19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

শাইলক ও বাটখাড়া

সাহিত্য

সাগরিকা রায়


আজ সকাল থেকে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া ছিল। একের সঙ্গে অন্যের তান্ডবে কেমন এক বিপর্যস্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ঝোড়ো হাওয়াকে কেন যেন ভয় পায় অনির্বাণ। আসলে ছোটবেলার একটা স্মৃতি ভয়টাকে মুছে দিতে পারে। না। মনে আছে কদিন ধরে খুব বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়া ছিল। স্কুলে রেনি ডে আর বাড়িতে খিচুড়ির টগবগ। সেই রাতে এল ভূমিকম্প। সমস্ত বাড়ি দুলে উঠল মহাভয়ে। মায়ের চিৎকারটা এখনও কানে এসে আছাড় খায়। ছেলেবেলার ভয়টা মুখ গুঁজে বসে আছে বুকের গভীরে। সময় মতো বেরিয়ে আসে। ঘুমটা জাঁকিয়ে বসতে বসতে ভয়টা বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল হামাগুড়ি দিয়ে। জেগে উঠতে উঠতেই মনে পড়ে গেল নার্সিং হোমের কথা। মনে হল মানেই ঘুম হাওয়া হয়ে গেল। ঘুম চোখেই মোবাইল টেনে সময় দেখল অনির্বাণ। আটটা দশ! অর্থাৎ আর ঘুম নয়, এবারে ওঠো হে। উঠেই পড়ল গড়িমসি না করে। চটপট তৈরিও হয়ে নিল। নার্সিং হোমটা বাড়ি থেকে অনেকটা দূর। এখনই বেরিয়ে না পড়লে দেরি হয়ে যাবে। আর দেরি মানেই ভিজিটিং আওয়ার্স খতম হয়ে যাবে। অনির্বাণ উবার বুক করে নিল বাইরে বের হতে হতে। কে সেভেনটিন এর সামনে দাঁড়াতে বলল গাড়িকে। ওটা মিসেস মজুমদারের বাড়ি। বাড়িটা রাস্তার সামনেই বলে চিনতে সুবিধে হবে ড্রাইভারের। নাহলে ভেতরদিকে ওর বাড়িটা ঢাকা পড়ে গেছে অভিজিৎ সামন্তর চারতলা বাড়ির জন্য। একটু রোদ ঢোকার সুযোগ পায় না অনির্বাণের বাড়িতে। শীতকালে খুব কষ্ট।

উবার থেকে নামতে নামতে অনির্বাণ নার্সিং হোমের মেইন গেটের দিকে তাকাল। ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হতে এখনও মিনিট পনের বাকি আছে। সেকেন্ড ফ্লোরে যেতে হবে। লিফটের দিকে দ্রুত পা চালিয়ে দিল অনির্বাণ। দেরি হয়ে গেল আজ আসতে। অদ্রি অপেক্ষা করে আছে ওর জন্য। সারাদিন এই সময়টুকুর দিকে তাকিয়ে থাকে অদ্রি। বেচারা বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে পড়ে আছে। ও নাকি শপথ নিয়েছে এবারে বাইক বেচে সাইকেল কিনে নেবে। লিফট থেকে বেরিয়ে পা চালিয়ে অদ্রির বেডের কাছে পৌঁছে অনির্বাণ দেখল অদ্রি চোখ বুজে শুয়ে আছে। চুপচাপ অদ্রির কাছে পৌঁছে ডাকতে গিয়ে থমকাল অনির্বাণ। অদ্রি বই পড়ছিল। বুকের ওপর বই উলটে রাখা। হাসি চেপে বইটার নাম দেখল অনির্বাণ। অনেকদিন পরে বইটা নিয়ে বসেছে যাহোক। সেই কবে বনিদির বিয়েতে পাওয়া উপহার শেকসপীয়র সমগ্র। বইটা কে দিয়ে গেল অদ্রিকে? বনিদি নিশ্চয়।

অদ্রি বোধহয় অনুভব করেছিল অনির্বাণের উপস্থিতি। চোখ খুলে হাসল কেমন আছিস?

অনির্বাণ হাসল-বেশ বেশ। তুই তো ভালই আছিস। কী পড়ছিস? ওথেলো? তোর ফেভারিট।

হ্যাঁ। আজও পড়ছি। বনিদি এসেছিল। বলেছিলাম এই বইটা নিয়ে আসতে।

-হুম, বুঝেছি। ডেসডিমোনো... অ্যাঁ?

-না। ওথেলো। ওথেলো হেব্বি ইন্টারেস্টিং।

-যা বলেছিস। তারপর কবে ডিসচার্জ করছে? ডাক্তারের সঙ্গে কথা

হয়েছে ?

সময় শেষ হতেই নার্স তাড়া দিল। অদ্রি বিমর্ষ চোখে তাকিয়েছিল।

অনির্বাণ হাত চেপে ধরল।

-কাল আসছি। ভয় নেই। আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে যাব। মনে হয় দিন তিনেকের মধ্যে বাড়ি যেতে পারবি।

অদ্রি কী একটা বলবে বলবে করে বলল না। অনির্বাণ অপেক্ষা করছিল। অদ্রি হয়তো রিখির কথা বলবে। রিখি একদিন এসে দেখে গেছে অদ্রিকে। আর আসেনি হপ্তাখানেকের মধ্যে। অনির্বাণ বিষয়টা নিয়ে সেভাবে ভাবেনি। আজ মনে হচ্ছে অঙ্কটা সরল অঙ্ক নয়। বিয়ের আগে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে অদ্রি নার্সিং হোমে ঢুকতেই রিখির বাড়িতে হতাশার ছায়া ঘুরতে দেখেছে অনির্বাণ। সেটা স্বাভাবিক বলেই ভেবেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।

রিখি ফোন করে তো? প্রশ্নটা কিছু না ভেবেই করে ফেলল অনির্বাণ।

না। সময় পায় না হয় তো। কলেজ আছে... ফিটনেস ক্লাসে ভর্তি হয়েছে! তবে করেছিল কয়েকদিন আগে। মুর্শিদাবাদ যাওয়ার আগে। মুর্শিদাবাদ মানে ওর দাদার কাছে?

হ্যাঁ, মন মেজাজ ভাল নেই। বুঝিস তো।

অদ্রি বললেও ও যে নিজে থেকে এই কারণগুলোকে বিশ্বাস করে না, সেটা গলার স্বরের ভেতর থেকে হালকা হয়ে বেরিয়ে আসছিল। অনির্বাণ ভাবল আজ ফেরার পথে রিখির সঙ্গে দেখা করে নেবে। যা হচ্ছে মুখোমুখি হোক। ছুপকে ছুপাকে নয়। বারবার দুর্ঘটনা আসবে কেন অদ্রির জীবনে।

-কাল আমার ফোনের চার্জারটা নিয়ে আসিস। মাকে বলিস, বের করে দেবে। ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এল অনির্বাণ। একটু অপেক্ষা করে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার জন্য। সরাসরি জানতে হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে। তবে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিরাশই হল। দিন সাতেক থাকতে হবে। পায়ের চোটটা ভোগাবে ভালই মনে হচ্ছে। খুব ভাল কন্ডিশনে নেই নাকি পা-টা! কী হবে অদ্রির যদি পা ঠিক না হয়।

বাড়ি ফিরে সুমনার গোমড়া মুখ দেখে প্রমাদ গুনল অনির্বাণ। দেরি হয়ে গেছে। বাজারে পাক খেয়ে আসতে হবে। ভড়িঘড়ি বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অনির্বান। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাজারে ঢুকে যেত। বিধু আটকে দিল

-শাইলকের একটা কেলো করে ছাড়বো দেখে নিস। দুশো বরবটি নিয়েছে বিধু। একটা আবার পাল্লা থেকে নামিয়ে

রেখেছে শাইলক। বিধু কারণ জানতে চাইলে মুখ মটকে বলেছে -আমার দুশোর বাটখারাটা নেই। দেড়শো দিয়ে ওজন করছি। মাল বেশি গেল। পরে বিধু অন্য দোকানে ওজন করে দেখে দুশো নয়, দেড়শোই আছে। শুনে অনির্বান বিরক্ত হল। শাইলক মালটা ভাল রাখে। কিন্তু স্বভাব যায় না মরলে। সাঙ্ঘাতিক মারে ওজনে। লোকটার নাম কালাম না কমল কী যেন। লোকের মুখে মুখে হয়ে গেছে শাইলক। ও-ও সেটা মেনে নিয়েছে। বাজারে ঢুকতে দেরি হল। সুমনা টম্যাটো ছাড়া রাঁধতে পারে না। অনির্বাণ কিচেনের পারদ নামাতে প্রথমেই তুলে নিল টম্যাটো। কী দাম বাপরে। সত্তর টাকা কেজি। তা এখন নাকি দামটা লেবেছে। শাইলক ওকে দেখে হাতছানি দিল। অনির্বাণ উপায় না দেখে উঁকি দিল

-কী আছে?

-পুঁই, কুমড়ো, বেগুন। কী চাই বল। একমুঠো চিংড়ি নে যাও। এখান যে পুঁই কুমড়ো বেগুন। জমে যাবে দেখ। হিলিশ নিতি পার। তাহলেও পুঁই নিতি হবে।

অনির্বান এক মূহুর্ত চিন্তা করল। পুঁইটা বেশ তরতরে। নেবে? কিন্তু

বাটখাড়া...!

-তোমার বাটখাড়া ঠিক নেই। আমি অন্য দোকানের বাটখাড়া নিয়ে এসে ওজন নেব। চলবে?

-যাও তাহলে অন্য দোকানে। মুখ ঘুরিয়ে অন্য কাস্টমারের সঙ্গে বাতচিত শুরু করে দিল শাইলক। রাজি হল না মানে ওজনে ঘোর গন্ডগোল আছে। ওজন ঠিকঠাক দিয়েও ব্যাগে দেওয়ার সময় খানিকটা টিক করে টেনে রাখবে। জিজ্ঞাসা করলে বলে

-মাফ ঠিক রাখি। কেমন ওঝন, তেমনই দেব। মাফে মাফে।

বাজার ঘুরে মাছ আর সামান্য সবজি নিল অনির্বাণ। আজ চলুক। অদ্রির কাছে দেরি হল। এভাবে কি মাফে মাফে সব চালানো যায় শাইলকের মত করে। মাঝে থেকে বাজারের ফাঁক দিয়ে অজান্তে অনেকটা সময় বেরিয়ে যায়, যার কোন হিসেব থাকে না। সে যেন আন্টনিওর হিসাব বহির্ভূত রক্তের ওজন। যার কথা খেয়ালই থাকে না।

গাড়ি বুক করে অপেক্ষা করছিল অনির্বাণ। আজ বোধহয় বৃষ্টি হবে। কেমন একটা সোঁদা গন্ধ পাচ্ছিল ও। গাড়ি আসতেই উঠে পড়ল।

গাড়ির ভেতর দিয়ে রাস্তা, অট্টালিকা দেখতে দেখতে যাচ্ছিল ও। কর্ত কত্ত ফ্ল্যাট ঝুলছে চোখের সামনে। ওয়ানরুম ফ্ল্যাটের বড় বাড় বাড়ন্ত। একা থাকে মানুষ। হয়তো গ্রামদেশে বাড়ি আছে, এখানে চাকরিসূত্রে এসেছে। আবার সম্পর্কের সুতো ট্রাপিজের খেলাও দেখাচ্ছে ইদানিং।

নীচে নিরাপদ জাল নেই। যখন তখন সুতো ছিঁড়ে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। নিঃসঙ্গতাকে যেচে বেছে নিচ্ছে মানুষ। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়ি। ঘজ ঘজ করছে গাড়ির মিছিল। পাশের গাড়ির জানালায় একটা জার্মান শেফার্ডের মুখ রাস্তা দেখছে। অদ্রির কেসটা খুব কিছু সুবিধের ঠেকছে না। মামলাটায় কোথা থেকে দুর্গন্ধ আসছে অনির্বাণের নাকে।

এখনও মনে আছে একজোড়া শাঁখা, লাল টুকটুকে পলা পরা কুসুমপিসির হাতদুটো। অদ্রির জীবনটা যেন কুসুমপিসির মত না হয়। কেমন হাসিখুশি ছিল কুসুম পিসি। পরে কেমন আতাল মাতাল চোখ নিয়ে খুম মেরে বসে থাকতো ওদের রান্নাঘরের বারান্দায়। অদ্রির চোখে সেই ছায়া আজ দেখেছে অনির্বাণ। অদ্রি যেন অনেকটা কুসুমপিসির মত। বিয়ে একজোড়া শাঁখা, লাল টুকটুকে পলা পরা কুসুমপিসির হাতদুটো। অদ্রির জীবনটা যেন কুসুমপিসির মত না হয়! কেমন হাসিখুশি ছিল কুসুম পিসি! পরে কেমন আতাল মাতাল চোখ নিয়ে ঘুম মেরে বসে থাকতো ওদের রান্নাঘরের বারান্দায়।

বিকেলের দিকে অদ্রিকে ফোন করে দিল। দেরি হলে চিন্তা না করে যেন।

অদ্রি লজ্জা পেল।

তোর ওপর দিয়ে ঝামেলা যাচ্ছে। আজ মা এসেছিল বড়কাকুকে নিয়ে। চিন্তা করিস না।

বোঝে অদ্রি সঙ্কুচিত হচ্ছে এই ভেবে যে অনির্বাণ নিজের কাজ ফেলে অদ্রির জন্য ছোটাছুটি করছে। না করেই বা কী করতে পারে অনির্বাণ। ছেলেবয়সের বন্ধু অদ্রি। সুমনার সঙ্গে বিয়েটা কেচে যেত অদ্রি না থাকলে। কাল সকালেই যাবে ও। কাল আরও একটা কাজ আছে। সেটাও করে ফেলতে হবে।

নার্সিং হোমের বাইরে সারি বেঁধে হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। উবার বুক করে নিল অনির্বাণ। রিখির কাছে যাবে এখনই। সাদার্ন অ্যাভিনিউতে। রিখি শনিবার বাড়িতে থাকে। ওর আজ ডে অফ। অবশ্য ও যদি সত্যি মুর্শিদাবাদ গিয়ে থাকে, তাহলে দেখা হবে না। সত্যি রিখি মুর্শিদাবাদে হয়েও ভেস্তে গেল। একটা পোস্টকার্ড হাতে ঝুলিয়ে বসে থাকতো কুসুম পিসি। এই কার্ডেই কেউ অদ্ভুত কিছু কথা লিখে পাঠিয়েছিল কুসুমপিসি শ্বশুরবাড়ির ঠিকানায়। কুসুমপিসির মা হতে না পারাটা সংসারে ক্ষতির সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করবে বা বৈধব্যযোগের চিহ্ন, সেটা কেউ জানতোই না! সন্ধেবেলা বারান্দায় বসে থাকতো পিসি। পাত্রপক্ষ হাতে করে পোস্টকার্ডটা নিয়ে এসেছিল। ওঁরা দুঃখিত স্বরে জানিয়েছিলেন, কিছু করার নেই। ছেলের মা এসব শুনে কুসুমের সঙ্গে বিয়েটা মানতে রাজি হচ্ছেন না। সেটাই স্বাভাবিক। কটাদিন তোলপাড় হল এই নিয়ে। কে পাঠিয়েছে চিঠি! মা বলেছিল, কেউ কিছু করেনি। সবই কুসুমের শ্বশুরবাড়ির চাল। একটা অদ্ভুত কারণ দেখিয়ে বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে। হয়তো দেখেশুনে বড়লোকের ঘরে বিয়ে করবে। একটা মানুষের স্বপ্নে ঘরে এমন আঘাতের শব্দ আজও কানে বাজে! আস্তে আস্তে সবটা ঝিমিয়ে গেল। কুসুমপিসি ফিরে এল বাড়িতে। সন্ধের দিকে টিভি সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ততায় কেউ খেয়াল করতো না কুসুম পিসি ঝুম মেয়ে বসে আছে আধ অন্ধকার বারান্দার এককোণে। একদিন ভূগোল বই আনতে গিয়ে বারান্দায় বসে থাকা জড় পিন্ড পিসিকে দেখে চমকেগিয়েছিল অনির্বাণ। সেই সঙ্গে, লেবুফুলের গন্ধে ভরা সন্ধের বাতাস, খুব মনে পড়ে। আজ যেমন উবারে বসে এসির নরম পেলবতা আর শহরের কাঠিন্যর মধ্যে গন্ধটা ছিটকে ভেসে এল অনেকদিন আগের এক সন্ধের মুঠো থেকে। সঙ্গে সঙ্গে অদ্রির মুখটা, অসহায় চোখদুটো মনে পড়ে গেল। ডাক্তার খুব আশা দেখছেন না। উড়ালপুলের ডানদিকের ডিভাইডারে ধাক্কা খেয়ে পাক খেয়ে বাঁদিকে গিয়ে পড়েছিল অদ্রি। সেখান থেকে তিন চারটে পাক খেয়ে চাকার নীচে ঢুকে গিয়েছিল। দুর্ঘটনা এভাবেই এল ছেলেটার জীবনে।

গাড়ি ডানদিকে বাঁক নিতেই রিখিদের বাড়ির মুখোমুখি হয়ে পড়ল অনির্বাণ। সুন্দর ছিমছাম বাড়িটার নামটা রিখির দেওয়া। চিত্রকূট। নামটা দেখলেই ক্লাস ফাইভে পড়া কবিতাটা মনে পড়ে যায় বাবা যদি রামের মত পাঠায় আমায় বনে/ যেতে আমি পারিনে কি তুমি ভাবছ মনে?

লাস্টের লাইনটা খুব প্রিয় অনির্বানের। লক্ষ্মণ ভাই যদি আমার থাকতো সাথে সাথে। কী যে হচ্ছে। লক্ষ্মণ ভাই মনে আসতেই অদ্রির চোখদুটো কাছে চলে এল। বুকের কাছে। লক্ষণ ভাই এখন সহায় চায়।

গাড়ি থেকে নেমে রিখির খোঁজে পা বাড়াল অনির্বাণ। গেটের গায়ে নেমপ্লেটে বাবা-মায়ের নামের পাশে রিখির নাম। হালকা মেঘের ছায়া থেমে আছে এই বাড়িটার ওপরে। ফুলের টবে রঙবেরঙি ফুল, সবুজ লতা উঠে গেছে বাড়ির ছাদে।

ডোরবেলে আঙুল রাখতে হালকা হলুদ কাফতান পরে বেরিয়ে এল রিখি। অনির্বাণকে দেখে থেমে গেল ও। যেন আশা করেনি অনির্বাণকে রিখিকে এখন দেখতে পাবে ভাবেনি অনির্বাণ। মনে মনে জানতো রিখি মোটেই যায়নি মুর্শিদাবাদে। তবু কোথায় ক্ষীণ আশা দম আটকে অগোছা করছিল। হয়তো সত্যি...রিখি মুর্শিদাবাদেই গেছে। যদিও যাওয়াটাও এই মুহূর্তে সরলরেখায় থাকতো না। অদ্রি হাসপাতালে অর্ধেক বেঁচে আছে। ওকে ফেলে রেখে নিজের মন ভাল করতে মুর্শিদাবাদে চলে গেছে রিখি, এটা কি মন ভাল করার মত ব্যাপার। অদ্রির সঙ্গে দুটোবছরের সম্পর্ক এতটাই নড়বড়ে ছিল। এখন রিখিকে দেখে হতাশ হল অনির্বদ। রিখি এখানেই আছে। অথচ অদ্রিও এখানেই আছে, কিন্তু রিখি অভির কাছে নেই। কী আশ্চর্য অঙ্ক। ভুল উত্তর পাওয়া যাচ্ছে এই অঙ্কে। অথচ ঠিকঠাক পদ্ধতিতেই অঙ্কটা শুরু হয়েছিল একদিন।

বারান্দায় বেরিয়ে আসা রিখির অবস্থা লক্ষ্মণের গন্ডির মধ্যে আটকে পড়া টালমাটাল সীতার মত। অনির্বানের মনে হল আজ ফের বৃষ্টি হবে।

-তুমি।

রিখির ঠোঁট নড়ে উঠল।

ঠোঁটের সঙ্কোচন প্রসারণ দেখে অনির্বাণ বুঝল রিখি তুমি শব্দটা উচ্চারণ করেছে।

-কথা ছিল।

রিখি দরজা খুলে সরে দাঁড়াল একপাশে। অনির্বাণ জুতো খুলে বিখির পেছন পেছন ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। লিভিং রুমের লম্বা লম্বা অরেঞ্জ কালারের পর্দা, ব্রাউন কালারের সোফার ওপর সাজানো কুশন দেখল অনির্বাণ।

-বসো। রিখি নীচুস্বরে কথা বলে। -হ্যাঁ। অনির্বাণ বসতে বসতে রিখিকে দেখল। রিখি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সময় গুনছে যেন।

-তুমিও বস। কথা আছে।

অনিচ্ছাভরে বসল রিখি। মুখ নীচু করে হাতের ওপর হাত রেখে বসে আছে। অপেক্ষা করে আছে প্রতিরোধ করার জন্য।

অনির্বাণ সোজাসুজি প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল

- কেমন আছ রিখি?

চোখ তুলে তাকাল রিখি। সামান্য ঘাড় নাড়ল।

-মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরলে কবে?

প্রশ্নটা শুনে চমকে চোখ তুলেই ফের চোখ নামিয়ে নিল রিখি। ওর সুন্দর হাইলাইট করা চুল একবারও মনে করায় না যে রিখি খুব খারাপ আছে।

-যাওনি? ওহ। আমি জানতে এসেছিলাম তুমি অদ্রিকে দেখতে যাওনা কেন? তোমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তোমরা পরস্পরকে ভালবেসে বিয়ে করছ। এখন কেন মনে হচ্ছে... তুমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছো অদ্রির প্রতি তোমার আর আকর্ষণ নেই।

রিখি জবাব দিল না। খোলা জানালা দিয়ে মেঘ জমজম বাইরেটা দেখছিল। রিখির জবাবের জন্য একটু অপেক্ষা করল অনির্বাণ। রিখি মুখ না ফিরিয়েই কথা বলল-চা খাবে?

-না। আমার কথার জবাব পেলাম না রিখি।

-আসলে আমি একটু ব্যস্ত...

-এটা কোন অজুহাত হলনা রিখি। অদ্রি খুব খারাপ আছে। ওর পায়ে

-জানি।

কী জানো?

ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার।

মানে!

-অদ্রির পায়ে যেভাবে ফ্র্যাকচার হয়েছে, সারাজীবন খুঁড়িয়ে হাঁটতে

হবে ওকে।

-তো?

-আমি তো কোন অসুস্থ মানুষকে ভালবাসিনি। সারাজীবন সাফার করতে হবে আমাকেই তো?

স্তব্ধ হয়ে রিখির সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অনির্বাণ। কুসুমপিসি কখনও গান করতো না। অন্তত অনির্বাণ গাইতে দেখেনি

পিসিকে। ওর স্মৃতিতে কুসুমপিসির দুটো বিপরীতধর্মী ছবি ফ্রেমবন্দী আছে। একটা হল দুধ ময়দা মেখে বসে আছে পিসি। মাজা রঙকে আরও একটু উজ্জ্বল করার বাসনায় রূপচর্চা করতো। অন্য ছবিটা হল অন্ধকার বারান্দার এককোণে মাথা গুঁজে বসে আছে পিসি। অচল পয়সাটা ফেরত দিয়ে গেছে শ্বশুরবাড়ি। মা হতে পারেনা যে শরীর তাকে দিয়ে আর কী হবে। যে শরীরটাকে মেজে ঘষে একজনের জন্য যত্ন করে তৈরি করেছিল, সেই শরীর এমন ভাবে বিশ্বাসভঙ্গ করবে কেন, সেটাই বোধহয় ভাবতো পিসি। নিজের ফেলে আসা বাড়ি ঘর, ঘরের খুঁটিনাটি জিনিসপত্র, এমন কি পুরনো তেঁতুলের কৌটোটার জন্য পর্যন্ত কাঁদতো পিসি। এক অতৃপ্ত প্রেতাত্মার মত সংসারের চারপাশে ঘুরে বেড়াতো পিসির বুভুক্ষু চোখ দুটো। মা একদিন বাবাকে বলছিল- তুমি আমি যখন গল্প করি, কুসুম কেমন করে যেন দেখে আড়াল থেকো আমার ভারি ভয় করে। বাবা বুঝেছিল পিসিকে। মন খারাপ করা গলায় বাবা বুঝিয়েছিল মাকে ও তোমাকে আমাকে দেখে না। আমাদের মধ্য দিয়ে ওর ঘর, বরকে দেখে! স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কি একদিনে ছুটে যায়? অধীর ভাল করল না। একটা নিরপরাধ মেয়েকে এভাবে শাস্তি দিয়ে খারাপ করল। আরেকটা বিয়ে যে করবে, তার যদি সন্তান না হয়? জীবন কি দাঁড়িপাল্লায় মেপে জুপে চলে?

অনির্বাণ দেখেছিল হোলির দিনে পাড়ার দীপুকাকু কুসুমপিসিকে রঙ মাখাচ্ছে। রাতে স্নান করতো পিসি বালতি বালতি জল ঢেলে। তপ্ত শরীরকে শীতল করতে চাইতো হয়তো বা। আস্তে আস্তে অচল শরীরের দাবি মানতে হল পিসিকে। একদিন ঘোর ঘোর দুপুরে বাড়ির পেছনের পুকুর জল জঙ্গলের মধ্যে কুসুমপিসিকে নিয়ে কেমন অদ্ভুত খেলছিল দীপুকাকু। দেখে ভয় পেয়েছিল অনির্বাণ। খুব ছোট ছিল, কিন্তু ভয় পেয়েছিল কেন জানে না অনির্বাণ।

-তুমি কি আর কিছু বলবে?

রিখিকে অস্থির দেখাচ্ছে

-আমি একটু বের হব।

আমি ভাবছি, কী দেখে তুমি অভ্রিকে ভালবেসেছিল

-আমি যাকে ভালবেসেছিলাম, সে এখন আর সে নেই।

রিখি স্পষ্ট চোখে তাকাল

-আমি এই অদ্রিকে ভালবাসিনি। অনির্বাণ ঝটকাটা সামাল দিতে দিতে অনুধাবন করতে থাকে রিখির কথাগুলো। বোঝে জীবনের বাটখাঁড়া সবসময় সমান ওজন নিতে চায়। পাল্লা দুদিকে সমান হতে হবে। এতটুকু ত্রুটি চলবে না। সব মাফে মাফে। এ যে রাজুর অবস্থা। রাজু কলেজে চাকরি করছিল। তখন ওরই কোলিগ সোহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে যখন অসুস্থ বাবাকে দেখাশোনার জন্য গ্রামের উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে চাকরি নিয়ে যেতে চায়, সোহিনী বলে দিয়েছিল, সোহিনী কলেজের লেকচারারকে ভালবেসেছে।

স্কুলমাস্টারকে না। রাজু স্কুলমাস্টারি নিলে সোহিনী আর এগোতে চায় না। সম্পর্কের ইতি ওখানেই। অদ্রিকে কী বলবে অনির্বাণ? রিখি বরং বলুক যা বলার।

-হ্যাঁ, আমার বাবা-মা যাবেন ওদের বাড়িতে। সব খোলাখুলি হওয়া ভাল।

জীবনের চরম সত্য এভাবে উচ্চারিত হল এমনভাবে, অনির্বাণ নিঃসাড় হয়ে পড়ছিল। সাপের ছোবলের পরে বিষ শরীরের রক্তে জ্বলতে জ্বলতে মিশে যাচ্ছে। অনির্বাণ নীল হয়ে পড়ছিল সেই বিষের ধ্বকে। কুসুমপিসি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিল। যেদিন ধরা পড়েছিল, কুসুমপিসি ভয় পায়নি। আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল

-ও বৌদি, আমার বরকে খবর দাও গো! ওরা এসে দেখে যাক, আমার দোষ ছিলনা! আমি মা হচ্ছি গো! আমার শরীর অচল নয় গো!

কান্ড দেখে মা ভয় পেয়েছিল প্রচন্ড। জেরা করে দীপুকাকুর নাম জানতে পারে মা। বাবাকে সব জানিয়েছিল মা। পেছনের খুপড়ি ঘরে বাবা অফিসের কাজ করতো। দীপুকাকুকে ডেকে আনা হয় বাড়িতে। অনির্বাণ সবটুকুই দেখেছিল। দীপুকাকু সন্ধের দিকে এসেছিল গরম শাল গায়ে দিয়ে। সব শুনে কিন্তু দীপুকাকু দায় নিতে চায়নি। অবাক গলায় বলেছিল

-দায় আমার একার তো নয়। কুসুম পরিপক্ক মেয়ে! না বুঝে এগিয়েছে নাকি?

সে এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে পিসি। বাড়িতে, পাড়ায় ডি ডি পড়ে গিয়েছিল! পিসি খুব অবাক হয়েছিল। যে কারণে ওকে ত্যাগ করা হয়েছিল, সেই দোষ কাটিয়ে উঠলেও ওকে ত্যাগ করা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত পিসি কীটনাশক খেয়ে বেঁচে গিয়েছিল মরে গিয়ে। জীবনের হিসেব এভাবে মিটিয়ে গিয়েছে কুসুম পিসি। আজ রিখির কথা ভাবতে গিয়ে অদ্রির কথা মনে হল স্বাভাবিক নিয়মে। অদ্রি ওথেলো পড়ছে। এদিকে ও জানে না ওর জীবনে শাইলক এসে গেছে বটিখাড়া নিয়ে। এখন শাইলক সবটুকু হিসেব করে নিতে জানে। অদ্রির শরীরের একবিন্দু রক্তেরও কোনই হিসেব করেনি সে। বাটখাড়ার মাপটুকু ছাড়া সে কিছু জানে না। এই সময়ে বিখির দিকে তাকিয়ে এক চেনা সুদখোরের সাদা দাড়িগুলোকে বাতাসে স্থির থাকতে দেখল অনির্বাণ। এরা হাওয়ায় ওড়ে না। নিজের ধান্দায় স্থির থাকতে জানে!

Archive

Most Popular