত লাগতে পারে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেন, “আমার মধ্যেই হয়তো কোনও সমস্যা ছিল” বা “আমি যথেষ্ট ভালো নই”। কিন্তু একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া কোনও মানুষের সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করে না। নিজের ভালো গুণ, অর্জন এবং ব্যক্তিত্বের দিকগুলিকে মনে রাখা জরুরি। আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের জন্য ছোট ছোট সাফল্যও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সময় নতুন রুটিন তৈরি করা বিশেষভাবে উপকারী। নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরচর্চা মানসিক সুস্থতার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটা, যোগব্যায়াম বা অন্য ধরনের ব্যায়াম শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসরণে সাহায্য করে যা মন ভালো রাখতে সহায়ক।

বিচ্ছেদের পর অনেকেই নিজের পছন্দের কাজগুলি থেকে দূরে সরে যান। অথচ এই সময়েই শখ ও আগ্রহের বিষয়গুলিকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বই পড়া, গান শেখা, ভ্রমণ, ছবি আঁকা, বাগান করা বা নতুন কোনও দক্ষতা অর্জন—এই ধরনের কাজ মনকে ব্যস্ত রাখে এবং নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।

সামাজিক মাধ্যমে প্রাক্তন সঙ্গীর জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত খোঁজখবর নেওয়ার প্রবণতাও অনেকের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু এতে মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। তাই কিছুদিনের জন্য প্রয়োজনীয় সীমারেখা তৈরি করা ভালো। নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া এই সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিচ্ছেদকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার চেষ্টা করুন। প্রতিটি সম্পর্কই আমাদের কিছু না কিছু শেখায়—নিজেকে, অন্যকে এবং সম্পর্কের প্রকৃতি সম্পর্কে। সেই শিক্ষাগুলি গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই পরিণত পথ।

তবে যদি দীর্ঘ সময় ধরে গভীর বিষণ্নতা, অনিদ্রা, কাজের প্রতি অনীহা বা স্বাভাবিক জীবনযাপনে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পেশাদার সহায়তা নেওয়া দুর্বলতার নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়ারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিচ্ছেদের পর জীবন থেমে যায় না। প্রথমদিকে পথ কঠিন মনে হলেও সময়, আত্মযত্ন এবং সঠিক সমর্থনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি হয়। নিজের প্রতি ধৈর্য রাখুন, ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে চলুন এবং মনে রাখুন—জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হওয়া মানেই পুরো গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অনেক সময় নতুন শুরুই আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে।

Archive

Most Popular