স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গরমকাল এলেই ঘাম হওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঘাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকের ক্ষেত্রে গরমের দিনে ঘাম এতটাই বেশি হয় যে তা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সারাক্ষণ ভেজা পোশাক, শরীরে আঠালো ভাব, দুর্গন্ধ এবং ক্লান্তি দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত ঘামের পেছনে আবহাওয়া, শারীরিক গঠন, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা কিছু স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাসও এই সমস্যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা প্রতিদিন যা খাই, তার প্রভাব শরীরের তাপমাত্রা এবং ঘামের পরিমাণের ওপর পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু খাবার শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ঘামগ্রন্থিগুলিকে আরও সক্রিয় করে তোলে। তাই গরমের সময় অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা থাকলে কিছু খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। ঝাল খাবার এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে। কাঁচা লঙ্কা, শুকনো লঙ্কা বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবারে থাকা ক্যাপসাইসিন নামক উপাদান শরীরকে উত্তপ্ত অনুভব করায়। ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য আরও বেশি ঘাম তৈরি করতে শুরু করে। তাই গরমের দিনে অত্যন্ত ঝাল খাবার খেলে ঘামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
চা ও কফির মতো ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও অনেক সময় অতিরিক্ত ঘামের কারণ হতে পারে। ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘামগ্রন্থির কার্যকলাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দিনে বারবার চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে গরমকালে তা কিছুটা কমিয়ে আনা যেতে পারে। অতিরিক্ত গরম বা ধোঁয়া ওঠা খাবারও শরীরের তাপমাত্রা সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে খাওয়ার পর ঘাম হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই গরমের সময় খুব বেশি গরম খাবারের পরিবর্তে স্বাভাবিক তাপমাত্রার খাবার বেছে নেওয়া স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
ভাজাভুজি এবং অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার হজম করতে শরীরকে তুলনামূলক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে শরীরে তাপ উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে। তাই গরমকালে হালকা এবং সহজপাচ্য খাবার খাওয়া অনেক বেশি আরামদায়ক। অনেকেই গরমের দিনে ঠান্ডা পানীয়ের বদলে সফট ড্রিঙ্কস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন। কিন্তু এগুলি শরীরকে দীর্ঘক্ষণ হাইড্রেটেড রাখতে পারে না। বরং অতিরিক্ত চিনি শরীরে অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই জল, ডাবের জল, ঘোল, লেবুর শরবত বা ফলসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পানীয় বেশি উপকারী।
অ্যালকোহলজাত পানীয়ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে গরমের সময় অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে। তবে শুধু কিছু খাবার এড়িয়ে চললেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। পর্যাপ্ত জলপান, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শসা, তরমুজ, বাঙ্গি, ডাবের জল এবং অন্যান্য জলসমৃদ্ধ ফল ও সবজি শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ঘাম হওয়া স্বাভাবিক এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু যদি ঘামের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয় বা তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এটি বিশেষ শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। গরমের দিনে স্বস্তিতে থাকতে চাইলে শুধু বাইরের যত্ন নয়, খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন আপনার শরীরকে আরও আরামদায়ক রাখতে পারে এবং অতিরিক্ত ঘামের অস্বস্তি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। কারণ সুস্থ ও স্বস্তিদায়ক গ্রীষ্মের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সঠিক জীবনযাপনেই।