6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া, অফিসের কাজ কম্পিউটারে, অবসরে সোশ্যাল মিডিয়া, রাতে ঘুমানোর আগে আবার ভিডিও বা সিরিজ—ডিজিটাল স্ক্রিন এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগকে দ্রুত করেছে এবং তথ্যকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এরই সঙ্গে বেড়েছে স্ক্রিন-নির্ভরতা। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সারাক্ষণ ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকা কি মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে? এই প্রেক্ষাপটেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’—অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকার অভ্যাস।মনোবিদদের মতে, ডিজিটাল ডিটক্স মানেই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে সেটি আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ না করে। কাজের প্রয়োজনে ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করতেই হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং, বারবার নোটিফিকেশন দেখা বা সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার অভ্যাস কমিয়ে আনার মধ্যেই রয়েছে এই ধারণার মূল কথা।বর্তমান সময়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না, দিনের কতটা সময় তাঁরা স্ক্রিনের সামনে কাটিয়ে দিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমের অসংখ্য ভিডিও, খবর, নোটিফিকেশন বা বার্তা মস্তিষ্ককে একটানা নানা তথ্যের মধ্যে ব্যস্ত রাখে। এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, কাজের মধ্যে বারবার বিঘ্ন ঘটে এবং অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক ক্লান্তিও বাড়ে।গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং সামাজিক মাধ্যমের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগ, একাকিত্ব, তুলনামূলক হীনমন্যতা বা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে অন্যের সাফল্য বা সাজানো জীবনের ছবি বারবার দেখলে অনেকেই নিজের জীবনকে অযথা কম মূল্যবান বলে মনে করতে শুরু করেন। যদিও এই অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে এক নয়, তবু সচেতন ব্যবহার জরুরি।ঘুমের উপরও স্ক্রিনের প্রভাব পড়তে পারে। রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করলে স্ক্রিন থেকে নির্গত আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হওয়া, ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া বা সকালে ক্লান্ত লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করার পরামর্শ দেন।ডিজিটাল ডিটক্স মানে কিন্তু এক সপ্তাহ ফোন বন্ধ করে পাহাড়ে চলে যাওয়া নয়। বরং ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়। যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে ফোন না দেখা, খাওয়ার সময় মোবাইল দূরে রাখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোন সাইলেন্ট রাখা বা দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা। এই ছোট অভ্যাসগুলি ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।অনেকেই মনে করেন, কাজের চাপে ডিজিটাল ডিটক্স সম্ভব নয়। বাস্তবে অফিসের কাজের বাইরে ব্যক্তিগত সময়ে কিছু সীমা নির্ধারণ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। উদাহরণস্বরূপ, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, সপ্তাহে এক দিন কিছু সময়ের জন্য সামাজিক মাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়া বা অবসরে বই পড়া, হাঁটা কিংবা অন্য কোনও শখের কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ডিটক্সের অন্যতম বড় উপকার হলো বাস্তব সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নির্ভেজাল আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, শিশুদের সঙ্গে খেলা বা প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই অভিজ্ঞতাগুলি স্ক্রিনে কাটানো সময়ের বিকল্প নয়, বরং তার পরিপূরক।তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে প্রযুক্তি নিজে কোনও শত্রু নয়। অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন, দূরবর্তী কাজ, জরুরি যোগাযোগ বা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার শেখা।শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজন। অভিভাবকদের উচিত শুধু সময়সীমা নির্ধারণ করা নয়, বরং নিজেরাও স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস অনুসরণ করা। কারণ শিশুরা অনেক ক্ষেত্রেই বড়দের দেখেই আচরণ শেখে। পরিবারের সবাই মিলে ‘নো-ফোন ডিনার’ বা সপ্তাহে এক দিন কিছু সময় স্ক্রিন ছাড়া কাটানোর মতো অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

ডিজিটাল ডিটক্স কোনও সাময়িক ফ্যাশন নয়, বরং বর্তমান সময়ে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার একটি সচেতন প্রচেষ্টা। ফোন বা ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু নিজের সময়, ঘুম, সম্পর্ক এবং মানসিক শান্তির মূল্য যেন তার চাপে হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলেই ডিজিটাল জীবনও হবে আরও স্বাস্থ্যকর, আর মনও থাকবে অনেক বেশি শান্ত ও সতেজ।

Archive

Most Popular