19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বার্ষিক সাধারন সভা

সাহিত্য

অর্জুন সরকার


কি ব্যাপার সকাল সকাল কোথায় চললে, গিন্নির মুখে এরকম মুখ ঝামটা খেয়ে প্রবীর বাবু কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন তার পর নিজেকে কোনও মতে সামলে নিয়ে একটু নিচু স্বরে বললেন অফিসে যাচ্ছি।

- অফিস যাচ্ছি মানে! 

  - অফিসে কাজ আছে।

- আজকে ছুটির দিন কিসের কাজ! 

- না আজকেও যেতে হবে অফিসে।  

- ছুটির দিন কি অফিসে যেতে হচ্ছে  নাকি  সেতো দেখতাম মার্চ মাসে হয় ইয়ার এন্ডিং এ , সে তো পেরিয়ে গেছে।  এখন আবার কিসের কাজ! 

- তুমি জানো না আমাদের 24 ঘন্টা ডিউটি যেকোনো সময় ডাকতে হতে পারে. 

না ! স্ত্রীর চোখে সন্দেহের চাহুনি ;

- সত্যি করে বলতো! কোথায় যাচ্ছ? অফিসের নাম করে অন্য কোথাও নাতো!

প্রবীর বাবু বুঝলেন এবারে যদি সত্যি কথাটা না বলে তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে  অন্যরকম কিছু ভেবে বসতে পারে। 

- অফিসেই যাচ্ছি; তবে ঠিক  অফিসের কাজে নই।আজ সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভা  তাই। 

কথাটা শুনেই গিন্নীর মুখ দিয়ে  অজস্র‍ বাক্যবাণ নির্গত হয়ে তীরের গতিতে  তার দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। 

- ও বুঝেছি  ইউনিয়নের মিটিং আছে।তা  ইউনিয়নের মিটিং তুমি ওখানে গিয়ে কি করবে? তুমি কি কোন নেতা? এক কাজ করো সংসার ধর্ম ছেড়ে  নেতার দলে নাম  লেখাও গিয়ে।  সপ্তাহে তো একটা দিন ছুটি পাও, তাতেও আবার ইউনিওন,।  কাজের দিনেই তো এই মিটিং মিছিল গুলো করতে পারে।

বোঝ ঠ্যালা কে বোঝাবে কাকে?

আবার গিন্নি বলে উঠল  অফিস তো যাবে বলছ তা  মামণির নাচের ক্লাসে নিয়ে  যাওয়া, ছেলের  আঁকার ক্লাসে নিয়ে যাওয়া আর বিকেলে ছেলে কে অংক নিয়ে বসা এগুলো কে করবে শুনি।

কঁকিয়ে ওঠে প্রবীর বাবু প্লিজ আজকের দিনটা ম্যানেজ করে নাও ।

- না আমি পারবো না অসম্ভব।  আমার একার পক্ষে সংসারের দায়-দায়িত্ব সামলে এগুলো করা সম্ভব নয়।

প্রবীর বাবু বুঝলেন এইভাবে নরম গলায় কাজ হবেনা।  সুর একটু চড়াতে হবে।

 তাই বলে কি বছরে এই একটা দিন অফিসের সংগঠনের কাজে আসব না? চাকরি করতে গেলে এগুলোর প্রয়োজন।ওসব তুমি বুঝবে না। 

- না আমি বুঝব না তুমিই সব বোঝ, তা এক কাজ করো রাজনৈতিক দলে ফিরে যাও সংসারে মন দিতে হবে না। 

 বুঝল তর্ক করা বৃথা, ওদিকে অফিসে দেরী হয়ে যাচ্ছে।কথা না বাড়িয়ে হাঁটা লাগালো। মনে মনে ভাবছে  আজকে আমাকে যেতেই হবে । চার বছর পর কোভিডের অতিমারীর  পরিস্থিতি কাটিয়ে আজ বার্ষিক সাধারন সম্মেলন হচ্ছে।মিস করার চান্সই নেই।  কত পুরনো বন্ধুবান্ধব আসবে, অফিসের কলিগ পরিচিত- অর্দ্ধ পরিচিত -অপরিচিত সহকর্মীদের সাথে দেখা হবে।,দুপুরে জম্পেশ খাওয়া হবে, জমিয়ে আড্ডা  হবে এগুলো কি ছাড়া যায়! 

প্রায়  সাড়ে বারোটা নাগাদ  অফিসে পৌছে দেখলো অফিসের যে সভাগৃহে  অনুষ্ঠান হবে তার পাশে থাকা  লম্বা  কড়িডোরে থিক-থিকে ভিড়।প্রায় সকলের হাতেই চায়ের  কাপ। করিডোরের একদিকে টেবিল পেতে সুবসনা এক যুবতী  বার্ষিক চাঁদা নিতে ব্যস্ত। তার পাশের যুবক টি টেবিলে রাখা একটা রেজিস্টারে একাগ্রভাবে  সদস্যদের  নাম লেখাতেই ব্যস্ত। সদস্য রা লাইন দিয়ে সেই খাতায় হস্তাক্ষর করছে।এটাই হচ্ছে সেদিনের সভায় উপস্থিতির আটেন্ড্যান্স রেজিস্টার এককথায় প্রবেশ পত্র। আর করিডোর এর একটু দূরে  অস্থায়ী চায়ের স্টল। ভীড়টা ওখানেই মনে হয় বেশি।প্রবীর বাবু একটু দেরি করে ঢুকেছে মুখে একটু লজ্জার  ভাব।  সভার প্রাথমিক অনুষ্ঠান হয়ে গেছে।এখন মঞ্চে সদস্যদের  বক্তব্যের পালা চলছে। একজনের  বক্তব্য শেষ হচ্ছে  তো অন্য সদস্যের বক্তব্য শুরু, তারই মাঝে থেকে থেকেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বারবার বলছে আপনারা সবাই ভেতরে এসে নিজেদের আসন গ্রহণ করুন। বাইরে ভিড় জমাবে না। কে শুনে কার কথা। প্রবীরবাবু লক্ষ্য করেছেন সভাগৃহের  ভেতরে যতটা না ভিড়  তার থেকে ঢের বেশী ভিড় বাইরের করিডোরে। সবার মনে বেশ একটা খুশি খুশি ভাব গল্প, আড্ডাই নিজেদের মধ্যে মশগুল।

প্রবীরবাবু কোনোমতে সভাপতি  ও সম্পাদক কে দূর থেকে মুখটা দেখিয়ে হাত নাড়িয়ে হাসি মুখে  নিজের উপস্থিতির জানান দিল। তারাও মঞ্চে বসে  প্রবীর বাবুর দিকে তাঁকিয়ে স্মিত হেসে  উত্তর ফেরত দিলো। যাক নিশ্চিন্ত উপস্থিতি গ্রান্টেড।

সে জানে শুধু অ্যাটেনডেন্ট রেজিস্টার ভরাট করা যথেষ্ট নয় , সে যে এসেছে তার চাক্ষুশ  প্রমান রাখা চাই। আস্তে আস্তে  সভাগৃহ ছেড়ে করিডোরের দিকে  এগিয়ে চলল এখন প্রবীর বাবুর অনেক কাজ বাকি।প্রথমে জম্পেশ করে চা খেতে হবে। তারপর ভালো করে  খুঁজে দেখতে হবে চেনা পরিচিত কেও এলো কিনা তারপরই তো জমবে আসল মজা, জমিয়ে আড্ডা।যত বার খুশি চা খাও একদম ফ্রি, তবে লাঞ্চ আসবে দুপুরে। 

টি স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে সবে চায়ের কাপ হাতে নেবে পিঠে আলতো  টোকা।  কেমন আছিস বল। 

ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকিয়ে সোল্লাশে চিৎকার করে উঠল আরে সুবীর। কবে এলি!

- এই আজকেই সকালে ট্রেন থেকে নামলাম।তারপর হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে  সোজা  এখানে এসে হাজির।আমার কথা বাদ দে তোর বাড়ি তো কোলকাতাতেই, এত দেরী তে আসলি কেন? 

- আমি  সেই সকাল দশটা থেকে এখানে এসে উপস্থিত। হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই হাঁটা লাগালাম, আমি যখন এখানে  আসি তখন  কেও ছিলনা, তারপর  সবাই একে একে এসে  হাজির  হলো। 

প্রবীরবাবু উদাসীন হয়ে বললেন, আর বলিস না, বাড়ি থেকে গিন্নি কোন মতে  আসতে দিচ্ছিল না। কোনরকমে ম্যানেজ করে এলাম।

- বলিসনি, আস্যোসিয়েশনের মিটিং আছে।

- হ্যা বললাম তো, সেটা বলেই তো কাল হলো;হাজার কৈফিয়ত। 

- ছাড় বাদ দে, তোর  খবর বল, কেমন আছিস? মেয়ে তো এবার মাধ্যমিক দিলো।কি ভাবছিস ডাক্তারি  না ইঞ্জিনিয়ারিং, কতদিন পর দেখা তোর সাথে, প্রায় বছর পাঁচেক তো হবেই,।দেখে কি যে ভালো লাগছেনা কি বলব। রায়গঞ্জএর খবর কি বল। একসাথে এত গুলো কথা বলে থামল প্রবীর বাবু।কথা যেন ফুরাচ্ছেই না। আনন্দ আর উৎসাহ একসাথে কথা হয়ে যেন ঝড়ে পড়ছে, এ এক অদ্ভুদ প্রসন্নতা।

ওদের পাশে আরো দুজন হাসতে হাসতে এসে হাজির হলো। পুরুলিয়া থেকে  অনির্বান  আর  বাঁকুড়া থেকে গৌতম। ওরা সব একই ব্যাচের। কি যে ভালো  লাগছে তোদের দেখে  বার্ষিক সাধারন সম্মেলন  তো  নয় যেন  মিলন মেলা। সুবীর বাবু বললেন - তোকে আর কি বলব আমারো একই অবস্থা। 

-কেন?

-আর বলিস না আমাকেও কোনমতেই আসতে দিচ্ছিল না। 

মিটিং এর কথা বলাতেই গিন্নি বলছে  তুমি আছো রায়গঞ্জে আর তুমি এখন যাবে কলকাতায় তাও এই সিজিন টাইমে।  ট্রেনের টিকিটই তো  নেই।আমার বন্ধুরা  কোলকাতা থেকে উত্তর বঙ্গে আসতে চাইছিল, ট্রেনের টিকিট পাইনি বলে ট্রিপ ক্যান্সেল করতে হলো।আর তুমি যাবে কিনা  কোলকাতাই। 

প্রবীরবাবু সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল, তুই কি বললি? 

হেসে উত্তর দিলো সুবীরবাবু, আমি আর কি বলব, ম্যানেজ করে নিলাম, বললাম - বোঝার চেষ্টা করো, এটা হচ্ছে সিজিন টাইম উত্তরের জন্য কিন্তু উত্তরবঙ্গের লোকেদের সাউথের জন্য অফ সিজিন।  এই সময় গরমে  শনিবারেরদিন উইকেন্ড।  উত্তর বঙ্গের দিকে যাবার ভীড় থাকে, কিন্তু দক্ষিণের  গাড়ি খালি থাকবে। 

গিন্নি কিন্তু সে যুক্তি   মেনে নিলেও বলল  তা না হয় হলো  আর  যাবার টিকিট  না হয় পেলে কিন্তু  রবিবার রাতে  যেদিন তুমি উত্তর দিকে  ফিরবে তখন।  সেদিন? 

উত্তর ও বাতলে দিলাম, বললাম রবিবার উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতার ট্রেনে ভীড় থাকবে বেশী, সোমবার যে অফিস।সোমবারে অফিস না করতে পারলে  কতগুলো সিএল এর  ধাক্কা বলো তো। তাই নর্থ থেকে সাউথের ট্রেনে ভিড় হবে সাউথ থেকে নর্থের নয় । 

প্রবীর বাবু হো হো করে হেসে উঠে বলল, অকাট্য যুক্তি। ভাবতে অবাক লাগছে শুধু সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনে হাজির হবি বলে উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রেনে  চেপে হাজির হলি। আর আমি ঘরের সামনে থেকেও ভাবছিলাম যে আসব  কি আসব না । 

সুবীরবাবু বলল, বলছিস  কিরে এটা বার্ষিক সম্মেলন শুধু তো  নয়, এটা আমাদের  বন্ধুত্বের মেলা । ওরা ওদের মত সংগঠন করুক  সে  নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই।কিন্তু এই অনুষ্ঠানের কল্যানে  একটা দিন অন্তত আসতে পারি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, এটা কি কম! দেখবি  এই ভাবেই  আমাদের চাকরি জীবনটা আনন্দে কেটে যাবে ।

প্রবীর বাবু  সহমত  দিয়ে বলে উঠলেন, ঠিক বলেছি, সংসারের বাইরে বেরিয়ে পাখির ডানায় মুক্ত আকাশে রঙিন স্বপ্ন গুলো খুঁজে নেওয়া। 

গমগম করছে সভাগৃহ। নেতারা তাদের জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছে।  কোথায়  কি আন্দোলন করতে হবে, কোথায় কি প্রতিবাদে বেরোতে হবে,কোথায় সাংগাঠনিক দোষ-ত্রুটি, সেখান  থেকে শুরু করে সমাজের অবমুল্যায়ন, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব সমস্ত কিছু যেন  আগুন হয়ে ঝরে পড়ছে। 

করিডোরে অনেকক্ষন আড্ডার পর এবার দুই বন্ধু মিলে সভাগৃহে ঢুকল। বেশ কিছুক্ষন বক্তৃতা শুনে প্রবীর বাবু বললেন, চল আর এক বার চা হয়ে যাক।  

দুই বন্ধু মিলে সভাগৃহের  বাইরে গিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে  সিগারেটে সুখ টান দিতে ব্যস্ত।সত্যিই আজকের দিনটা বড় মিস করতাম  যদি না আসতাম। তা 

মেনু কি আছে জানিস ? 

প্রবীরবাবুর প্রশ্নটা শুনে সুবীর বাবু বলল শুনলাম মটন থালি।

- বাঃ খুব ভালো। 

 - এই থালি  নিয়েও নাকি নেতাদের মধ্যে  বিস্তর ঝামেলা হয়েছিল। অনেকে বলেছিল বিরিয়ানি, আবার অনেকে বলেছিল, না বিরিয়ানি চলবে না ভরদুপুরে ওই বিরিয়ানি খেয়ে পেট বোঝায় করতে পারব না। আবার কেও কেও বলেছিল  চিলি চিকেন ফ্রাইড রাইস। কিন্তু সম্পাদক বলল তার থেকে পাত  পেড়ে  খাওয়ানো হোক মটন থালি। অনেকে সেই শুনে বলেছিল পাত পেড়ে খাওয়ানো সেতো এলাহি ব্যাপার, অফিসে  সেগুলো অ্যালাউ করবে না। তারপরে দীর্ঘ তর্কবিতর্কর  পরে  মটন থালিই ঠিক হলো। গরম ভাতের সাথে খাসির মাংসের ঝোল, সাথে ঝুড় ঝুড়ে  আলুভাজা  মিক্সড ভেজ ডাল একটা সবজি, চাটনি পাঁপড়, তবে সবই  থাকবে কম্পাক্ট প্যাক করা। খাও আর ডিস্পোজাল করো। 

কথাগুলো শুনে প্রবীর বাবুর খিদের চোটে পেটের ভেতরটা  যেন আরো বেশী মোচর দিয়ে উঠল।বললেন, তুই কি করে এত কথা জানলি কি করে? 

হেসে সুবীর বাবু  জবাব দিলেন, ওই যে সকাল থেকে এসে ধর্না দিয়ে বসে ছিলাম, আর নেতাদের সাথে খেজুরে গল্প করছিল, তখন শুনলাম । 

কথার মাঝখানেই মঞ্চ থেকে কাঙ্ক্ষিত লাঞ্চ ব্রেকের ঘোষনা।

বন্ধুর সাথে  রসনার তৃপ্তি করতে করতে  দুপুরের আহার সারলেন প্রবীর বাবু।  খাবার শেষে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু।তিনি লক্ষ্য করছেন ঠিক দুপুরের  লাঞ্চ ব্রেকের পর থেকে সভার ভিড় গুলো কেমন যেন  আস্তে আস্তে পাতলা হতে চলেছে।  সকালের দিকে যেরকম একটা গমগম ভাব ছিল , দুপুরের পর  ভিড়ে টা আর নেই। লাঞ্চের আগে তার সামনের সিটে বসা লোকটাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়ত  অনেককেই পাওয়া যাচ্ছে না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, তবুও  সদস্যদের বক্তব্য আর শেষ হয়না। একটার পর একটা বক্তা মঞ্চে উঠছে এবং আগুনের ফুলকি ধরিয়ে দিচ্ছে।  এবারে নাকি নতুন কমিটি আসবে ভোটাভুটি হবে।কানাঘুষোই  শুনেছে বেশ কয়েকটা প্যানেলও নাকি  জমা পড়েছে। 

 প্রবীরবাবু বুঝতে পারছে না, যদি ভোটাভুটি  হয় সে কোন প্যানেলে হাত তুলবে।  ডান দিকে তাকালে ; সেও আপন আবার  বাম দিকে তাকলে সেও আপন।সে কোন দিকে যাবে। সামনের আসনে  বসে রয়েছেন  দপ্তরের বেশকিছু বড়কর্তা তাদের নামও  নাকি প্যানেলে আছে। 

প্রবীর বাবু বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল  তুই কোন প্যানেল কে ভোট দিবি? 

সুবীরবাবু  প্রশ্ন শুনে অস্ফুট স্বরে বলল -পাগল নাকি ভোট দেব। আমার পক্ষে ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।সবাই আপন  কাকে ছেড়ে কাকে দেব।আর সবার সামনে কারোর পক্ষ নিয়ে হাতও  তুলতে পারব না।তার চেয়ে বরং বাকি বুদ্ধিমান প্রানীদের মত চল, কেটে পরি।

আর সংগঠনের ভবিষ্যত?

সে  ভাগ্য  ওদের উপরই ছেড়ে  দে। 

অস্ফুট স্বরে প্রবীর বাবু বলে ওঠে, ঠিকই বলেছিস। তারপর হালকা করে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল ভিড়ের মধ্যে অনেকে  হালকা হয়ে গেছে। মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাকুল্যে  ত্রিশ জন। সুবীর  হেসে বলল , যারা দাঁড়িয়ে আছে দেখছিস, এরাই আগের বারের নির্বাচিত সদস্য বা বিরোধী পক্ষ। চল বাইরে চল। করিডোর ধরে দুজনে ওয়াশ রুমের দিকে হাঁটা লাগালো। ওয়াশ রুমের সামনেও তাদের মত বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীদের ভীড়।

গোটা দুয়েক সিগেরেটে সুখ টানের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মেরে আধাঘন্টার মত কাটিয়ে বাথরুম থেকে বেরোনোর সময়  কানে এলো ভোটাভুটি কম্পলিট।এখন নাম ঘোষণা হচ্ছে বিজয়ী প্যানেলের মুখপাত্র প্রেসিডেণ্ট  পদে জয়ী। আর বিরোধী দলের মুখ পাত্র ! সে কি হেরে গেলো নাকি ! না, সে প্রেসিডেন্ট পদে হেরেছে বটে  তবে সে হচ্ছে, জয়ী প্যানেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ! ভাইস প্রেসিডেন্ট  কি করে হলো ? সে তো তাঁর  প্রেসিডেন্ট পদে জিততে পারেনি। 

প্রেসিডেন্ট পদে জিততে পারেনি তো ভাইস প্রেসিডেন্টে বাধা কোথায়? 

প্রোডিয়ামের বরিষ্ঠ নির্বাচক মন্ডলীর এই  সিদ্ধান্ত । সবাই কে নিয়ে সংগঠন চালাতে হবে তবে হবে উন্নয়ন। কিছুক্ষণ পরপর ঘোষনা হচ্ছে  বিরোধী প্যানেলের পরাজিত সভাপতি পদ প্রাথীকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট মনোনীত  করা হয়েছে। মনে মনে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো প্রবীর, যাক বাবা বাঁচা গেছে। 

মিটিং শেষ এবার ফেরার পালা।  মঞ্চের সামনে থেকে হাসি  মুখে ছুটে আসছে সদ্য  নির্বাচিত  সাধারণ সম্পাদক। সামনে এসে এক গাল হেসে সুবীর বাবুকে কে বলল, তুমি তো আজ রাতে  ফিরে যাবে? 

- হ্যাঁ দাদা রাতের টিকিট কাটা আছে।   

- কয়েকটা  প্যাকেট  বেঁচে গেছে তুমি বরং একটা  নিয়ে যাও, রাতে তোমাকে আর খাবার কিনতে হবে না, ট্রেনে খাবে। এই বলে একজনকে ইশারা করে বলল ৭০৫ থেকে গোটা চারেক প্যাকেট নিয়ে আয়।

প্রবীর  বাবু জানেন ৭০৫ নং, ওটা অফিসার রুম, করিডোর ধরে ওয়াস রুমের দিকে যেতে ডান দিকে পরে সিড়ির  পরে তিনটে ঘর বাদে।  

ওটায় সংগঠনের আজকের মত টেম্পোরারি অফিস  তথা ওয়ার রুম আন্ড  স্টোর রুম। প্যাকেট গুলো এসে পৌছালে একটা সুবীরের হাতে ধরিয়ে  তিনটে প্রবীর বাবুর হাতে ধরিয়ে দিলো  ।প্যাকেট গুলো হাতে নিয়ে স্বলজ্জে বলে উঠলেন প্রবীর বাবু  আমার লাগবে না।আপনি বরং অন্য দের দিন। 

গম্ভীর স্বরে সদ্য নির্বাচিত সম্পাদক মহাশয় বললেন, বাড়িতে ফ্যামিলি আছে নিয়ে যাও।

প্রবীরবাবু  হিসাব করে দেখলেন , একদম পাক্কা হিসেব তিনজনের জন্য ঠিক গুনেগুনে তিনটে প্যাকেট। একটা কমও  নয়, একটা বেশী ও নয়।

সুবীরবাবু বলল, দেখলি একেই বলে নেতা, কিছু বলতেও হলোনা। আমি  ট্রেনে একা মানুষ অন্তত রাত্রে একা।  তাই একটা। আর তুই রাত্রে বাড়ি ফিরবি  সারা পরিবারে  আছে মোটে আরো দুইজন, গিন্নী আর মেয়ে, মোট তিন। আসলে ওরা জানে, আমরা এইযে চুপ থাকি, এটাই ওদের নেতা হওয়ার কৌশল। আমরাই সংগঠনের আসল সম্পদ । আর  এখানেই সাধারণ সদস্যদের জয়।প্রবীর বাবুও তারস্বরে বলে উঠলেন সাধু, সাধু, জয় সাধারণ সভার জয় ৷।

Archive

Most Popular