বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
শীত মানেই ঘরে ফেরার আলাদা আনন্দ। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা নরম রোদ, উষ্ণ রঙের পর্দা, নরম কম্বল, মোমবাতির আলো আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি—সব মিলিয়ে বাড়ির প্রতিটি কোণ হয়ে উঠতে পারে আরও আরামদায়ক। নতুন করে আসবাব কেনা কিংবা বড়সড় সংস্কারের প্রয়োজন নেই। সামান্য কিছু পরিবর্তন, সঠিক রং এবং সৃজনশীল সাজসজ্জাতেই আপনার অন্দরমহল পেতে পারে এক নতুন শীতকালীন রূপ।শীতের সকাল যেন একটু বেশি অলস, একটু বেশি মায়াময়। জানলার কাচে হালকা কুয়াশা, বারান্দায় জমে থাকা শিশির, রোদ পোহানোর জন্য পরিবারের সকলের একসঙ্গে বসে পড়া—শীতের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলিই বাড়িকে করে তোলে আরও আপন। গরমকালে যে ঘরটি ছিল খোলামেলা ও উজ্জ্বল, শীতের আগমনে সেই ঘরেই আমরা খুঁজি একটু উষ্ণতা, আরাম আর নিরিবিলি আশ্রয়। তাই ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির অন্দরসজ্জাতেও আসতে পারে সামান্য পরিবর্তন।
অন্দরসজ্জা মানেই দামি আসবাব, নতুন রং কিংবা বিপুল খরচ নয়। বরং ঘরের পরিচিত জিনিসগুলিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা, কাপড়ের রং বদলানো, আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করা এবং অব্যবহৃত কোণগুলিকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সুন্দর ঘর সাজানোর কৌশল। শীতের অন্দরমহল সাজানোর মূল মন্ত্র হল আরাম, উষ্ণতা এবং ব্যক্তিগত রুচির মেলবন্ধন।
রঙের ছোঁয়ায় বদলে দিন ঘরের মেজাজ
শীতের অন্দরসজ্জায় রঙের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গরমকালে যেখানে সাদা, হালকা নীল, মিন্ট কিংবা প্যাস্টেল শেডের ব্যবহার বেশি দেখা যায়, শীতকালে সেখানে একটু গাঢ় ও উষ্ণ রং ঘরে অন্যরকম আবহ তৈরি করতে পারে। মেরুন, মাস্টার্ড ইয়েলো, অলিভ গ্রিন, টেরাকোটা, রাস্ট, চকোলেট ব্রাউন কিংবা বারগান্ডির মতো রং ঘরকে দিতে পারে আরামদায়ক ও পরিশীলিত চেহারা।তবে ঘরের প্রতিটি দেওয়াল কিংবা আসবাবের রং বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। একটি বিশেষ দেওয়ালে রঙিন ওয়াল আর্ট, সোফার উপর নতুন কুশন কভার কিংবা জানলায় গাঢ় রঙের পর্দা ব্যবহার করলেই ঘরের চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। যাঁরা একটু মিনিমাল বা সাদামাটা সাজ পছন্দ করেন, তাঁরা বেইজ, ক্রিম, অফ হোয়াইট এবং উডেন ব্রাউনের সঙ্গে একটি উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করতে পারেন। এতে ঘর যেমন শান্ত ও পরিপাটি দেখাবে, তেমনই শীতের উষ্ণ আবহও বজায় থাকবে।
রঙের পাশাপাশি কাপড়ের টেক্সচারও গুরুত্বপূর্ণ। মসৃণ কাপড়ের বদলে বোনা নকশার কুশন কভার, মোটা কাপড়ের পর্দা কিংবা নরম থ্রো ব্যবহার করলে ঘরে আরামের অনুভূতি বাড়ে। একই রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করেও তৈরি করা যায় আকর্ষণীয় সাজ।
সোফার সাজে আসুক নতুনত্ব
বসার ঘর বা লিভিং রুম হল বাড়ির এমন একটি জায়গা, যেখানে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটান এবং অতিথিদেরও আপ্যায়ন করা হয়। তাই শীতের সাজে এই ঘরটির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। নতুন সোফা কেনার দরকার নেই। পুরনো সোফার উপর কয়েকটি সুন্দর কুশন, একটি নরম থ্রো এবং ছোট্ট কার্পেটই যথেষ্ট।
সোফার রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কুশন বেছে নিন। একই ধরনের কুশন না রেখে বিভিন্ন আকার ও টেক্সচারের কুশন ব্যবহার করতে পারেন। একটি বড় সলিড কালারের কুশনের পাশে ছোট জ্যামিতিক নকশার কুশন কিংবা হাতে বোনা কুশন কভার রাখলে সাজে বৈচিত্র্য আসে। শীতের জন্য উলের বোনা থ্রো বা নরম ফ্লিসের কম্বল সোফার এক পাশে সুন্দরভাবে ভাঁজ করে রাখা যেতে পারে।সোফার সামনে ছোট একটি কাঠের কফি টেবিল থাকলে তার উপর সাজিয়ে রাখুন পছন্দের কয়েকটি বই, ছোট ফুলদানি কিংবা একটি সুন্দর ট্রে। ট্রের মধ্যে কফির মগ, সুগন্ধি মোমবাতি এবং ছোট্ট ডেকোরেটিভ সামগ্রী রাখলে ঘরটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তবে টেবিলের উপর অতিরিক্ত জিনিস জমিয়ে রাখবেন না। সাজের পাশাপাশি ব্যবহারিক সুবিধাও বজায় রাখা জরুরি।
জানলার পাশে তৈরি হোক ছোট্ট রোদপোহানোর কোণ
শীতের নরম রোদ উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। বাড়িতে যদি বড় জানলা থাকে, তবে তার পাশের জায়গাটিকে সাজিয়ে তুলুন একটি ছোট্ট সান কর্নার হিসেবে। জানলার পাশে একটি আরামদায়ক চেয়ার, ছোট সাইড টেবিল, নরম কুশন এবং একটি হালকা কম্বল রাখলেই তৈরি হয়ে যাবে নিজের মতো সময় কাটানোর সুন্দর জায়গা।এখানে বসে বই পড়া, চা বা কফি খাওয়া, গান শোনা কিংবা নিছক বাইরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। জায়গা কম থাকলে জানলার ধারে একটি ছোট বেঞ্চ বা ফ্লোর কুশনও ব্যবহার করতে পারেন। সঙ্গে একটি ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট রাখলে কোণটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
তবে জানলা দিয়ে সরাসরি রোদ আসার সময় ঘরের গাছের অবস্থান ও পর্দার ব্যবহার খেয়াল রাখুন। সব গাছ সরাসরি রোদ সহ্য করতে পারে না। আবার অতিরিক্ত ঠান্ডা হাওয়া ঢুকলে গাছের ক্ষতি হতে পারে। তাই গাছের প্রয়োজন বুঝে তাদের জায়গা নির্বাচন করুন।
আলো-ছায়ার খেলায় তৈরি করুন উষ্ণ আবহ
ঘরের পরিবেশ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আলোর গুরুত্ব অনেক। শুধু একটি উজ্জ্বল টিউবলাইট বা সিলিং লাইটের উপর নির্ভর না করে ঘরের বিভিন্ন অংশে আলাদা আলোর ব্যবস্থা করতে পারেন। ল্যাম্পশেড, টেবিল ল্যাম্প, ফ্লোর ল্যাম্প কিংবা ছোট ডেকোরেটিভ লাইট ঘরে নরম আলো তৈরি করে।
শীতের সন্ধ্যায় লিভিং রুমে উষ্ণ সাদা আলো ব্যবহার করলে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। পড়ার জায়গায় অবশ্য পর্যাপ্ত উজ্জ্বল আলো থাকা প্রয়োজন। শোওয়ার ঘরে বেডসাইড ল্যাম্প ব্যবহার করতে পারেন, যাতে ঘুমের আগে বই পড়া বা প্রয়োজনীয় কাজ করা সহজ হয়।ডাইনিং টেবিলের উপর ঝুলন্ত পেনডেন্ট লাইটও ঘরের সাজে আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আলো যেন চোখে সরাসরি না লাগে এবং প্রয়োজনীয় জায়গাগুলি যথেষ্ট আলোকিত থাকে, তা নিশ্চিত করুন। সাজের জন্য মোমবাতি ব্যবহার করতে চাইলে নিরাপদ স্থানে রাখুন এবং জ্বলন্ত অবস্থায় কখনও অদেখা ফেলে রাখবেন না। শিশু ও পোষ্য থাকলে ব্যাটারিচালিত LED মোমবাতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
কার্পেট ও রাগে বাড়ুক আরামের অনুভূতি
শীতের অন্দরসজ্জায় কার্পেট বা রাগের ব্যবহার ঘরকে শুধু সুন্দরই করে না, মেঝের ঠান্ডা অনুভূতিও কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে মার্বেল বা টাইলসের মেঝেতে শীতকালে হাঁটতে অস্বস্তি হতে পারে। তাই লিভিং রুম, বেডরুম কিংবা বসার জায়গায় একটি সুন্দর রাগ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘরের আসবাবের রং ও মাপ অনুযায়ী কার্পেট বেছে নিন। ছোট ঘরে খুব বড় ও গাঢ় নকশার কার্পেট ব্যবহার করলে ঘর আরও ছোট দেখাতে পারে। বরং হালকা রঙের বা সরল নকশার রাগ ঘরকে খোলামেলা দেখাতে সাহায্য করে। বড় লিভিং রুমে সোফা ও কফি টেবিলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বড় কার্পেট ব্যবহার করা যায়।তবে কার্পেট পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। ধুলো, পোষ্যের লোম কিংবা আর্দ্রতা জমে থাকলে অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে। নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং কার্পেট ভিজে গেলে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। যাঁদের বাড়িতে ছোট শিশু বা বয়স্ক মানুষ রয়েছেন, তাঁরা এমন রাগ বেছে নিন যার নীচে অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট রয়েছে, যাতে পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।
শোওয়ার ঘরে থাকুক হোটেল-স্টাইলের আরাম
শীতের রাতে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হল নিজের শোওয়ার ঘর। তাই বেডরুমের সাজে আরামকে অগ্রাধিকার দিন। বিছানার চাদর বদলে নরম ও আরামদায়ক কাপড়ের বেডশিট ব্যবহার করতে পারেন। কটন ফ্ল্যানেল বা উপযুক্ত উষ্ণ কাপড়ের বেডিং শীতের জন্য আরামদায়ক হতে পারে।
বিছানার উপর একটি সুন্দর কমফর্টার বা ডুভে রাখুন। তার সঙ্গে কয়েকটি সাজানো কুশন ও বেড থ্রো ব্যবহার করলে ঘর পাবে পরিপাটি হোটেল-স্টাইলের চেহারা। তবে শুধু সাজের জন্য অতিরিক্ত কুশন ব্যবহার করলে ঘুমের সময় অসুবিধা হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কুশনের সংখ্যা ঠিক করুন।
বেডসাইড টেবিলে একটি ছোট ল্যাম্প, বই, ঘড়ি এবং প্রয়োজনীয় জিনিস রাখুন। ঘুমের আগে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় কমাতে চাইলে বিছানার পাশে বই রাখার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। শোওয়ার ঘরে অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে না রেখে যতটা সম্ভব পরিষ্কার ও গোছানো রাখুন। এতে ঘুমের পরিবেশও ভালো থাকবে।
ডাইনিং স্পেসে শীতের উৎসব
শীত মানেই নানা রকম খাওয়াদাওয়া, পারিবারিক আড্ডা এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। তাই ডাইনিং স্পেসেও আসতে পারে সামান্য পরিবর্তন। ডাইনিং টেবিলে একটি সুন্দর রানার ব্যবহার করুন। টেবিলের মাঝখানে ছোট ফুলদানি, কাঠের বাটি কিংবা মরশুমি ফুল দিয়ে সাজাতে পারেন।
শীতের দুপুরে পরিবারের সকলে একসঙ্গে খেতে বসলে টেবিলের সাজও যেন আমন্ত্রণ জানায়। সিরামিক বা মাটির বাসন, কাঠের সার্ভিং বোর্ড এবং উষ্ণ রঙের ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারেন। তবে টেবিলের মাঝখানে এমন কোনও বড় সাজসজ্জার সামগ্রী রাখবেন না, যাতে খাবার পরিবেশন বা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে অসুবিধা হয়।ছোট ডাইনিং স্পেস হলে দেয়ালে একটি সুন্দর আয়না ব্যবহার করতে পারেন। আয়না আলো প্রতিফলিত করে ঘরকে তুলনামূলক বড় ও উজ্জ্বল দেখাতে সাহায্য করে। তবে আয়নাটি এমন জায়গায় রাখুন, যাতে তাতে ঘরের সুন্দর অংশের প্রতিফলন দেখা যায়।
অন্দরসজ্জায় প্রকৃতির ছোঁয়া
ইনডোর প্ল্যান্ট ঘরের পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শীতের অন্দরসজ্জায় গাছের ব্যবহার বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, পিস লিলি কিংবা অন্যান্য উপযুক্ত ইনডোর প্ল্যান্ট ঘরের কোণে, জানলার পাশে অথবা ছোট শেলফে রাখা যায়। তবে প্রতিটি গাছের আলো, জল এবং তাপমাত্রার প্রয়োজন আলাদা। তাই গাছ কেনার আগে তার পরিচর্যার নিয়ম জেনে নিন।
গাছ রাখার জন্য মাটির টব, সিরামিক প্ল্যান্টার কিংবা বেতের ঝুড়ি ব্যবহার করতে পারেন। একই ধরনের টবের বদলে বিভিন্ন মাপের টব একসঙ্গে সাজালে সুন্দর ভিজ্যুয়াল তৈরি হয়। তবে গাছের নীচে জল জমতে দেবেন না। অতিরিক্ত জল দেওয়ার ফলে শিকড় পচে যেতে পারে। ঘরের ভিতরে গাছ রাখলে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা বজায় রাখুন এবং শুকনো পাতা নিয়মিত সরিয়ে ফেলুন।শুধু টবের গাছ নয়, মরশুমি ফুল দিয়েও ঘরের সাজ বদলানো যায়। ফুলদানিতে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা কিংবা অন্যান্য তাজা ফুল রাখলে ঘরে আসে উৎসবের আবহ। ফুলের জল নিয়মিত বদলাতে ভুলবেন না।
ছোট ঘর সাজানোর স্মার্ট কৌশল
শহরের ফ্ল্যাটে জায়গার অভাব এখন অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। কিন্তু ছোট ঘর মানেই যে সুন্দর অন্দরসজ্জা সম্ভব নয়, তা একেবারেই ঠিক নয়। বরং অল্প জায়গায় পরিকল্পিত সাজই বেশি কার্যকর।দেওয়ালের উচ্চতা ব্যবহার করে ওয়াল শেলফ তৈরি করতে পারেন। সেখানে বই, ছোট গাছ, ফটোফ্রেম কিংবা পছন্দের শোপিস সাজিয়ে রাখুন। এতে মেঝেতে জায়গা বাঁচবে। স্টোরেজ-যুক্ত বেঞ্চ, ড্রয়ার-সহ কফি টেবিল কিংবা বেডের নীচে স্টোরেজ বক্স ব্যবহার করলেও ঘর গোছানো রাখা সহজ হবে।
ভাঁজ করা যায় এমন চেয়ার, ছোট সাইড টেবিল এবং বহুমুখী আসবাব ছোট ঘরের জন্য বেশ কার্যকর। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাব কিনবেন না। ঘরের চলাচলের জায়গা খোলা রাখা জরুরি। হালকা রঙের দেওয়াল, আয়না এবং পর্যাপ্ত আলো ঘরকে তুলনামূলক বড় দেখাতে সাহায্য করে।
পুরনো জিনিসেই নতুন সাজ
ঘর সাজানোর জন্য সবসময় নতুন জিনিস কেনার প্রয়োজন নেই। পুরনো শাড়ি দিয়ে কুশন কভার, টেবিল রানার কিংবা দেওয়ালের ফ্যাব্রিক আর্ট তৈরি করা যেতে পারে। কাঠের পুরনো বাক্সকে রং করে স্টোরেজ বক্স বা ছোট সাইড টেবিল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পুরনো কাচের বোতল পরিষ্কার করে ফুলদানি বানানোও বেশ সুন্দর একটি ভাবনা।
পরিবারের পুরনো ছবি, হাতে আঁকা ছবি কিংবা স্মৃতিমাখা কোনও সামগ্রী দিয়ে একটি ছোট মেমোরি কর্নার তৈরি করতে পারেন। দেওয়ালে একই রকম ফ্রেমে কয়েকটি ছবি সাজিয়ে দিলে তা ঘরের ব্যক্তিগত পরিচয় হয়ে উঠবে। দাদু-ঠাকুমার পুরনো ঘড়ি, মায়ের ব্যবহার করা পিতলের ফুলদানি কিংবা কোনও পুরনো কাঠের বাক্স—এসবের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে পরিবারের ইতিহাস।এই ধরনের সাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে খরচ কম হয় এবং ঘরের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ট্রেন্ডের পিছনে না ছুটে নিজের পছন্দ ও স্মৃতিকে গুরুত্ব দিন।
শীতের সুগন্ধে ভরে উঠুক ঘর
ঘরের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়, ঘ্রাণের সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শীতের সন্ধ্যায় ঘরে হালকা সুগন্ধ থাকলে পরিবেশ আরও মনোরম লাগে। সুগন্ধি মোমবাতি, রিড ডিফিউজার কিংবা উপযুক্ত রুম ফ্রেশনার ব্যবহার করতে পারেন। দারুচিনি, কমলালেবুর খোসা কিংবা লবঙ্গের মতো পরিচিত উপাদানের মৃদু সুগন্ধও অনেকের কাছে শীতের আবহ তৈরি করে।
তবে সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও অ্যালার্জির বিষয়টি মাথায় রাখুন। অতিরিক্ত সুগন্ধি ঘরে ব্যবহার করবেন না। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, পোষ্য কিংবা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে এমন সদস্য থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বজায় রাখুন। সুগন্ধ দিয়ে ঘরের স্যাঁতসেঁতে ভাব বা দুর্গন্ধ ঢাকার চেষ্টা না করে তার মূল কারণ খুঁজে বের করুন।
বারান্দায় তৈরি হোক শীতের ছোট্ট আশ্রয়
বাড়ির বারান্দা অনেক সময় অবহেলায় পড়ে থাকে। অথচ সামান্য সাজেই সেটি হয়ে উঠতে পারে শীতের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। একটি ছোট চেয়ার, ভাঁজ করা টেবিল, কয়েকটি টব এবং নরম আলো দিয়ে তৈরি করুন নিজের মতো একটি কোণ। সকালে রোদ পোহানো কিংবা সন্ধ্যায় চা খাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে!বারান্দায় জায়গা কম থাকলে রেলিং প্ল্যান্টার, ওয়াল হ্যাঙ্গিং পট কিংবা উল্লম্ব গাছের স্ট্যান্ড ব্যবহার করুন। শীতের উপযোগী ফুলের গাছ লাগাতে পারেন। তবে গাছের টব এমনভাবে রাখুন, যাতে বাতাসে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে এবং জল দেওয়ার সময় নীচের বাড়িতে অসুবিধা না হয়।বারান্দায় ছোট ফেয়ারি লাইট ব্যবহার করলে সন্ধ্যায় সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। তবে বৈদ্যুতিক সংযোগ যেন জল ও আর্দ্রতা থেকে নিরাপদ থাকে, তা নিশ্চিত করুন।
সাজের পাশাপাশি চাই পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা
শীতের অন্দরসজ্জায় মোটা পর্দা, কার্পেট, কম্বল ও কুশনের ব্যবহার বাড়ে। এগুলিতে সহজেই ধুলো জমতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। বিছানার চাদর, বালিশের কভার এবং কম্বল পরিচ্ছন্ন রাখুন। ঘরের কোণ, জানলার পর্দা ও কার্পেটও নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
শীতকালে অনেকেই ঘর গরম রাখতে হিটার ব্যবহার করেন। হিটার ব্যবহারের সময় প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা মেনে চলুন। পর্দা, কম্বল, কাগজ বা অন্য দাহ্য জিনিস থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখুন। ঘর সম্পূর্ণ বন্ধ করে অনিরাপদ গ্যাস বা জ্বালানিচালিত হিটার ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনীয় বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা বজায় রাখুন।অন্দরসজ্জার জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক আলো, এক্সটেনশন বোর্ড ও তারের অবস্থাও পরীক্ষা করুন। পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত তার ব্যবহার করবেন না। সুন্দর ঘর যেমন চাই, তেমনই চাই নিরাপদ ঘর।
অন্দরমহল মানেই নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা
একটি বাড়ি শুধু দেওয়াল, জানলা, দরজা কিংবা আসবাবের সমষ্টি নয়। বাড়ির প্রতিটি কোণে জড়িয়ে থাকে মানুষের অভ্যাস, পছন্দ, স্মৃতি এবং ভালোবাসা। কোথাও মায়ের সাজিয়ে রাখা ফুলদানি, কোথাও বাবার বইয়ের তাক, কোথাও সন্তানের আঁকা ছবি—এসবই একটি ঘরকে সত্যিকারের বাড়ি করে তোলে।
তাই শীতের অন্দরসজ্জায় অন্যের বাড়ির ছবি দেখে হুবহু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। নিজের প্রয়োজন, ঘরের মাপ এবং পরিবারের সদস্যদের অভ্যাস অনুযায়ী সাজিয়ে তুলুন অন্দরমহল। কোথাও একটি নতুন কুশন, কোথাও একটি ছোট গাছ, কোথাও নরম আলো, আবার কোথাও পুরনো স্মৃতির ছবি—এই ছোট ছোট পরিবর্তনেই ঘর হয়ে উঠতে পারে আরও আপন।
শীতের সকাল হোক জানলার পাশে এক কাপ চায়ের, দুপুর হোক নরম রোদে বই পড়ার, আর সন্ধ্যা কাটুক পরিবারের সঙ্গে গল্পে। নতুন আসবাবের চাকচিক্য নয়, ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকুক আরাম ও আন্তরিকতা। কারণ সুন্দর অন্দরমহল তৈরি হয় শুধু সাজসজ্জায় নয়, সেখানে বসবাস করা মানুষগুলির ভালোবাসায়।