রান্নাঘর
সুস্মিতা মিত্র
।। আশ্বিনে রান্ধে, কার্তিকে খায়,
যেই বর মাগে, সেই বর পায়।।
আজ আশ্বিনের শেষ দিন, গাড়ু সংক্রান্তী বা গার্সীর দিন। ছোটবেলায় দিদাকে বলতে শুনেছি আজকের দিনে হালেরটা আর জালেরটা খেতে নেই। পূর্ববঙ্গীয় এবং রাঢ় বঙ্গের লোকেরা হেমন্তকে আহ্বান জানিয়ে সমস্ত রকম অকৃষিজাত সবজি দিয়ে তেল মশলা ছাড়া রান্না করেন এই ডাল। খেতে হয় কাওন অথবা আতপ চালের ভাত, নারকেল, শাপলার ভেলা ভাজা আর নারকেল মুলো চালতার টক দিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, খেসারি ডাল দিয়েই এই রান্না করার কথা, তবে এখন পাওয়া যায় না বলে মটর ডাল দিয়ে হয়। অনেকের বাড়িতে ৩ অথবা ৬ রকম ডাল আর ৯ রকম সবজি দিয়ে গাড়ুর ডাল রাঁধার নিয়ম আছে। ঘন ডালের সাথে সেদ্ধ হয় কুমড়ো, মুলো, গাঁটি কচু, কৃষ্ণ কচু, ওল কচু, থোড়, লাউ, পেঁপে, মানকচু, কচুশাক, শাপলা, শালুক, বেগুন, জলপাই, ফুলকপি, কাঁচা তেঁতুল, ঝিঙ্গে, রাঙালু, পটল আরো যা যা সবজি এইসময় বাজারে পাওয়া যায় সব। ঘি তে নারকেল দিয়ে এই ডাল সাঁতলানো হয়, কোনো ফোড়ন কিম্বা হলুদ পড়ে না, এইজন্যই একে আসমবরা ডাল ও বলে।
সংক্রান্তির দিন ভোর ভোর উঠে স্নান করে তুলসীতলায় গোবর লেপে, চাল পিটুলির আলপনা দিয়ে তার ওপর কুলো বসাতে হয়। এবার কুলোর ওপর কলাপাতার ডগা পেতে মাঝখানে নুন দিয়ে স্বস্তিক একে তার উপরে মঙ্গলঘট বসিয়ে, প্রদীপ জ্বেলে, রেকাবিতে খেসারি/মটর ডাল, কলা, নারকেল, গুড় রেখে পুজো সেরে রান্না শুরু হয় এই গারসী বা গাড়ুর ডাল। দুপুরে বাড়ির মেয়েরা নিজেরা খেয়ে বাকি ডাল মাটির হাঁড়িতে করে তুলে রাখেন বাকি সদস্য দের জন্য। ভাতে জল ঢেলে রাখেন, কারন পরদিন এই পান্তা খেতে হবে।
বিকেলে দুয়ারে আলপনা দিয়ে সারাবাড়িতে ঘুরে ঘুরে প্রদীপ আর ধূপ ধূনো দেখাতে হয়। মনে মনে বলতে হয়, বুড়া গিয়া ভালা আ, অলক্ষী বিদায় যা। তার পরদিন অর্থাৎ পয়লা কার্তিকে বাড়ির সব সদস্যরা নিম আর কাঁচা হলুদ বাটা মেখে স্নান সেরে প্রথমে ভেজানো ছোলা, মটর, গুড় আর কাঁচা তেঁতুল খেয়ে তারপর এই ডাল খেতে পারেন। অনেকে কাঁচা তেঁতুল পুড়িয়ে ঠোঁটে মাখেন, তাতে শীতকালে ঠোঁট ফাটে না। এইদিন সন্ধ্যা থেকে কার্তিক সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতিদিন জ্বালতে হয় আকাশ প্রদীপ।
পুরাণ বলে, অশ্বিনী কুমারদ্বয় সূর্যদেব ও সংজ্ঞার পুত্র। অভিশাপগ্রস্ত সংজ্ঞা জগজ্জননী পার্বতীর কাছে নিজের দুর্দশা থেকে মুক্তি চাইলে পার্বতী এক মুষ্টি চাল দিয়ে তাকে বলেছিলেন-আশ্বিন মাসের শেষ তারিখ পূর্বরাত্রে শেষ দিবস রেখে এই চাল ভক্তিপূর্বক রন্ধন শেষে মহাদেবের অর্চনা করতে হবে এবং কার্তিক মাসের ১ম দিবসে সেই অন্ন ভক্ষণে মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সে নিয়ম মেনে রোগ ও অভিশাপমুক্ত হয়েছিলেন দেবী সংজ্ঞা। বেদেও দুই ভাই নীসত্য ও দস্র-র উল্লেখ রয়েছে।
কীভাবে বানাবেন:
৩০০ গ্রাম মটর ডাল আগে ভিজিয়ে রাখুন। এদিকে মূলো, থোড়, মিষ্টি কুমড়ো,মিষ্টি আলু,বরবটি (বড় বড় করে কাটবেন),ঝিঙে, শিম, শাপলা, শালুক,কাঁকরোল, চালতা, জলপাই, মানকচু, গাঠি কচু, বিনস্ (বড় বড় করে কাটবেন), ডুমো-ডুমো করে কেটে নিন। এই উপকরণের মধ্যে লাগবে লাউশাক ও। জলপাই, মূলো, থোড়, মিষ্টি আলু, শিম, শালুক, বরবটি, ও চালতা প্রেশার কুকারে জল নুন দিয়ে ভাপিয়ে নিন। এদিকে, একটি কড়াইতে শুকনো খোলায় ধনে, জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা একটু তাতিয়ে নিয়ে ভেজে গুঁড়ো মশলা বানিয়ে নিন। অন্যদিকে, জল দিয়ে প্রেশারে ডাল সিদ্ধ বসিয়ে নিন। কুমড়ো ঝিঙে ডালে আগে দিয়ে নিন। পরে বাকি সবজি ডালে দিন। ডাল সিদ্ধ হলে কালোজিরে চাইলে আলাদা করে ভেজে মেশাতে পারেন, অথবা আগে তৈরি করে রাখা ভাজা মশলা মিশিয়ে দিতে পারেন।