স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
পিরিয়ড চলাকালীন ব্যায়াম করা উচিত কি না, তা নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। কেউ মনে করেন, এই সময় শরীরকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়াই ভালো, আবার কেউ নিয়মিত শরীরচর্চা চালিয়ে যান। বিভিন্ন সামাজিক ধারণা ও ভুল তথ্যের কারণে অনেক নারীই পিরিয়ডের সময় ব্যায়াম করতে ভয় পান। তবে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ক্রীড়া চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ নারীর জন্য মাসিকের সময় হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম নিরাপদ। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি শারীরিক অস্বস্তি কমাতেও সাহায্য করতে পারে।মাসিকের সময় শরীরে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন হয়। এর ফলে কারও পেটব্যথা, কোমরব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা মেজাজের ওঠানামা হতে পারে। এই উপসর্গের তীব্রতা সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। তাই ব্যায়াম করবেন কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের শারীরিক অবস্থার উপর। যদি শরীর খুব দুর্বল লাগে বা অতিরিক্ত ব্যথা থাকে, তাহলে বিশ্রাম নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁটা, হালকা জগিং, যোগব্যায়াম, স্ট্রেচিং, সাইক্লিং বা সাঁতারের মতো ব্যায়াম অনেকের জন্য এই সময় উপকারী হতে পারে। শরীরচর্চার সময় এন্ডোরফিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে ব্যথা কমাতে এবং মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। ফলে পিরিয়ডের সময় অস্বস্তি কিছুটা কম অনুভূত হতে পারে।অনেক নারী মনে করেন, ব্যায়াম করলে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে। বাস্তবে সাধারণ মাত্রার শরীরচর্চায় এমনটি হওয়ার প্রমাণ খুবই সীমিত। তবে উচ্চমাত্রার বা দীর্ঘ সময়ের কঠোর অনুশীলন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাসিক চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পেশাদার ক্রীড়াবিদ বা অতিরিক্ত শরীরচর্চা করেন যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়ামের পরিকল্পনা করা উচিত।এই সময় নিজের শরীরের কথা শুনুন। যদি জিমে ভারী ওজন তোলার মতো ব্যায়াম করতে ইচ্ছে না করে, তাহলে হালকা হাঁটা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা যোগাসন বেছে নিতে পারেন। শরীর যদি বিশ্রাম চায়, তাহলে নিজেকে জোর করা উচিত নয়।ব্যায়ামের সময় পর্যাপ্ত জল পান করাও জরুরি। মাসিকের সময় অনেকেই দুর্বল বোধ করেন। তাই শরীরে জলের ঘাটতি না হতে দেওয়া এবং সুষম খাদ্য খাওয়া প্রয়োজন। আয়রন, প্রোটিন, ফল, শাকসবজি এবং পর্যাপ্ত জল শরীরকে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অতিরিক্ত নোনতা খাবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।পিরিয়ডের সময় সঠিক স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। স্যানিটারি ন্যাপকিন, ট্যাম্পন বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ—যেটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটিই ব্যবহার করুন। ব্যায়ামের আগে এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী স্যানিটারি পণ্য পরিবর্তন করলে পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে।যোগব্যায়ামের কিছু আসন যেমন ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ, চাইল্ডস পোজ বা হালকা স্ট্রেচিং কোমর ও পেটের পেশিকে শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে। তবে যদি কোনও আসনে অস্বস্তি হয় বা ব্যথা বাড়ে, তাহলে তা বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। একইভাবে নতুন বা কঠিন ব্যায়াম শুরু করার জন্য পিরিয়ডের সময়টি আদর্শ নাও হতে পারে।তবে কিছু পরিস্থিতিতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যদি মাসিকের সময় অত্যন্ত বেশি রক্তক্ষরণ হয়, তীব্র ব্যথার কারণে স্বাভাবিক কাজ করা সম্ভব না হয়, মাথা ঘোরে, অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি হয় বা ব্যায়ামের সময় অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। এগুলি অন্য কোনও স্বাস্থ্যসমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরিয়ডকে অসুস্থতা হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই। বরং নিজের শরীরের পরিবর্তনকে বুঝে সেই অনুযায়ী জীবনযাত্রা সামঞ্জস্য করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ পিরিয়ডের সময় স্বাভাবিকভাবেই ব্যায়াম করতে পারেন, আবার কারও বিশ্রামের প্রয়োজন হতে পারে—দুটিই স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অধিকাংশ নারীর জন্য পিরিয়ডের সময় ব্যায়াম নিরাপদ এবং অনেক ক্ষেত্রেই উপকারী। তবে নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, সুষম খাদ্য খাওয়া এবং প্রয়োজনে ব্যায়ামের মাত্রা কমিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শরীরের সঙ্গে লড়াই নয়, বরং তার প্রয়োজনকে সম্মান করেই সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব।