প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
একসঙ্গে থাকা আর একে অপরকে বোঝা, দুটো কিন্তু এক কথা নয়। একই ছাদের নীচে থেকেও কখনও কখনও দু’জন মানুষের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় অদৃশ্য এক দেওয়াল। সকালে ঘুম থেকে উঠে পাশাপাশি চা খাওয়া, অফিসের ব্যস্ততা, সংসারের কাজ, সন্তানের পড়াশোনা, বাজার-হাট সবই হয়তো আগের মতো চলছে, অথচ কোথাও যেন কথার জায়গাটা কমে এসেছে। ‘কেমন আছ?’ প্রশ্নের উত্তর এসে দাঁড়িয়েছে ‘ভালো’, দিনের গল্প বলতে গিয়ে শুধু প্রয়োজনীয় তথ্যের আদানপ্রদান হচ্ছে। ঝগড়া নেই, অথচ আগের মতো ঘনিষ্ঠতাও নেই। সম্পর্কের এই নীরব দূরত্বই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তোলে।
সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে সবসময় বড় কোনও ঘটনা থাকে না। বরং জমে থাকা ছোট ছোট অভিমান, না বলা কথা, ভুল বোঝাবুঝি, সময়ের অভাব কিংবা একে অপরের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অনুভূতি ধীরে ধীরে সম্পর্ককে ক্লান্ত করে দিতে পারে। একজন হয়তো ভাবছেন, ‘ও আমাকে আর গুরুত্ব দেয় না’, অন্যজনের মনে হতে পারে, ‘আমি তো সবই করছি, তবু ও খুশি নয়।’ দু’জনেই নিজের জায়গা থেকে ঠিক, কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে একে অপরের জায়গাটা বুঝতে না পারার কারণে। তাই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার প্রথম শর্তই হল—শুধু নিজের কথাটা বলা নয়, অন্যজন কী বলতে চাইছেন সেটাও মন দিয়ে শোনা।
অনেক সম্পর্কেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যোগাযোগের অভাবে। তবে যোগাযোগ মানে সারাদিন ফোনে কথা বলা বা একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটানো নয়। বরং প্রয়োজন এমন কিছু মুহূর্ত, যখন দু’জন মানুষ কোনও তাড়া ছাড়াই নিজেদের কথা বলতে পারেন। সঙ্গী অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের তালিকা শুরু না করে একটু সময় দেওয়া যেতে পারে। আবার দিনের শেষে দু’জনেই ব্যস্ত থাকলে দশ-পনেরো মিনিট শুধু নিজেদের কথা বলার জন্য রাখা যায়। মোবাইল দূরে রেখে, টেলিভিশন বন্ধ করে, চোখে চোখ রেখে কথা বলার এই সামান্য সময়ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
তবে কথা বলার সময় ‘তুমি সবসময় এমন করো’ বা ‘তুমি কোনওদিন আমাকে বোঝো না’ ধরনের অভিযোগ পরিস্থিতি আরও জটিল করে। তার বদলে নিজের অনুভূতিটা প্রকাশ করা অনেক বেশি কার্যকর। যেমন, ‘তুমি আজ আমাকে সময় দাওনি’ বলার বদলে বলা যায়, ‘আজ তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু সময় না পেয়ে আমার খারাপ লেগেছে।’ দুটো বাক্যের অর্থ প্রায় একই, কিন্তু দ্বিতীয়টিতে আক্রমণের বদলে অনুভূতির কথা রয়েছে। ফলে সামনের মানুষটিও আত্মরক্ষামূলক হয়ে না গিয়ে কথাটা বোঝার সুযোগ পান।
সম্পর্কে ‘কে ঠিক, কে ভুল’ প্রমাণ করার চেষ্টা অনেক সময় সমস্যার সমাধান করে না। বিশেষ করে তর্কের মুহূর্তে দু’জনেই যদি নিজের বক্তব্যকে শেষ কথা বলে মনে করেন, তাহলে ছোট একটি বিষয়ও বড় আকার নিতে পারে। সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু মতের অমিলকে ব্যক্তিগত অপমান বা ভালোবাসার অভাব হিসেবে দেখলে সমস্যা বাড়ে। একজন পছন্দ করেন বাইরে ঘুরতে যেতে, অন্যজন হয়তো বাড়িতে শান্তিতে থাকতে চান। একজন অর্থ খরচ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে চান, অন্যজন ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। এমন পার্থক্যকে সম্পর্কের ব্যর্থতা না ভেবে আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখাই পরিণত সম্পর্কের লক্ষণ।
বিশ্বাসের জায়গাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ ঢুকে গেলে একসময় স্বাভাবিক কথাবার্তাও জেরা করার মতো হয়ে যেতে পারে। ফোন কার সঙ্গে কথা বলল, কেন এতক্ষণ অনলাইনে ছিল, কোথায় গেল—প্রতিটি বিষয় নিয়ে নজরদারি চলতে থাকলে সম্পর্কের নিরাপত্তা বাড়ে না, বরং কমে। অবশ্যই বিশ্বাস মানে চোখ বন্ধ করে সব মেনে নেওয়া নয়। কোনও বাস্তব কারণ থাকলে তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে। কিন্তু অনুমান, গুজব বা কল্পনার ভিত্তিতে সঙ্গীকে বারবার সন্দেহ করা সম্পর্ককে ভিতর থেকে দুর্বল করে।
আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সম্পর্কের মধ্যে অদৃশ্য চাপ তৈরি করতে পারে। অন্য দম্পতির ছবি দেখে মনে হতে পারে, ‘ওদের সম্পর্ক কত সুন্দর, আমাদেরটা এমন নয় কেন?’ কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে মানুষ সাধারণত জীবনের সুন্দর মুহূর্তটাই দেখান, সমস্ত বাস্তবতা নয়। তাই অন্যের সাজানো সুখের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বাস্তব জীবনকে তুলনা করা অর্থহীন। নিজের সম্পর্কের শক্তি কোথায়, কোথায় উন্নতির প্রয়োজন—সেদিকেই নজর দেওয়া ভালো।
দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিসরও জরুরি। সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে, সব বন্ধু বা শখ ভাগ করে নিতে হবে—এমন কোনও নিয়ম নেই। বরং প্রত্যেকের নিজের কিছু সময়, বন্ধুত্ব, পছন্দ বা ব্যক্তিগত আগ্রহ থাকলে সম্পর্ক অনেক সময় আরও স্বাস্থ্যকর হয়। সঙ্গী বই পড়তে ভালোবাসেন, আপনি গান শুনতে বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন—দুটোই চলতে পারে। একে অপরের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা মানে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং সম্পর্কের ভিতকে আরও শক্ত করা।
সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াও সম্পর্কের বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে দু’জনেই চাকরি করলে শুধু আয় ভাগ করলেই দায়িত্ব ভাগ হয় না। রান্না, বাজার, ঘর পরিষ্কার, সন্তানের দায়িত্ব, বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা, বিল দেওয়া—এই অদৃশ্য কাজগুলিও মানসিক ও শারীরিক শ্রম তৈরি করে। একজন যদি মনে করেন, ‘আমি তো টাকা উপার্জন করছি, তাই সংসারের বাকি কাজ আমার নয়’, আর অন্যজন ক্রমাগত সব দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই ‘কাজ কে করবে’ নিয়ে আগেভাগে আলোচনা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া সম্পর্কের চাপ অনেকটা কমাতে পারে।
আর্থিক বিষয় নিয়েও খোলামেলা কথা বলা দরকার। কতটা আয়, কতটা খরচ, কতটা সঞ্চয়, ঋণ আছে কি না, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী—এই বিষয়গুলি নিয়ে কথা না বললে পরে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত খরচের জন্য কিছু স্বাধীনতা থাকতে পারে, পাশাপাশি যৌথ প্রয়োজন ও ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও থাকা দরকার। টাকা নিয়ে মতের অমিল হলেই সেটাকে চরিত্রের সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং দু’জনের অগ্রাধিকার বুঝে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছনো দরকার।
ঝগড়া হবে না—এমন সম্পর্ক বাস্তবে খুব কমই আছে। গুরুত্বপূর্ণ হল ঝগড়ার ধরন। রাগের সময় অপমানজনক কথা বলা, পুরনো ভুল টেনে আনা, ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব শাস্তি দেওয়া, হুমকি দেওয়া বা শারীরিক আক্রমণ কোনওটাই স্বাস্থ্যকর মতবিরোধের অংশ নয়। রাগ খুব বেশি হলে কিছু সময়ের জন্য কথাবার্তা থামিয়ে দু’জনেই শান্ত হয়ে পরে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু দিনের পর দিন কথা বন্ধ করে রাখা সমস্যার সমাধান নয়। আর যদি সম্পর্কে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা, অপমান, শারীরিক বা যৌন নির্যাতন থাকে, সেটিকে শুধু ‘বোঝাপড়ার অভাব’ বলে দেখলে চলবে না। সেখানে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি।
ভালো সম্পর্কের জন্য শুধু সমস্যার সময়ে কথা বললেই হয় না। ভালো লাগার কথাও বলতে হয়। সঙ্গী কোনও কাজ করলে ধন্যবাদ জানানো, তার পরিশ্রমের প্রশংসা করা, মাঝেমধ্যে নিজের হাতে চা করে দেওয়া, একসঙ্গে হাঁটতে বেরোনো, পুরনো কোনও স্মৃতি নিয়ে গল্প করা—এই ছোট ছোট বিষয় সম্পর্ককে উষ্ণ রাখে। ভালোবাসা শুধু বিশেষ দিনে দামি উপহার দেওয়ার নাম নয়। দৈনন্দিন জীবনের ছোট যত্নেই তার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।
একইভাবে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়েও স্বচ্ছন্দে কথা বলা দরকার। বয়স, কাজের চাপ, সন্তান, শারীরিক পরিবর্তন কিংবা মানসিক চাপ—সবকিছুর প্রভাব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পড়তে পারে। কারও ইচ্ছা বা অস্বস্তিকে উপেক্ষা না করে দু’জনের সম্মতি, স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা দম্পতি-পরামর্শদাতার সাহায্য নেওয়াও কোনও লজ্জার বিষয় নয়।
আর একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনও সম্পর্কই নিখুঁত নয়। প্রত্যেক সম্পর্কের নিজস্ব ওঠাপড়া আছে। কখনও একজন বেশি দুর্বল থাকবেন, কখনও অন্যজন। কখনও একজনের স্বপ্নকে জায়গা দিতে হবে, কখনও অন্যজনের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সম্পর্কের সৌন্দর্য আসলে সবসময় একইভাবে চলার মধ্যে নয়, বরং বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে একসঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতায়।
তাই সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে মনে হলে প্রথমেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া নয়। একটু থামুন। ভাবুন, শেষ কবে মন খুলে কথা বলেছেন? শেষ কবে সঙ্গীর কথা না কেটে শুধু শুনেছেন? শেষ কবে তাঁর কোনও ছোট কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন? কখনও কখনও সম্পর্ককে নতুন করে শুরু করার জন্য বড় কোনও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় একটি আন্তরিক প্রশ্ন—‘তুমি সত্যিই কেমন আছ?’ এবং তার উত্তরের জন্য সত্যিই অপেক্ষা করার মানসিকতা।
সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু ভালোবাসায় নয়, ভালোবাসাকে প্রতিদিনের জীবনে কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে তার উপরও। ভুল বোঝাবুঝি থাকবে, মতের অমিল থাকবে, অভিমানও হবে। কিন্তু তার মাঝেও যদি থাকে সম্মান, বিশ্বাস, কথা বলার জায়গা এবং একে অপরের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা, তাহলে দূরত্ব অনেকটাই কমে আসে। কারণ কাছাকাছি থাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ একই ঘরে থাকা নয় একই অনুভূতির পাশে দাঁড়াতে শেখা।