19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সীমান্তের প্রহরী হরভজন সিংহ..

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এতটাই ছিল যে, মৃত্যুর বছর পরও আজও সীমান্ত পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন হরভজন সিংহ।

ভারতীয় সেনা জওয়ানদের কাছে তিনি এখনও অমর। আবার তিনি নাকি দেশের সীমান্তে এখনও পর্যন্ত পাহারা দিয়ে চলেছেন। তাদের কাছে হরভজন সিং একজন দেবতা। প্রয়াত এই সেনা জওয়ান মৃত্যুর আগে সমস্ত রকমভাবে নিজের দেশকে রক্ষা করেছেন।

১৯৪৬ সালের ৩০ অগাস্ট এই প্রয়াত সেনা জওয়ান হরভজন সিং-এর জন্ম হয়। প্রাথমিক পড়াশোনা তিনি তাঁর গ্রামের স্কুলে সেরে ফেলেন। এরপর পাঞ্জাবের ডিএভি হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্টে যোগ দেন হরভজন সিং। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৬৮ সালে নাথু গিরিপথে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার উচ্চতায় দুর্গম এবং সঙ্কীর্ণ গিরিপথ। অঞ্চলটিতে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, সিকিম এবং তিব্বতের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় জায়গাটিকে বরাবরই স্পর্শকাতর স্থান হিসেবে ধরা হতো। এর আউটপোস্টে ভারতীয় জওয়ান হরভজনের যাত্রা পথ।

অত্যন্ত দুর্গম এবং সংকীর্ণ এই পথ। সেখানে রসদের অপেক্ষায় ছিলেন অন্যান্য সেনা জওয়ানরা। যখন  তিনি রওনা দেন তখন অক্টোবর মাস ছিল। সীমান্তে প্রবল ধস এবং বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি একেবারে প্রতিকূল ছিল। সেই অবস্থাতেই রওনা দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি যে মালবাহী পশুগুলিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকটি পশু ফিরে আসে সেই আউটপোস্টে যেখান থেকে জওয়ান হরভজন সিং রওনা দিয়েছিলেন। এ দেখে তার সহকর্মীরা টের পেয়ে যান যে হরভজন সিং নিশ্চয়ই কোনও বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে।

এরপর হরভজন সিংকে খোঁজার জন্য শুরু হয় চিরুনি তল্লাশি। তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি তাঁকে। এরপর নাকি শোনা গিয়েছিল যে, প্রয়াত হারভজন সিং নিজেই বলে দেন তার নিথর দেহ কোথায় আছে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও ঘটনাটি কিন্তু সত্যি হয়ে ওঠে। আরেক সেনা জওয়ান প্রীতম সিংকে হরভজন সিং স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে তার নিথর দেহটি কোথায় রয়েছে। এরপর সেই জায়গাতে যখন খোঁজা হয় তখন তার দেহটি পাওয়া যায়। তিব্বত এবং সিকিমের মাঝে এই নাথুলা পাসে ১৯৬৫-র ভারত-চীন যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর সাহসিকতার জন্য তাঁকে মরণোত্তর মহাবীর চক্র দেওয়া হয়।

তিনি মৃত্যুর পরও নাকি দেশরক্ষার কাজ করছেন এখনও পর্যন্ত। তিনি নাকি শত্রু পক্ষ থেকে আসা আগাম বিপদের সতর্কবার্তা দিয়ে দেন সেনা জওয়ানদের। শুধু এটাই নয়, কোনও ভারতীয় সেনার যদি পোশাক সামান্য একটু অগোছালো থাকে তাহলে শূন্য থেকে উড়ে এসে হঠাৎ সপাটে থাপ্পড় পড়ে। প্রয়াত এই সেনা জওয়ান হরভজন সিংহের পোশাক সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। তার ব্যবহৃত বিছানাও যত্নে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। এক সেনা জওয়ান এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নাকি তার বিছানায় থাকা জিনিসপত্র গুলি এলোমেলো হয়ে যায়। তাদের দাবি যে কাজের ফাঁকে তিনি এখানে এসে বিশ্রাম নেন।

 তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার জন্য অভিনব এক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই অঞ্চলের তরফ থেকে ঠিক করা হয়েছে একটি মন্দির তৈরি করে তার স্মৃতিকে রক্ষা করা হবে। অবশ্য এর আগেই তিনি ভারতীয় সেনা জওয়ানদের কাছে দেবতার রূপ পেয়ে গেছেন। ভারতীয় সেনা জওয়ানদের কাছে তিনি এখন বাবা হরভজন সিং। তার এই মন্দিরটি গ্যাংটক থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে নাথু এবং জেলেপ গিরিপথ, এর মাঝখানে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩, ১২৩ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই মন্দির। বহু পর্যটক যান এই মন্দির দেখতে।

রীতি অনুযায়ী, মন্দির দর্শনের পর সকলেই এক বোতল করে জল রেখে দিয়ে আসেন। এই জল পান করলে নাকি দর্শনার্থীদের মনের ইচ্ছা পূরণ হয়। শুধুমাত্র পর্যটকরাই নয় বহু সেনা জওয়ানেরা পুজো দেন এখানে। এমনকি ১২ বছর আগে পর্যন্ত তিনি প্রতি বছর ছুটি পেতেন। একটি জিপে করে তাঁর জিনিসপত্র নিয়ে জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছানো হতো। এরপর ট্রেনে করে সেই জিনিসপত্র যেত তাঁর গ্রামের বাড়ি পাঞ্জাবের কপূরথালা জেলার কোকেগ্রামে। সেখানেই থাকেন তার পরিবার-পরিজন সকলেই। হরভজন সিংহের নামে রিজার্ভেশনও করা হতো। তবে গত ১২ বছর ধরে এই রীতি বন্ধ হয়ে গেছে। হরভজন সিংয়ের অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তার বাড়িতে বেতনের চেক পৌঁছে দিত ভারতীয় সেনাবাহিনী।

মৃত্যুর পর তাকে ক্যাপ্টেন পদেও উন্নীত করা হয়। প্রতি মাসে ভারত-চীন সীমান্তে পতাকা বৈঠকে একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়। তাদের বিশ্বাস, ওই চেয়ারে বসেন প্রয়াত ক্যাপ্টেন হরভজন সিং। তাঁর স্মৃতি আবার ফিরিয়ে আনার জন্য একটি শর্টফিল্ম তৈরি করা হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে 'প্লাস মাইনাস'। নিজের গ্রামে তিনি শহীদের মর্যাদা পান। হরভজন সিং এক লড়াকু মানুষের প্রতীক। যে লড়াকু মানসিকতা যেমন সীমান্তের প্রহরীদের সাহস যোগায়, ঠিক তেমনই সাহস যোগায় পৃথিবীর সব লড়াকু মানুষকে।

Archive

Most Popular