স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
পুজোর কটা দিন যেন সময়ের হিসেবটাই বদলে দেয়। সকাল শুরু হয় তাড়াতাড়ি, দিন কাটে প্যান্ডেল, আড্ডা আর ঘোরাঘুরিতে, আর রাত শেষ হয় অনেক পরে। তার সঙ্গে থাকে একের পর এক সাজ, মেকআপ, ধুলোবালি, ঘাম, রোদ, রাতজাগা, অনিয়মিত খাওয়া আর পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব। ফলে পুজো শেষ হওয়ার কয়েকদিন পর আয়নার সামনে দাঁড়ালে অনেকেরই মনে হয়, ত্বকটা যেন আগের মতো নেই। কোথাও শুষ্কতা, কোথাও অতিরিক্ত তেল, ছোট ছোট ব্রণ, মলিন ভাব কিংবা চোখের তলায় ক্লান্তির ছাপ।
এই সময় ত্বককে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার জন্য দরকার না কোনও জটিল দশ ধাপের রুটিন, না একসঙ্গে অনেক নতুন প্রসাধনী। বরং ত্বককে কিছুদিন বিশ্রাম দেওয়া, নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনা এবং রোদ থেকে সুরক্ষা দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শেও অতিরিক্ত প্রসাধনীর বদলে নিয়মিত ও সহজ পরিচর্যার ওপরই জোর দেওয়া হয়।
পুজোর পরে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসটি হল—মেকআপ নিয়ে কখনও ঘুমোবেন না। যতই রাত হোক, যতই ক্লান্ত লাগুক, ঘুমোনোর আগে মুখের মেকআপ সম্পূর্ণ তুলে ফেলুন। শুধু মুখের ফাউন্ডেশন বা লিপস্টিক নয়, চোখের মেকআপও ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মেকআপ রেখে ঘুমালে ত্বকে ব্রণ বা অন্যান্য সমস্যা বাড়তে পারে।
তবে মেকআপ তোলার সময় ত্বককে ঘষে পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না। মেকআপ তুলতে গিয়ে অনেকেই তুলো বা কাপড় দিয়ে বারবার ঘষেন। এতে ত্বকে অপ্রয়োজনীয় জ্বালা ও সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে। বরং ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত মেকআপ রিমুভার ব্যবহার করে আলতোভাবে মেকআপ তুলে নিন। তারপর একটি মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা মুখ পরিষ্কার করার সময় ঘষাঘষি না করে আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন।
পুজোর পরে ত্বক যদি একটু নিস্তেজ বা শুষ্ক মনে হয়, তাহলে বারবার মুখ ধোয়ার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত পরিষ্কার করতে গিয়ে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাধারণভাবে সকালে এবং রাতে মুখ পরিষ্কার করা যথেষ্ট; অতিরিক্ত ঘাম হলে তখনও মুখ পরিষ্কার করা যেতে পারে।
মুখ পরিষ্কার করার পরের ধাপ হল আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনা। ত্বক তৈলাক্ত হলেও ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা, নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া যায়। ত্বক খুব শুষ্ক হলে একটু বেশি ময়েশ্চারাইজিং ফর্মুলা প্রয়োজন হতে পারে। মুখ ধোয়ার পর ত্বক সামান্য স্যাঁতসেঁতে থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগালে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।পুজোর সময় বাইরে বেরোনো কমে না, বরং বেড়ে যায়। তাই পুজো শেষ হয়েছে বলে সানস্ক্রিনের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। দিনের বেলা বাইরে বেরোলে ব্রড-স্পেকট্রাম SPF ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে নির্দেশ অনুযায়ী পুনরায় প্রয়োগ করাও জরুরি।
পুজোর পরে হঠাৎ ত্বক খারাপ দেখে নতুন কোনও শক্তিশালী অ্যাকটিভ উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার শুরু করাও ঠিক নয়। রেটিনল, বিভিন্ন অ্যাসিড, শক্তিশালী এক্সফোলিয়েটর বা একাধিক নতুন পণ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা বা লালচে ভাব বাড়তে পারে। ত্বকের যত্নে বেশি পণ্য মানেই বেশি ফল নয়; বরং ধারাবাহিক, সহজ রুটিন অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।বিশেষ করে পুজোর পর মুখে ছোট ছোট দানা বা ব্রণ দেখা দিলে বারবার স্ক্রাব করার প্রবণতা এড়িয়ে চলুন। ‘ময়লা বের করে দিতে হবে’ ভেবে ত্বক ঘষে পরিষ্কার করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। ব্রণপ্রবণ ত্বকের জন্য মেকআপ ও ত্বকের যত্নের পণ্য বাছার সময় ‘নন-কমেডোজেনিক’, ‘অয়েল-ফ্রি’ বা ‘পোরস ক্লগ করে না’ ধরনের উল্লেখ থাকা পণ্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
শুধু মুখ নয়, চোখের চারপাশের ত্বকের দিকেও নজর দিন। পুজোর রাতজাগার সবচেয়ে স্পষ্ট ছাপ অনেক সময় চোখের নীচেই দেখা যায়। কয়েকদিন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত জলপান এবং রাতে স্ক্রিনের সময় কমানোর অভ্যাস শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে সাহায্য করতে পারে। চোখের নীচে অতিরিক্ত প্রসাধনী বা অজানা ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
পুজোর পরে ত্বকের যত্নে ঘুমকে তাই কোনওভাবেই ছোট করে দেখা যাবে না। রাতজাগার কয়েকটি দিনের পর শরীরকে আবার নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসে ফিরিয়ে আনুন। একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং ওঠার চেষ্টা করুন। শুধু ত্বকের জন্য নয়, শরীর ও মনের সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও পর্যাপ্ত বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ।খাবারের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। পুজোর সময় মিষ্টি, ভাজাভুজি, অতিরিক্ত নোনতা খাবার বা বাইরে খাওয়া বেড়ে যেতেই পারে। পুজোর পরে হঠাৎ না খেয়ে থাকার বদলে স্বাভাবিক, সুষম খাবারে ফিরে আসুন। শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং নিয়মিত জলপানকে খাবারের অংশ করুন। ত্বক ভালো রাখার জন্য কোনও একটি ‘ম্যাজিক’ খাবার বা ডিটক্স পানীয়ের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
মেকআপের সরঞ্জামগুলিকেও ভুললে চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা মেকআপ ব্রাশ, স্পঞ্জ বা অ্যাপ্লিকেটরে মেকআপের অবশিষ্টাংশের সঙ্গে তেল, মৃত কোষ ও জীবাণু জমতে পারে। নিয়মিত ব্রাশ পরিষ্কার করা এবং মেকআপ বা অ্যাপ্লিকেটর অন্যের সঙ্গে ভাগ না করাই ভালো। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজি ব্রাশ পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ দিন অন্তর পরিষ্কার করার পরামর্শ দেয়।
একইভাবে পুরনো মেকআপের দিকেও নজর দিন। কোনও প্রসাধনীর গন্ধ, রং বা গঠন বদলে গেলে কিংবা সেটি দীর্ঘদিন ধরে খোলা অবস্থায় থাকলে ব্যবহার করার আগে প্রস্তুতকারকের নির্দেশিত ব্যবহারের সময়সীমা দেখে নিন। প্রসাধনী পরিষ্কার, শুকনো জায়গায়, অতিরিক্ত গরম বা সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখা উচিত।পুজোর পরে ত্বকের যত্নে একটি ছোট্ট ‘স্কিন রিসেট’ রুটিন তৈরি করা যায়। সকালে মৃদু ক্লিনজার, প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন। রাতে মেকআপ সম্পূর্ণ তুলে মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার। কয়েকদিন এই সহজ রুটিন মেনে চলার পরও যদি ত্বকের নির্দিষ্ট সমস্যা থাকে, তখন প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রত্যেকের ত্বক একরকম নয়। কারও ত্বক পুজোর পরে শুষ্ক হয়ে যায়, কারও তেলতেলে, আবার কারও সংবেদনশীলতা বা ব্রণ বাড়তে পারে। তাই বন্ধুর রুটিন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনও জনপ্রিয় পদ্ধতি নিজের ত্বকে হুবহু প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। নতুন কোনও পণ্য ব্যবহার করতে হলে বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে আগে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়া নিরাপদ অভ্যাস।ত্বকে যদি দীর্ঘস্থায়ী লালচে ভাব, জ্বালা, ফুসকুড়ি, অস্বাভাবিক চুলকানি, বেদনাদায়ক ব্রণ বা অন্য কোনও সমস্যা দেখা দেয় এবং তা কমতে না চায়, তাহলে নিজের মতো করে একের পর এক পণ্য ব্যবহার না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। কারণ সব সমস্যা শুধু ‘পুজোর ক্লান্তি’ নয়; কখনও নির্দিষ্ট ত্বকের সমস্যার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
পুজোর সাজের সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, কয়েকদিনের জন্য আমরা নিজেদের একটু অন্যভাবে দেখি। নতুন শাড়ি, নতুন গয়না, চোখে কাজল, ঠোঁটে রং—সব মিলিয়ে উৎসবের সাজে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। তাই পুজো শেষ হওয়ার পর ত্বককে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার অর্থ সাজগোজকে অস্বীকার করা নয়। বরং সেই ত্বককেই একটু বিশ্রাম দেওয়া, যে ত্বক এতদিন ধরে উৎসবের সমস্ত রঙ বহন করেছে।
পুজোর পর তাই ত্বকের জন্য দরকার কম, কিন্তু নিয়মিত যত্ন। মেকআপ তুলে ঘুম, মৃদু ক্লিনজিং, প্রয়োজনমতো ময়েশ্চারাইজিং, নিয়মিত সানস্ক্রিন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাবার এবং পরিষ্কার মেকআপ সরঞ্জাম—এই কয়েকটি অভ্যাসই হতে পারে আপনার ‘পোস্ট-পুজো স্কিন রিকভারি’ রুটিনের ভিত্তি।
উৎসবের রং মুছে গেলেও ত্বকে তার ক্লান্তির ছাপ যেন থেকে না যায়। পুজোর পরে তাই একটু থামুন, ত্বককে বিশ্রাম দিন, নিজের যত্নে ফিরুন—কারণ সুন্দর ত্বকের সবচেয়ে বড় রহস্য অনেক সময় অতিরিক্ত কিছু নয়, বরং নিয়মিত ও কোমল যত্ন।