ভ্রমণ
নিজস্ব প্রতিনিধি
অলৌকিকতা এবং রহস্যের আবর্তে ঘেরা ৮০০ বছর পুরোনো এই মন্দির। মন্দিরে রয়েছেন জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রা। মন্দিরটি প্রায় ৪৫ তলা বাড়ির সমান উঁচু। একেবারে চূড়ায় লাগানো রয়েছে একটি পতাকা। আশ্চর্যজনক ভাবে, যে দিকে হাওয়া চলে সবসময় তার বিপরীত দিকে পতাকাটি ওড়ে। প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে মন্দির টি বিস্তৃত এবং ২১৪ ফুট উঁচু। অথচ এই মন্দিরের চূড়ার কোনও ছায়া দেখা যায় না। মন্দিরের চূড়ায় লাগানো রয়েছে একটি চক্র, যার ওজন প্রায় এক টন। অদ্ভুত ভাবে, যে কেউ যে কোনও প্রান্ত থেকে ওই চক্রের দিকে তাকালে মনে হবে চক্রটি তাঁর দিকেই ঘোরানো রয়েছে। প্রতি ৮, ১২ ও ১৯ বছর অন্তর পুরীর মন্দিরের বিগ্রহ বদল হয়। পবিত্র নিম গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রার নব কলেবর তৈরি করা হয়। আর পুরানো মূর্তি কোইলি বৈকুণ্ঠের কাছে পুঁতে দেওয়া হয়।
পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘরকে বিশ্বের বৃহত্তম রান্নাঘর বলা হয়। এই রান্নাঘরে জগন্নাথদেবের জন্য মহাপ্রসাদ তৈরির প্রক্রিয়াও অবাক করা। মাটির তৈরি উনুনে কাঠের আঁচ দিয়ে একটি পাত্রের উপর আরেকটি পাত্র করে পরপর ৭টি পাত্র বসিয়ে রান্না করা হয়। আজও এভাবে রান্না সম্পন্ন হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রথমে সবথেকে উপরের পাত্রের রান্না শেষ হয়। তারপর এক-এক করে নীচের পাত্রগুলির রান্না হয়। উনুনের উপর যে পাত্রটি বসানো, সেটির রান্না সবার শেষে সম্পন্ন হয়। মন্দিরে যতই ভক্ত আসুক, কখনও প্রসাদ কম পড়ে না। প্রতিদিন জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রাকে ৫ দফায় ভোগ দেওয়া হয়। এছাড়া রোজ ৫৬ ভোগ দেওয়া হয়। যার মধ্যে ভাত, ডাল, সবজি থেকে মিষ্টি, বাদাম-সহ নানা ধরনের খাবার থাকে। মন্দির চত্বরে আনাদা বাজারে এই ভোগ কিনতে পারেন ভক্তরা।
পুরীতে সমুদ্রের কাছেই অবস্থিত জগন্নাথ মন্দির। সাধারণ নিয়মে এখান সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজ শুনতে পাওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল জগন্নাথ মন্দির থেকে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাওয়া যায় না। এর কারণ কী?
একবার নারদ মুনি শ্রীজগন্নাথ দেব প্রভুকে দর্শন করতে পুরীর মন্দিরে আসেন। সেই সময় মন্দিরের দরজায় অপেক্ষা করছিলেন বজরংবলী। নারদ মুনি যখন মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি দেখতে পান যে জগন্নাথদেব অত্যন্ত বিচলিত হয়ে রয়েছেন। কী কারণে তিনি বিচলিত, মহর্ষি নারদ তা জানতে চাইলে জগন্নাথদেব তাঁকে বলেন যে সমুদ্রের প্রবল গর্জনের কারণে তাঁর মন অশান্ত হয়েছে। এই প্রচণ্ড আওয়াজের কারণ তিনি একাগ্রচিত্তে কোনও কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এই কথা মন্দিরের বাইরে পাহারারত বজরংবলীকে জানান মহর্ষি নারদ। বজরংবলী হলেন রামের পরম ভক্ত। আর রাম এবং কৃষ্ণ উভয়েই বিষ্ণুর অবতার। আবার জগন্নাথ দেব হলেন কৃষ্ণের আর এক রূপ। সেই হিসেবে বজরংবলী জগন্নাথদেবেরও পরম ভক্ত।
প্রভুর সমস্যার কথা জেনে তখনই তার সমাধানের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন হনুমান। তখনই সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে সমুদ্রদেবকে আহ্বান জানান বজরংবলী। তাঁকে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনকে শান্ত করতে বলেন। তখন সমুদ্রদেব তাঁকে বলেন একমাত্র পবনদেবেরই সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনের উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তখনই হনুমানজি পবনদেবকে এই সমস্য়ার সমাধান করতে অনুরোধ করেন। পবন দেব তাঁকে বলেন যে সমুদ্রের গর্জনকে একমাত্র তখনই চুপ করানো যাবে, যদি যেদিক থেকে হাওয়া বইছে, তার থেকে জোরে অন্য দিক থেকে হাওয়া বওয়ানো যায়। সেই কথা শুনে বজরংবলী যেদিক থেকে হাওয়া বইছে, তার থেকে জোরে উল্টোদিক থেকে উড়তে শুরু করেন। এর ফলে যে হাওয়ার বেগের সৃষ্টি হয়, তাতে মন্দিরের দিকে যাওয়া সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন চাপা পড়ে যায়। এই কারণেই পুরীর মন্দিরের চূড়োয় পতাকা সব সময় হাওয়ার উল্টোদিকে বয়।