প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
সম্পর্কের শুরুতে থাকে প্রবল আকর্ষণ, একে অপরকে জানার আগ্রহ, সারাক্ষণ কথা বলার ইচ্ছে। অথচ সময়ের সঙ্গে সেই আবেগের জায়গায় কখনও কখনও তৈরি হয় অদ্ভুত এক দূরত্ব। দু’জন মানুষ একসঙ্গে রয়েছেন, একই বিছানায় ঘুমোচ্ছেন, একসঙ্গে ঘুরতে যাচ্ছেন, এমনকি শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও রয়েছে, কিন্তু কোথাও যেন মন নেই! আবেগের সংযোগের বদলে সম্পর্ক টিকে থাকছে অভ্যাস, সুবিধে কিংবা শারীরিক উপস্থিতির উপর। এই ধরনের সম্পর্কের অভিজ্ঞতা নিয়েই সাম্প্রতিক অনলাইন আলোচনায় উঠে এসেছে ‘Glueing’ শব্দটি। কিন্তু সত্যিই কি এটি প্রেমের নতুন ট্রেন্ড, নাকি আধুনিক সম্পর্কের এক পুরনো সমস্যার নতুন নাম?
প্রেমের সংজ্ঞা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। একসময় প্রেম মানেই ছিল চিঠির অপেক্ষা, দেখা করার জন্য অজুহাত খোঁজা, দীর্ঘ ফোনালাপ কিংবা প্রিয় মানুষের জন্য ছোট ছোট ত্যাগ। এখন সেই জায়গায় এসেছে মেসেজ, ভিডিও কল, ডেটিং অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়ার রিঅ্যাকশন, অনলাইন স্ট্যাটাস এবং ভার্চুয়াল উপস্থিতি। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে পারেনি। বরং একই ছাদের নীচে থেকেও দু’জন মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মানসিক দূরত্ব।
সম্পর্কের এই জটিলতাকে বোঝার জন্য ‘Glueing’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে কিছু অনলাইন আলোচনায়। শব্দটির ব্যবহার ও অর্থ সর্বত্র এক নয়, এটি কোনও স্বীকৃত মনস্তাত্ত্বিক রোগনির্ণয়ও নয়। তবে যে অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে, তা অনেকের কাছেই পরিচিত। দু’জন মানুষ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন, কিন্তু আবেগের জায়গায় সেই বন্ধন আর আগের মতো দৃঢ় নয়। একসঙ্গে থাকা আছে, কিন্তু একে অপরকে অনুভব করা নেই। শারীরিক ঘনিষ্ঠতা আছে, কিন্তু মনের কথা বলার জায়গাটি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
এক ছাদের নীচে, অথচ আলাদা পৃথিবী
সম্পর্কে শারীরিক উপস্থিতি আর মানসিক উপস্থিতি এক জিনিস নয়। অনেক দম্পতিকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, তাঁদের সম্পর্ক বেশ সুন্দর। তাঁরা একসঙ্গে থাকেন, নিয়মিত বাইরে যান, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন, ছবি তোলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরের সঙ্গে মুহূর্ত ভাগ করে নেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁদের মধ্যে কথোপকথন সীমিত হয়ে এসেছে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিতে। সংসারের খরচ, বাজার, কাজের দায়িত্ব, সন্তান, ছুটির পরিকল্পনা—এসব নিয়ে কথা হয়, কিন্তু নিজের ভয়, আনন্দ, হতাশা কিংবা স্বপ্নের কথা বলার জায়গা থাকে না।
অনেক সময় শারীরিক সম্পর্কও চলতে থাকে অভ্যাসবশত। দু’জনের মধ্যে আবেগের আদানপ্রদান কমে গেলেও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। কেউ হয়তো সম্পর্কের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে ঘনিষ্ঠ হন, কেউ সঙ্গীর মন খারাপ হবে ভেবে আপত্তি করেন না, আবার কেউ নিজের চাহিদা বা একাকিত্বের কথা প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে সম্পর্কের বাইরের কাঠামো অক্ষত থাকলেও ভিতরে ভিতরে জমতে থাকে অসন্তোষ।তবে শারীরিক সম্পর্কের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দিয়ে কোনও সম্পর্কের গভীরতা বিচার করা যায় না। কোনও দম্পতির শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কম হলেও তাঁদের মধ্যে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আবেগের সংযোগ থাকতে পারে। আবার নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। মূল প্রশ্ন হল, দু’জন মানুষ কি একে অপরের অনুভূতি, ইচ্ছা ও সীমারেখাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন?
‘Glueing’ কি আসলে সম্পর্কের নিরাপত্তাহীনতা?
অনেক সম্পর্কেই দেখা যায়, একজন মানুষ অন্যজনকে হারানোর ভয়ে সম্পর্ক ধরে রাখেন। ভালোবাসা, আকর্ষণ কিংবা পারস্পরিক বোঝাপড়ার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একা হয়ে যাওয়ার ভয়। হয়তো সম্পর্কটি আর আনন্দ দিচ্ছে না, তবু বিচ্ছেদের কথা ভাবলেই আতঙ্ক তৈরি হয়। সামাজিক চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, আর্থিক নির্ভরতা কিংবা দীর্ঘদিনের অভ্যাসও মানুষকে এমন সম্পর্কে আটকে রাখতে পারে।কখনও আবার দু’জনের মধ্যে একজন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত নন, কিন্তু অন্যজনকে সম্পূর্ণ ছেড়েও যেতে চান না। ফলে সম্পর্কটি ঝুলে থাকে অনিশ্চয়তায়। একজন আরও বেশি আবেগ দিয়ে সম্পর্কটিকে ধরে রাখতে চান, অন্যজন দূরত্ব বজায় রাখেন। এই অসমতা ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে।
মনস্তত্ত্বে সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ, সংযুক্তির ধরন এবং বিচ্ছেদের ভয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। কারও কারও মধ্যে উদ্বিগ্ন সংযুক্তির প্রবণতা থাকতে পারে, যেখানে সঙ্গীর সামান্য দূরত্বও প্রত্যাখ্যানের সংকেত বলে মনে হয়। অন্যদিকে কেউ আবেগঘন আলোচনা এড়িয়ে চলতে পারেন, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। এই দুই ধরনের আচরণ এক সম্পর্কে থাকলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে। তবে কোনও একটি আচরণ দেখেই কাউকে নির্দিষ্ট মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করা যায় না।
কেন কমছে মানসিক ঘনিষ্ঠতা?
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। কর্মক্ষেত্রের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ যাতায়াত, পরিবারের দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত সময়ের অভাব—সব মিলিয়ে দু’জন মানুষের মধ্যে নির্ভেজাল সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে। একই ঘরে বসে থেকেও একজন হয়তো অফিসের মেল দেখছেন, অন্যজন সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত। কথোপকথন শুরু হওয়ার আগেই মনোযোগ চলে যাচ্ছে অন্য দিকে।
ডিজিটাল জীবনের একটি বড় সমস্যা হল, অনলাইনে আমরা অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাস্তবের কাছের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় বের করতে পারি না। সঙ্গীর সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বসেও ফোনে চোখ, ঘুমোতে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সামাজিক মাধ্যম দেখা, সকালে উঠে প্রথমেই নোটিফিকেশন পরীক্ষা—এই অভ্যাসগুলি ধীরে ধীরে একসঙ্গে কাটানো সময়ের মান কমিয়ে দেয়।
তুলনার প্রবণতাও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য দম্পতির ভ্রমণ, উপহার, রোম্যান্টিক ছবি কিংবা বিশেষ মুহূর্ত দেখে নিজের সম্পর্ককে অনেক সময় অসম্পূর্ণ মনে হয়। অথচ অনলাইনে দেখা ছবির পিছনের বাস্তবতা আমরা জানি না। প্রত্যেক সম্পর্কের নিজস্ব ছন্দ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যের সাজানো মুহূর্তের সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন জীবনকে তুলনা করলে অকারণ অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কি আবেগের বিকল্প হতে পারে?
প্রেমের সম্পর্কে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটিই সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি নয়। স্পর্শ, আলিঙ্গন, চুম্বন কিংবা যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে দু’জন মানুষ ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু যদি সেই ঘনিষ্ঠতার মধ্যে পারস্পরিক ইচ্ছা, সম্মতি ও আবেগের সংযোগ না থাকে, তাহলে একজন বা দু’জনেরই অপূর্ণতা অনুভব হতে পারে।
শারীরিক সম্পর্ক কখনও কখনও মানসিক দূরত্ব আড়াল করার উপায় হয়ে ওঠে। ঝগড়ার পর কথা না বলে ঘনিষ্ঠ হওয়া, সমস্যার সমাধান না করেই স্বাভাবিক আচরণ করা কিংবা সম্পর্কের অসন্তোষকে শারীরিক আকর্ষণের আড়ালে ঢেকে রাখা—এসব সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সহজ করতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যাগুলি অমীমাংসিত থেকে যায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সম্মতি। সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও কোনও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা স্বয়ংক্রিয় অধিকার হয়ে যায় না। দু’জনেরই ইচ্ছা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং সীমারেখাকে সম্মান করতে হবে। সঙ্গীকে খুশি রাখার জন্য, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় থেকে কিংবা অপরাধবোধে কোনও শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি দেওয়া উচিত নয়। নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে।
ভালোবাসা, অভ্যাস নাকি একাকিত্বের ভয়?
কখনও কখনও মানুষ সম্পর্কের মধ্যে থাকেন ভালোবাসার জন্য নয়, বরং সম্পর্কের বাইরে কী রয়েছে তা নিয়ে ভয় থেকে। দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে ছেড়ে নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবা কঠিন। একসঙ্গে তৈরি হওয়া স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুবান্ধব, আর্থিক পরিকল্পনা কিংবা সন্তানকে ঘিরে দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সহজ নয়।
আবার অনেক সময় সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও তার প্রকাশের ধরন বদলে যায়। প্রথম দিকের উত্তেজনা কমে গিয়ে জায়গা নেয় স্থিতিশীলতা। প্রতিদিনের জীবনে একে অপরের পাশে থাকা, অসুস্থ হলে যত্ন নেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া কিংবা বিপদের সময়ে ভরসা দেওয়া—এসবও ভালোবাসার প্রকাশ। তাই সম্পর্কের উত্তেজনা কমলেই যে ভালোবাসা শেষ হয়ে গিয়েছে, এমন ভাবার কারণ নেই।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সম্পর্কের মধ্যে সম্মান, আগ্রহ, বিশ্বাস ও পারস্পরিক যত্নের জায়গা হারিয়ে যায়। একজনের অনুভূতিকে বারবার অবজ্ঞা করা, প্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে যাওয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে থাকা কিংবা কেবল নিজের সুবিধামতো সম্পর্ক বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন, সম্পর্কে মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে?
প্রথম লক্ষণ হতে পারে কথোপকথনের পরিবর্তন। আগে যে মানুষটির সঙ্গে সারাদিনের ছোটখাটো ঘটনা ভাগ করে নিতে ইচ্ছে করত, এখন তাঁর সঙ্গে কথা বলার মতো বিষয় খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঙ্গীর মতামত জানতে ইচ্ছে করে না। নিজের আনন্দ, ভয় কিংবা কষ্ট অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ হয়।
দ্বিতীয়ত, একসঙ্গে সময় কাটালেও মনে হতে পারে, দু’জন আলাদা জগতে রয়েছেন। ছুটির দিনে পাশাপাশি বসে থাকা হচ্ছে, কিন্তু একে অপরের দিকে মনোযোগ নেই। একজন কথা বলছেন, অন্যজন শুনছেন না। কোনও সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই তা ঝগড়ায় পরিণত হচ্ছে অথবা দু’জনেই চুপ করে যাচ্ছেন।
তৃতীয়ত, সম্পর্কের মধ্যে স্পর্শ ও ঘনিষ্ঠতার ধরন বদলে যেতে পারে। কেউ হয়তো সঙ্গীর কাছাকাছি আসতে চাইছেন না, আবার কেউ নিজের প্রয়োজন বা অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারছেন না। তবে এই পরিবর্তনের পিছনে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য ব্যক্তিগত কারণও থাকতে পারে। তাই শুধু একটি লক্ষণ দেখে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সম্পর্ককে নতুন করে কাছাকাছি আনার উপায়
সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হলে প্রথম কাজ হল সমস্যাটিকে স্বীকার করা। সব কিছু ঠিক আছে বলে অভিনয় করলে সমস্যার সমাধান হয় না। তবে অভিযোগের সুরে আলোচনা শুরু করাও ঠিক নয়। ‘তুমি আমাকে সময় দাও না’ বলার বদলে ‘তোমার সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটাতে আমার ভালো লাগবে’—এই ধরনের ভাষা কথোপকথনকে সহজ করতে পারে।
প্রতিদিন কিছুটা সময় শুধু দু’জনের জন্য রাখা যেতে পারে। সেই সময়টুকুতে অফিস, সংসার, সন্তান কিংবা অন্য দায়িত্বের আলোচনা না করে একে অপরের কথা শোনার চেষ্টা করুন। একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, রান্না করা, বই পড়া, পুরনো ছবি দেখা কিংবা কোনও নতুন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যে নতুন প্রাণ আনতে পারে।ডিজিটাল বিরতিও গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়ার সময় বা ঘুমোতে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ ফোন দূরে রেখে কথা বলুন। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কথা বলতেই হবে এমন নয়। কিন্তু যে সময়টুকু একসঙ্গে কাটাচ্ছেন, সেখানে মনোযোগ থাকা জরুরি।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। দু’জনের চাহিদা, পছন্দ, অস্বস্তি ও সীমারেখা আলাদা হতে পারে। কাউকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা না করে একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, ঘনিষ্ঠতা শুধু যৌন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাত ধরা, আলিঙ্গন, স্নেহের স্পর্শ কিংবা পাশে বসে থাকা—এসবও আবেগের সংযোগ তৈরি করতে পারে, যদি দু’জনেই তাতে স্বচ্ছন্দ হন।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?
সম্পর্কের সমস্যা সবসময় নিজেদের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব হয় না। বারবার একই বিষয়ে ঝগড়া, দীর্ঘদিনের নীরবতা, বিশ্বাসের অভাব, ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চাপ কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দম্পতি কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিতে পারেন। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর দু’জনকে নিজেদের অনুভূতি বুঝতে, যোগাযোগের সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারেন।
কাউন্সেলিং মানেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার শেষ চেষ্টা নয়। বরং অনেক সময় সম্পর্কের সমস্যাগুলি আরও গভীর হওয়ার আগেই পেশাদার সাহায্য নেওয়া যায়। তবে সম্পর্কে যদি ভয় দেখানো, জোরজবরদস্তি, শারীরিক বা যৌন নির্যাতন কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ থাকে, তাহলে প্রথম গুরুত্ব দিতে হবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ সহায়তা ও উপযুক্ত পেশাদার পরামর্শ প্রয়োজন।
সম্পর্কের আঠা হোক ভালোবাসা, ভয় নয়
‘Glueing’ শব্দটি নতুন আলোচনায় উঠে এলেও এর আড়ালে থাকা প্রশ্নটি নতুন নয়—দু’জন মানুষ কি সত্যিই একে অপরের সঙ্গে আছেন, নাকি শুধু সম্পর্কের কাঠামোটি ধরে রেখেছেন? সম্পর্কের স্থায়িত্ব কেবল একসঙ্গে থাকার সময় দিয়ে মাপা যায় না। বরং একে অপরের কথা শোনার ইচ্ছা, সম্মান, বিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানসিকতা সম্পর্ককে গভীর করে।
ভালোবাসা মানে সারাক্ষণ একে অপরের সঙ্গে লেগে থাকা নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব সময়, বন্ধুত্ব, পছন্দ ও ব্যক্তিগত পরিসর থাকা প্রয়োজন। সুস্থ সম্পর্ক সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করে, আবার প্রয়োজনের সময়ে নির্ভরতার জায়গাও তৈরি করে। সেখানে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মানসিক সংযোগও।
সম্পর্কের আসল শক্তি কোনও ট্রেন্ডি শব্দে নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নে। সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজের প্রয়োজন স্পষ্ট করে বলা এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইতে পারা—এসবই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে। শরীর পাশাপাশি থাকলেই সম্পর্ক পূর্ণ হয় না; মনকেও কাছে আসতে হয়। কারণ সত্যিকারের প্রেমের বন্ধন তৈরি হয় তখনই, যখন দু’জন মানুষ শুধু একে অপরকে ধরে রাখেন না, একে অপরকে বুঝতেও চান।
3rd Nov 2026
প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি