19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বারাণস্যাং অন্নপূর্ণাং

প্রতিবেদন

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুসারে দেবাদিদেব বিশ্বেশ্বরের বাসস্থান অবিমুক্তকাশী ধাম ।

তীর্থরাজ্ঞী বারাণসীর পূর্ব নাম কাশী। কাশা থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ ঔজ্জ্বল্য। কেউ বলে প্রাচীন ভারতে প্রবহমান বারাণসী নদী থেকেই এ শহরের অমন নাম। লোকগাথা অনুযায়ী বরণার নামে এক রাজা কাশীতে রাজত্ব করতেন। তাঁর নামানুসারে কাশীর নাম হয় বারাণসী। ভূগোল বলে গঙ্গার দুই শাখা-নদী বরুণা এবং অসি দুদিক থেকে এসে মিলিত হয়েছে গঙ্গায়। সেই স্থানে গড়ে ওঠা জনপদের নাম বারাণসী। এই নাকি সেই অসি যা দিয়ে দেবী বিন্ধ্যবাসিনী দুর্গম নামে দোর্দ্দন্ডপ্রতাপ অসুরকে বধ করে রণক্লান্ত হয়ে তারপর অসি বা তলোয়ার টিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন এখানে।

সেবার অসিঘাট থেকে দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে গিয়ে জেনেছিলাম আরও ইতিহাস।

পুরাণ অনুযায়ী প্রজাপিতা ব্রহ্মা নাকি কাশীর বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণার আদেশে কাশীর রাজা দিবোদাসের সহায়তায় দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। তাই বুঝি এই ঘাটের নাম দশাশ্বমেধ ঘাট।  

মহাদেবকে স্বাগত জানাতে ব্রহ্মা এইখানে নাকি দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন তাই এই দশাশ্বমেধ ঘাটটি ঐতিহাসিক ভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দৃষ্টিনন্দন ঘাট। দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করলে নাকি দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞের পুণ্যফল লাভ করা হয় সেই কারণে প্রতিদিন বহু মানুষ দেশ-বিদেশ থেকে এখানে আসেন। এই ঘাট ব্রহ্মদ্বার বলেও অভিহিত। পূর্বে এর নাম ছিল রুদ্রসরোবর এবং ঘোড়াঘাট। কাশীর পঞ্চতীর্থের অন্যতম তীর্থ এই দশাশ্বমেধ ঘাট। ১৭৪৮ সালে পেশোয়া বালাজী বাজীরাও নতুন ঘাটটি নির্মাণ করেছিলেন। ঘাটে প্রবেশের মুখে সিপিডাব্লুডির প্রকান্ড পাথরের ফলক থেকে ইতিবৃত্ত জেনেছিলাম।

কাশী মহাতীর্থে দেবাদিদেব বিশ্বনাথের মন্দিরের সন্নিকটেই তাঁর সহজসঙ্গিনী মা অন্নপূর্ণার মন্দির। কাশীর বিশ্বেশ্বর এখানে মায়ের ভৈরব এবং দেবী অন্নপূর্ণা তাঁর প্রকৃতি। পীঠ হয়ে ওঠার পেছনে যে স্থান মাহাত্ম্য থাকে অর্থাত উত্তরবাহিনী নদী, সংলগ্ন শ্মশান সবকিছুই বর্তমান এখানে।

তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে আছে,

বারাণস্যাং বিশালাক্ষী দেবতা কালভৈরবঃ

মণিকর্ণীতি বিখ্যাতা কুন্ডলঞ্চ মম শ্রুতেঃ।।

যদিও এখানে বলা হয়েছে দক্ষযজ্ঞের সময় দেবীর কুন্ডল পড়ার কথা কিন্তু স্কন্দপুরাণের কাশীখন্ডে আছে বিষ্ণুর একদা এখানে মহাতপস্যা করার কথা। তপস্যার পর তিনি তাঁর চক্র দিয়ে একটি পুকুর খনন করেন এবং নিজের স্বেদগ্রন্থি নিঃসৃত স্বেদ বা ঘাম  দিয়ে তা পূর্ণ করেন। মহেশ্বর তা দেখে অতীব প্রীত হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন ও তাঁর মাথা নাড়ার ফলে কানের কুন্ডল ঐ পুকুরে পতিত হয়। তাই ঐ স্থানের নাম মণিকর্ণিকা। শিবপুরাণে বলা হয় তপস্যার সময় বিষ্ণুর কান থেকে বিবিধ রত্নে ভূষিত কর্ণকুন্ডল পতিত হবার আখ্যান। পীঠনির্ণয় তন্ত্রে দেবীর কর্ণকুন্ডল পতিত হবার জন্য দেবী হলেন স্বয়ং মণিকর্ণী বা বিশালাক্ষী স্বরূপিণী আর তাঁর ভৈরব হলেন কালভৈরব।

কিংবদন্তীর কড়চায় রয়েছে সতীর দেহত্যাগের গল্প। দক্ষযজ্ঞের পর ক্রুদ্ধ মহাদেব সতীর দেহ নিয়ে যখন হিমালয়ের পথে পথে ঘুরছিলেন তখন সতীর কানের কুন্ডলের মণি পড়েছিল তাই মণিকর্ণিকা সতীপিঠ। আবার অন্যগল্পে বহু হাজার বছর ধরে তপস্যার পর বিষ্ণু দোর্দ্দন্ড নৃত্যরত নটরাজ মহাদেবকে খুশি করার জন্য কাশীতে একটি কুন্ড খনন করেন । পার্বতীকে কাঁধে নিয়ে মহাদেব বিষ্ণুর প্রতি তুষ্ট হন। এবং সেই কুন্ডে স্নান করার সময় মহাদেবের মণি এবং পার্বতীর কানের কুন্ডল পড়ে সেই কুন্ডে । তাই মণিকর্ণিকা ঘাট হল একান্নপিঠের এক অন্যতম সতী পিঠ । কুণ্ডে নেমে মাথায় জল দিই ।  

তবে বিদগ্ধজনের মতে মণিকর্ণিকা হল একটি উপপীঠ কারণ সতীর দেহাংশ নয় কর্ণের কুন্ডল থেকে মণি পড়েছিল। শিবপুরাণ অনুযায়ী বিষ্ণুর কর্ণকুন্ডল সেটি। শিবের আদেশে তপস্যারত বিষ্ণুর শরীরের স্বেদগ্রন্থি থেকে নির্গত স্বেদ তাঁর তপস্যার স্থানটিকে প্লাবিত করে । অদ্ভূত সেই প্লাবন দেখামাত্রই  বিষ্ণুর মাথা আন্দোলিত হতেই তাঁর কর্ণের কুন্ডলটি নিক্ষিপ্ত হয় এবং বিবিধ রত্ন খচিত সেই কুন্ডলটি যেখানে পড়ে তাই মণিকর্ণিকার কুন্ড বা জলাশয় নামে পরিচিত।  

এই উপপীঠের পীঠদেবী অন্নপূর্ণা যাঁর ভৈরব হলেন কাশী বিশ্বনাথ। আদ্যাস্তোত্রেও এর উল্লেখ বারাণস্যাং অন্নপূর্ণাং শব্দবন্ধে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গলে পাই এখানে দেবীর বক্ষদেশ পতিত হবার কথা। আবার রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলের সূচনা লগ্নে অষ্টভুজা দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য কীর্তন করেছেন এভাবে...

অন্নপূর্ণা অপর্ণ্ণা অন্নদা অষ্টভুজা

অভয়া অপরাজিতা অচ্যুত অনুজা।।

শুন শুন নিবেদন সভীজন সব

যে রূপে প্রকাশ অন্নপূর্ণা মহোৎসব।।

এই দেবী অন্নপূর্ণাকে ঘিরেই বারাণসীতে নিয়মিত এমন এলাহি অন্নভোগ হয় যে সেখানে কেউ অভুক্ত থাকেনা।

শিব ও পার্বতীর সংসারের ঘোর দারিদ্রের বর্ণনা পাই মঙ্গলকাব্যে। মা অন্নপূর্ণা তখনো দেবী অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠেননি।

ভিখারি শিবের সব বায়নাও সামলায় উমা।

শাক নাই, শুক্তো নাই, ব্যঞ্জনও নাই, চাউল বাড়ন্ত, তবে ফ্যান–ভাত চাই’

রান্না করার সব তরিবৎও শিবের জানা। এমনকি মুসুরির ডাল রান্নায় কতটা জল দিতে হবে, করঞ্জা ফল কীভাবে কাটতে হবে, ঘিয়ে ফুলবড়ি ভেজে দুধে ফেলে কেমন করে রাঁধতে হয়, পলতা শাকের চচ্চড়ি, ডাল সাঁতলানোর পদ্ধতি...এমন সব রেসিপি বাতলে শতেক ফরমাশ জারি করে শিব বলে রন্ধন করিবে কিছু ক্ষীরি। দেবী হয়ে ওঠার পর অন্নপূর্ণা প্রদত্ত অন্ন খেয়ে শিবের চোখেমুখে ফুটে ওঠে বালক সুলভ তৃপ্তি।

অন্নপূর্ণা দিলা শিবেরে অন্ন

অন্ন খান শিব সুখ সম্পন্ন।।

আর তারপরেই সুখাদ্যের মধুরেণ সমাপয়েত যখন হয় তখন মহাদেবের আনন্দ আর দেখে কে?

পায়সপয়োধি সপসপিয়া, চুক চুক চুক চুষ্য চুষিয়া,

কচর মচর চব্য চিবিয়া, লিহ লিহ জিহে লেহ্য লেহিয়া,

চুমুকে চক চক পেহ পিয়া, জয় জয় অন্নপূর্ণা বলিয়া,

নাচেন শঙ্কর ভাবে ঢলিয়া।  

এই শিব আবার একদিন রাগ করে, ঘরবাড়ি ছেড়ে চলেই গেলেন গটগট করে। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, কী করতে ঘর সংসার করা! তুমি সুখে ঘর করো নিজের ছেলেমেয়েকে নিয়ে। যা ভিক্ষে করে আনি, সে তথ্য নথিভুক্ত হয়না বলে, এত কথা শুনতে হবে আমাকে? তোমার ছেলে গণেশের ইঁদুরগুলো সব চাল খেয়ে নেয়। আমার সাধের বলদটা দুর্বল হচ্ছে দিনে-দিনে। টলমল করে, ঘাসপানিটা পর্যন্ত পায় না। তোমার ছেলে কার্তিকের ময়ূর খেয়ে ফেলবে এই ভয়ে জটার সাপখোপ গুলো কাঁপছে সারাদিন।

উমা পেয়ে মহেশের বাড়িল আনন্দ  কিন্তু উমার যে খেদের শেষ নেই।

বড় পুত্র গজ মুখ চারি হাতে খান

সবে গুণ সিদ্ধি খেতে বাপের সমান।।

ভিক্ষা মাগি খুদ কণা যে পান ঠাকুর

তাহার ইন্দুরে করে কাটুর কুটুর।।

ছোট পুত্র কার্ত্তিকেয় ছয় মুখে খায় ।

উপায়ের সীমা নাই ময়ূরে উড়ায়।।

উপযুক্ত দুটি পুত্র আপন যেমন

সবে মাত্র আমি ঘরে এই অলক্ষণ।।

করেতে হইল কড়া সিদ্ধি বেটে বেটে

তৈল বিনা চুলে জটা অঙ্গ গেল ফেটে।।

এহেন দেবী পার্বতী একদিন শিবকে বলেই ফেলেন তাঁর মনের কথা। দারিদ্র্য তাঁর আর সহ্য হয়না। মাথার চুলে ও সর্বাঙ্গে তেল না পড়ে রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ৈছে তাঁর গাত্র ও কেশরাজি। শিবের জন্য নিত্য সিদ্ধিপাতা বেটে বেটে হাতে পড়েছে কড়া। এক পুত্র গজানন, চারহাতে খায় ও অন্য পুত্র ষড়ানন ময়ূর নিয়ে অহোরাত্র খেলে বেড়ায়। এতজনের সংসারে অন্ন নেই। তাই পার্বতীর হাহুতাশ দেখে মহাদেব ভিক্ষায় বেরুলেন।

আর পার্বতী তাঁর সখী জয়ার কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন..

কি করিব একা ঘরে রয়ে বৃথা

কেন দুঃখ পাই বাপের মন্দিরে যাই

গণপতি কার্তিকেয় লহে।।

যে ঘরে গৃহস্থ হেন সে ঘরে গৃহিণী কেন

নাহি ঘরে সদা খাই খাই

কি করে গৃহিণী পানে ক্ষণক্ষণ ঝন্‌ঝনে

আসে লক্ষ্মী বেড় বান্দে নাই।।

মনস্তাপ করতে করতে দেবী বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন ভাবলেন। জয়া তাঁকে নিরস্ত করে বললেন দ্যাখো, স্বামী ধনহীন হলে বাপের বাড়িতে মেয়েদের কোনো সম্মান নেই" তার চেয়ে তুমি অন্নপূর্ণা রূপ ধারণ কর। সারা বিশ্বের যত অন্ন আছে তা তোমার সংগ্রহে রাখো। মহাদেব ভিক্ষা করে কোথাও যখন অন্ন পাবেননা তুমিই তাঁকে অন্ন যোগাবে দেবী অন্নপূর্ণার রূপ ধারণ করলেন। সারা বিশ্বের সমস্ত অন্ন একত্র করে নিজের সংগ্রহে রাখতে শুরু করলেন। এদিকে মহাদেব আর ভিক্ষা পান না। অবশেষে তিনি লক্ষ্মীর কাছে গেলেন অন্নের জন্য। লক্ষ্মী তাঁকে বললেন, অন্ন তুমি কোথায় পাবে? তোমার ঘরণী সব অন্ন নিজের কাছে রেখেছেন যে! তাই তো বিশ্ব সংসারে অন্ন অপ্রতুল!

সেদিনই আবার মহাদেব তখন ঘরে ফিরে দেবীর কাছে ভিক্ষা চাইলেন। পরিতৃপ্তি সহকারে নিজের উদরপূর্তি করে মহাদেব বিশ্বকর্মাকে অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য কাশীতে স্বর্ণদেউল মন্দির নির্মাণের আদেশ দিলেন। চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমীতিথিতে দেবীর পূজা চালু হল। সেটিই বর্তমানে অশোক অষ্টমী তিথির চৈতালি দুর্গার পুজো। মা দুর্গা শোক রহিতা তাই অন্নপূর্ণা স্বরূপিণীর আরেকটি রূপ এই অশোকা।

দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য ও প্রকাশ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গলের পরের পর্বে আরেক লৌকিক কাহিনীর অবতারণা করলেন। দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া দেবীকে বললেন, ধনপতি কুবের নিত্য তোমার পুজো করে। পুজোর ফুল সংগ্রহ করেন কুবের অনুচর বসুন্ধর। বসুন্ধরকে শাপগ্রস্ত করো। এবং তবেই বসুন্ধরের মাধ্যমে তোমার পুজোর প্রচলন হবে। ধনপতি কুবের পুজোর ফুল সংগ্রহ করলেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ফুলের বাগানে তার স্ত্রী বসুন্ধরার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। বসুন্ধরের স্ত্রী তার স্বামীকে বললে, এই এত ফুলে পুজো করে কি হবে স্বামী? তার চেয়ে আমরা এই ফুল দিয়ে বাসর রচনা করে প্রেমালাপ করি!

এদিকে কুবের ভবনে বসুন্ধরের বিলম্ব দেখে দেবী ক্রুদ্ধ হলেন। এবং বসুন্ধরকে অভিশাপ দিয়ে মর্ত্যে প্রেরণ করলেন। মর্ত্যে বসুন্ধর বাংলাদেশের গঙ্গার তীরে বরগাছি গ্রামে হরি হোড় রূপে জন্ম নিলেন । খুব দুঃখ কষ্টে তার জীবন কাটে। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কাঠ কেটে, ঘুঁটে কুড়িয়ে তার বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য অন্নের জোগাড় করে হরি হোড়। একদিন দেবী অন্নপূর্ণা এক বুড়ির বেশ ধরে তার সামনে উপস্থিত হলেন। হরি হোড় দেখল, সেই বুড়ি তার সংগৃহীত কাঠ-ঘুঁটে সব একত্র করছে।

কোথা হতে আসে বুড়ি, ঘুঁটে পায় ভরে ঝুড়ি সর্বনাশ করিল আমার।

কাড়ি নিলে হবে পাপ, বুড়ি পাছে দেয় শাপ এ দুঃখের নাহি দেখ পার।।

বুড়ি তখন তাকে বললে, বাছা, আমি এত ভার আর ব‌ইতে পারছিনা, তুমি যদি আমার বোঝাটি বয়ে দাও এর অর্ধেক কাঠ ও ঘুঁটে আমি তোমাকে দান করব!

বৃদ্ধারূপিণী দেবী এত ধীরগতিতে হাঁটতে শুরু করলেন যে হরির বাড়ির কাছে যেতেযেতেই সন্ধ্যে নেমে এল। বুড়ি বলল এখন তো আর চলতে পারিনে বাবা, তোমার ঘরেই থেকে যাই হরি বললে কিন্তু বুড়িমা, আমরা যে হতদরিদ্র, তোমাকে কী খাওয়াব?

বুড়ি বললে

বাছা, তোমার মাকে বল, অন্নপূর্ণার নাম করে ভাতের হাঁড়ি বসাতে

হরির মা তখন বুড়ির আদেশ মত ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে দেখেন তার মধ্যে নানাবিধ সুখাদ্য রয়েছে। এবার হরি বুঝতে পারলেন বৃদ্ধাবেশী দেবী অন্নপূর্ণার ছলনার কথা। দেবী হরি হোড়কে বরদান করতে উদ্যত হলে হরি বলল, এই বর দিন, যাতে দেবীর পাদপদ্মে যেন আজীবন ঠাঁই হয় দেবী তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন। এরপর হরির তিনবার বিয়ে হল। ধন সম্পদের অভাব র‌ইলনা। প্রত্যহ তার ঘরে অন্নপূর্ণার পূজা হতে থাকল। কিন্তু এক গৃহে বেশীদিন বাধা পড়ে থাকলে বসুন্ধরের শাপমুক্তি ঘটবে কিভাবে? তাই দেবী আবারো ফন্দী আঁটলেন। এদিকে দেবী হরিকে কথা দিয়েছেন যে তার গৃহ ছেড়ে অন্যত্র যাবেননা। স্বর্গে বসুন্ধরের স্ত্রী বসুন্ধরা ব্যস্ত হলেন তার স্বামীর জন্য। দেবীকে সে কাতর হয়ে প্রার্থনা জানালো। একে পতি বিরহে সে আকুল, অন্যদিকে তিন সতীনের কষ্ট সে আর সহ্য করতে না পেরে দেবীকে বলল আমাকে রক্ষা করুন, অনেকদিন তো হল আমার স্বামীর মর্ত্যবাস। এদিকে আমি যে আর স‌ইতে পারিনে

দেবী ভাবলেন, বসুন্ধরাকেও যদি মর্ত্যে বসুন্ধর অর্থাত হরি হোড়ের গৃহে পাঠাই তাহলে ওদের ঘরে চরম অশান্তি সৃষ্টি হবে আর সেই অছিলায় তিনি অন্যত্র গমন করবেন।

কিন্তু হরি হোড়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে অন্নপূর্ণার ব্রতী হবে কে? তাই নিত্যপুজো চালু রাখার জন্য দেবী গমন করলেন ভবানন্দ মজুমদারের গৃহে। হরি হোড়ের পুজো সময় দেবী তার মেয়ের রূপ ধরে এসে বললেন, বাবা, আমি তবে যাই? হরি বললেন,  হ্যাঁ, যাও। ব্যাস্! সেই অপেক্ষাই করছিলেন দেবী। তিনি ভক্তের সঙ্গে ছলনা করে ভবানন্দের গৃহে পা বাড়ালেন।

হরি হোড়ের বাড়ি থেকে ভবানন্দের বাড়ি যেতে হলে নৌকায় নদী পেরুতে হবে দেবীকে। নদী পার হবার জন্য ঈশ্বরী পাটনীর সাহায্য চাইলেন তিনি। একা মেয়েছেলেকে নৌকা পার হতে দেখে মাঝি ঈশ্বরী তার পরিচয় জানতে চাইলেন। দেবী রহস্যাবৃত করে নিজের পরিচয় সম্বলিত বলতে লাগলেন সেই বিখ্যাত কবিতা...

গোত্রের প্রধান পিতা মুখ্য বংশজাত।

পরম কুলীন স্বামী বন্দ্যো বংশখ্যাত।।

পিতামহ দিলা মোরে অন্নপূর্ণা নাম।

অনেকের পতি তেই পতি মোর বাম।।

এইভাবে যুগ যুগান্ত ধরে অন্নদামঙ্গলের এই সাধারণ লৌকিক কাহিনীগুলি হরি হোড় থেকে ভবানন্দ মজুমদার, বাংলার একগ্রাম থেকে অন্য গ্রামের পরিসর ছাড়িয়ে দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য প্রচার করে আসছে। আজও তাই অন্নপূর্ণা প্রসঙ্গ এসেই পড়ে বাংলার প্রাচীন সাহিত্যের ধারা অবলম্বন করে আধুনিক সাহিত্যে। আর এখনও আমাদের বাংলার আনাচেকানাচে অন্নপূর্ণা পুজোর সময় অন্নকূটের রীতিও চালু আছে। বারাণসীর পুণ্যধামও তার ব্যাতিক্রম নয়।

এই শিব আবার কঠোর পঞ্চতপ সাধন মার্গে উত্তীর্ণ হয়ে দেবী অন্নপূর্ণার মর্ত্যলোকে অবতরণের আকুতি জানান। কাশীতে প্রকাশিত এই অন্নপূর্ণা যাতে জনগণের কল্যাণে অন্ন প্রদান করেন।

অন্নপূর্ণা অন্নদাত্রী অবতীর্ণা হও

কাশীতে প্রকাশ হয়ে বিশ্বপূজা লও।। 

একসময় ভারতচন্দ্রের কাব্যেও অন্নপূর্ণার অধিষ্ঠানের কথা বারাণসীতে।

কলকোকিল অলিকুল বকুলকুলে / বসিলা অন্নপূর্ণা মণিদেউলে। 

আর তারপরেই দেখি অন্নদামঙ্গলে চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণার মহাসমারোহে পুজোর কথা

ধন্য ঋতু বসন্ত সুধন্য চৈত্র মাস / ধন্য শুক্লপক্ষ যাহে জগত উল্লাস

তাহাতে অষ্টমী ধন্যা ধন্য নাম জয়া / অর্দ্ধচন্দ্র ভালে শোভে সাক্ষাৎ অভয়া।। 

অবতীর্ণা অন্নপূর্ণা হইলা কাশীতে / প্রতিমায় ভর করি লাগিলা হাসিতে।।  

আর তারপর অন্নে পূর্ণ কর বিশ্ব বিশেষতঃ কাশী ... সেই ট্র্যাডিশন এখনও অব্যাহত।

পুরাণে বর্ণিত আছে, মুনিশ্রেষ্ঠ জাবালি নাকি একদিন তাঁর শিষ্য আরুণি কে বলেছিলেন,

অসি নদী ইড়া।

বরুণা নদী পিঙ্গলা এবং উভয়ের মধ্যস্থিত অবিমুক্ত ক্ষেত্রটি সুষুম্না নাড়ি রূপে চিহ্নিত।

এই নাড়িত্রয়ের সমাহার হল বারাণসী....        

তাই বুঝি যুগ যুগ ধরে মানুষের বিশ্বাসনির্ভরতা এই পুরাণের আশ্রয়ে। ভক্তি সহকারে মুক্তিকামী মানুষ বৃদ্ধবয়সে কাশীবাসী হতেন একসময় । এখানে কেউ উপোসী থাকে না। মা অন্নপূর্ণার ভাঁড়ারে ঠিক তার কিছু একটা গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় হয়েই যায়। এমনই মাহাত্ম্য এই কাশীধামের।  

তথ্যসূত্র

দুর্গা রূপে রূপান্তরে ( মিত্র ও ঘোষ) / পূর্বা সেনগুপ্ত

অন্নদামঙ্গল - ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

Archive

Most Popular