6th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

শপিং-এর আগে জেনে নিন, এবার পুজোয় কোন রং রয়েছে ট্রেন্ডে?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


পুজোর শপিং শুরু হলেই প্রথম প্রশ্নটা প্রায় একই ‘‘এবার কী রং কিনব?’’ শাড়ির আলমারি খুলে দেখা, গত বছরের লালটা এখনও নতুনের মতো আছে কি না ভাবা, পছন্দের দোকানে গিয়ে একের পর এক রং মেলে ধরা বাঙালির পুজোর প্রস্তুতির সঙ্গে রঙের এই খেলা যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। পুজোর চার দিন তাই শুধু নতুন পোশাকের উৎসব নয়, রঙেরও উৎসব। অষ্টমীর লাল-সাদা থেকে নবমীর গাঢ় রং, দশমীর সিঁদুরে লাল প্রতিটি দিনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আলাদা আবেগ। তবে ফ্যাশনের দুনিয়া প্রতি বছরই সেই চেনা রঙের সঙ্গে যোগ করে নতুন কিছু শেড, নতুন মেলবন্ধন। এবারের পুজোর শপিংয়ে তাই শুধু একটি ‘ট্রেন্ডি’ রঙের পিছনে ছোটা নয়, বরং কোন রং কীভাবে পরবেন, কোন রঙের সঙ্গে কোন রঙ মিলবে এবং আপনার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোন শেডটি মানানসই সেটাও ভাবার সময়। কারণ ফ্যাশনের আসল সৌন্দর্য ট্রেন্ড মেনে চলায় নয়, ট্রেন্ডকে নিজের মতো করে পরতে পারায়।

লাল কি কখনও পুরনো হয়?

পুজোর রঙের তালিকায় লালকে বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে উজ্জ্বল টকটকে লালের পাশাপাশি এবার গাঢ় মেরুন, ওয়াইন, বারগান্ডি, ইটলাল কিংবা পোড়া লালের মতো পরিণত শেডও উৎসবের পোশাকে দারুণ মানাতে পারে। বিশেষ করে সিল্ক, মসলিন, তসর বা জামদানি শাড়িতে এই গাঢ় লাল রং অত্যন্ত আভিজাত্যপূর্ণ দেখায়। অষ্টমীর সকালে লাল পাড় সাদা শাড়ির চিরাচরিত সৌন্দর্য যেমন অমলিন, তেমনই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে গাঢ় মেরুন শাড়ির সঙ্গে অ্যান্টিক গোল্ড গয়না তৈরি করতে পারে একেবারে অন্যরকম আবহ। যাঁরা পুরো পোশাকে লাল পরতে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁরা লাল ব্লাউজ, ব্যাগ, জুতো কিংবা কানের দুলে এই রঙের ছোঁয়া রাখতে পারেন।

অফ-হোয়াইট ও আইভরি:

সাদা পুজোর অন্যতম চিরন্তন রং। কিন্তু সাদা মানেই শুধু কড়া সাদা নয়। আইভরি, ক্রিম, অফ-হোয়াইট, ভ্যানিলা বা হালকা বেইজের মতো উষ্ণ সাদা শেড এখন উৎসবের পোশাকে বেশ আকর্ষণীয়। এই রঙগুলির বড় সুবিধা হল, এগুলিকে প্রায় সব ধরনের গয়না ও কনট্রাস্ট রঙের সঙ্গে মেলানো যায়। অফ-হোয়াইট তাঁতের শাড়ির সঙ্গে গাঢ় লাল ব্লাউজ হতে পারে একেবারে বাঙালি। আবার একই শাড়ির সঙ্গে কালো, বোতল সবুজ বা মেরুন ব্লাউজ দিলে সাজে আসবে আধুনিকতার ছোঁয়া। আইভরি সিল্কের সঙ্গে সোনালি গয়না চাইলে সাজ হয়ে উঠতে পারে নরম অথচ রাজকীয়।

সবুজে ফিরুক উৎসবের সতেজতা:

সবুজের জনপ্রিয়তা নতুন নয়, কিন্তু উৎসবের পোশাকে সবুজের বৈচিত্র্য ক্রমশ বাড়ছে। পিস্তাচিও, সেজ, অলিভ, এমেরাল্ড, বোতল সবুজ—প্রতিটি শেডের আলাদা মেজাজ। দিনের অনুষ্ঠানের জন্য হালকা সবুজ কিংবা প্যাস্টেল শেড, আর সন্ধ্যার জন্য গাঢ় এমেরাল্ড বা বোতল সবুজ বেছে নেওয়া যায়। সবুজ শাড়ির সঙ্গে পুরনো সোনার গয়না বাঙালি সাজে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। আবার সবুজ কুর্তা বা পাঞ্জাবির সঙ্গে অফ-হোয়াইট পায়জামা পরলেও পাওয়া যায় পরিমিত উৎসবের লুক। যাঁরা খুব উজ্জ্বল রং পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্য সবুজ হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

নীলের গভীরতায় সন্ধ্যার সাজ:

নীল এই পুজোয়ও নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারে। বিশেষ করে নেভি, রয়্যাল ব্লু, কোবাল্ট কিংবা নীলচে-বেগুনি শেড সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের জন্য বেশ আকর্ষণীয়। গাঢ় নীল সিল্ক শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট ব্লাউজ এবং ধাতব গয়না দিলে সাজে আসে একটা পরিণত, আধুনিক ভাব। অন্যদিকে আকাশি বা প্যাস্টেল নীল দিনের বেলার পোশাকে অনেক বেশি কোমল দেখায়। কলেজপড়ুয়া কিংবা তরুণীদের জন্য প্যাস্টেল নীল কুর্তা, শাড়ি বা কো-অর্ড সেট হতে পারে আরামদায়ক অথচ ফ্যাশনেবল পছন্দ।

গেরুয়া, কমলা আর মাটির রং:

পুজোর আবহে গেরুয়া, কমলা, হলুদ, পোড়া কমলা কিংবা টেরাকোটা এই উষ্ণ রংগুলির আলাদা আবেদন রয়েছে। শরতের আকাশ, কাশফুল, ধূপের গন্ধ আর পুজোর আলোর সঙ্গে এই রংগুলি যেন স্বাভাবিকভাবেই মিশে যায়। টেরাকোটা বা পোড়া কমলা রঙের শাড়ির সঙ্গে মাটির গয়না কিংবা কাঠের অলংকার ব্যবহার করলে তৈরি হতে পারে একেবারে স্বদেশি আবহ। আবার উজ্জ্বল কমলা পোশাকের সঙ্গে গোল্ড টোনের গয়না দিলে সাজ হয়ে উঠতে পারে আরও উৎসবমুখর।

প্যাস্টেল কি শুধু বসন্তের?

একসময় প্যাস্টেল রংকে মূলত বসন্ত বা গ্রীষ্মের পোশাকের সঙ্গে ভাবা হত। এখন সেই ধারণা বদলেছে। প্যাস্টেল গোলাপি, ল্যাভেন্ডার, মিন্ট, পাউডার ব্লু বা হালকা পিচ, উৎসবের পোশাকেও জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে হালকা কাজ করা শাড়ি বা সমকালীন কাটের পোশাকে প্যাস্টেল রং অত্যন্ত পরিশীলিত দেখায়। তবে প্যাস্টেল পোশাকের সঙ্গে গয়না বাছার সময় ভারসাম্য জরুরি। খুব ভারী গয়নার বদলে মুক্তো, সূক্ষ্ম সোনার গয়না কিংবা মিনিমাল অলংকার অনেক সময় বেশি সুন্দর দেখায়। অবশ্য রাতের অনুষ্ঠানে চাইলে কনট্রাস্ট গয়না বা ধাতব ক্লাচ দিয়ে সাজকে একটু বেশি জমকালো করা যায়।

কালোও হোক পুজোর রঙ:

‘‘পুজোয় কালো পরা যায় না’’ এই পুরনো ধারণা এখন অনেকটাই বদলেছে। যদিও অনেকে এখনও ঐতিহ্যের কারণে পুজোর নির্দিষ্ট দিনে কালো এড়িয়ে চলেন, ফ্যাশনের দুনিয়ায় কালো কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী একটি উৎসবের রং। কালো শাড়ির সঙ্গে সোনালি পাড়, কালো ব্লাউজের সঙ্গে উজ্জ্বল শাড়ি কিংবা কালো কুর্তার সঙ্গে ধাতব অলংকার, সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে। যাঁরা একটু সাহসী সাজ পছন্দ করেন, তাঁরা কালোর সঙ্গে মেরুন, লাল, এমেরাল্ড বা সোনালি ব্যবহার করতে পারেন। তবে পুজোর দিনে পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতিকেও অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শুধু শাড়ি নয়, পুরুষদের পোশাকেও রঙের খেলা:

পুজোর ফ্যাশন মানেই শুধু মেয়েদের শাড়ি নয়। পুরুষদের পাঞ্জাবি, কুর্তা, ধুতি, শার্ট কিংবা নেহরু জ্যাকেটেও রঙের বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। অফ-হোয়াইট, ক্রিম, মেরুন, সবুজ, নীল, সর্ষে, টেরাকোটা সবই উৎসবের পোশাকে ব্যবহার করা যায়। সাদা বা ক্রিম পাঞ্জাবির সঙ্গে মেরুন বা সবুজ জ্যাকেট হতে পারে ক্লাসিক পছন্দ। আবার গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির সঙ্গে সাদা পায়জামা রাখলে সাজে ভারসাম্য আসে। খুব বেশি রঙ একসঙ্গে ব্যবহার না করে পোশাকের একটি রংকে প্রধান রেখে অন্য রংকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই ভালো।

মা-মেয়ের সাজে একই রং?

পুজোর ছবি তোলার জন্য মা-মেয়ের একই রঙের পোশাকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কিন্তু একেবারে একই শাড়ি বা একই ডিজাইন না পরে একই রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করলে সাজ আরও আকর্ষণীয় হতে পারে। যেমন মায়ের পরনে গাঢ় মেরুন শাড়ি আর মেয়ের পোশাকে প্যাস্টেল গোলাপি সঙ্গে মেরুনের ছোঁয়া। অথবা মায়ের অফ-হোয়াইট শাড়ির সঙ্গে মেয়ের পোশাকে লাল-সাদা সমন্বয়। এতে দু’জনের পোশাকের মধ্যে মিলও থাকে, আবার প্রত্যেকের নিজস্ব স্টাইলও বজায় থাকে।

রং মিলবে, না কনট্রাস্ট?

পুজোর পোশাকে ‘ম্যাচিং’ এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। বরং কনট্রাস্ট অনেক সময় সাজকে আরও আকর্ষণীয় করে। তবে কনট্রাস্ট মানেই একসঙ্গে অনেক রং নয়। একটি প্রধান রঙের সঙ্গে একটি বিপরীত বা পরিপূরক রং ব্যবহার করলেই যথেষ্ট। যেমন মাস্টার্ড ইয়োলো শাড়ির সঙ্গে বেগুনি ব্লাউজ, সবুজের সঙ্গে মেরুন, নীলের সঙ্গে আইভরি কিংবা লালের সঙ্গে গোলাপি সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করলে এই ধরনের সমন্বয় অত্যন্ত সুন্দর হতে পারে। পোশাকের রং যত উজ্জ্বল হবে, গয়না ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিস ততটাই সংযত রাখলে সামগ্রিক সাজ ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

ত্বকের রং অনুযায়ী কীভাবে বাছবেন?

‘এই রং ফর্সাদের জন্য’ বা ‘ওই রং কালো ত্বকে মানে না’ এ ধরনের কঠোর নিয়ম ফ্যাশনে নেই। একই রংয়ের বিভিন্ন শেড বিভিন্ন ত্বকের টোনে আলাদা দেখাতে পারে। তাই দোকানে পোশাক পছন্দ করার সময় শুধু কৃত্রিম আলোয় নয়, সম্ভব হলে দিনের আলোতেও রংটি কেমন লাগছে দেখে নেওয়া ভালো। যে রং পরে নিজেকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়, সেটিই আপনার জন্য সেরা। কারও গায়ে উজ্জ্বল লাল অসাধারণ লাগতে পারে, আবার অন্য কেউ মেরুন বা ইটলালে বেশি স্বচ্ছন্দ হতে পারেন। ফ্যাশনের মূল কথাই হল নিজের বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনা।

রং গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুজোর পোশাক কেনার সময় কাপড়ের আরামকে ভুলে গেলে চলবে না। কারণ পুজোয় পোশাক পরে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়। শাড়ি বা পোশাক দেখতে যতই সুন্দর হোক, সেটি যদি অস্বস্তিকর হয়, তাহলে পুরো সাজটাই বিরক্তিকর হয়ে উঠবে। দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে তুলনামূলক আরামদায়ক ও বাতাস চলাচল করে এমন কাপড় বেছে নেওয়া ভালো। রাতের অনুষ্ঠান বা বিশেষ দিনের জন্য সিল্ক, মখমল বা ভারী কাজের পোশাক রাখা যায়। পোশাকের ওজন, ব্লাউজের ফিট, পেটিকোট বা ইনারের আরাম সবকিছু শপিংয়ের সময় বিবেচনা করা উচিত।

এবার শপিং ব্যাগে কোন রং?

সব পোশাকের সঙ্গে নতুন ব্যাগ কেনার প্রয়োজন নেই। একটি নিরপেক্ষ রঙের ব্যাগ যেমন আইভরি, বেইজ, কালো, ট্যান বা ধাতব শেড বিভিন্ন পোশাকের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। আবার বিশেষ দিনের জন্য পোশাকের কনট্রাস্ট রঙের ছোট ক্লাচ পুরো সাজকে বদলে দিতে পারে। জুতোর ক্ষেত্রেও একই কথা। খুব বেশি উঁচু হিল পরে প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা করলে পায়ের উপর চাপ পড়তে পারে। আরামদায়ক জুতো বেছে নিয়ে তাতেও রঙের ছোঁয়া দেওয়া যায়।

ট্রেন্ড আপনার, নাকি আপনি ট্রেন্ডের?

ফ্যাশন প্রতি মরসুমে বদলায়। আজ যে রং ট্রেন্ডে, কয়েক মাস পর সেটিই হয়তো আর আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে না। কিন্তু আপনার আলমারির প্রিয় শাড়িটি হয়তো বছর দশেক পরেও আপনার কাছে বিশেষ থাকবে। তাই পুজোর শপিংয়ে শুধু ‘এবার কী চলছে’ না ভেবে ‘আমার কী ভালো লাগে’ এই প্রশ্নটিও করুন। লাল, সাদা, মেরুন, সবুজ, নীল, গেরুয়া কিংবা প্যাস্টেল—যে রংই বেছে নিন, সেটিকে নিজের মতো করে পরুন। ঐতিহ্যের সঙ্গে সামান্য নতুনত্ব মিশিয়ে তৈরি করুন নিজের পুজোর সাজ। কারণ শেষ পর্যন্ত ট্রেন্ডের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা একটাই, যে পোশাকে আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হয়, ‘‘হ্যাঁ, এটাই তো আমি!’’

Archive

Most Popular