19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সোলো ট্রাভেল ও মহিলারা: স্বাধীনতার পথে এক সাহসিক যাত্রা!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


একটা সময় ছিল, যখন একা ঘুরতে যাওয়া মানেই ছিল ছেলেদের ব্যাপার। মেয়েরা ঘুরবে পরিবারের সঙ্গে, স্বামীর সঙ্গে, বা বন্ধুর দলে। কিন্তু সময় বদলেছে, ভাবনাও। আজকের নারী আর শুধু ঘর সামলানো বা ছুটি কাটানোর জন্য নয় সে নিজের মতো করে পৃথিবীকে চিনতে চায়। আর সেই পথেই এসেছে সোলো ট্রাভেল একাই যাত্রা, একাই আবিষ্কার। সোলো ট্রাভেল মানে শুধু ঘোরাঘুরি নয়, এটা একরকম আত্ম-আবিষ্কারের সফর। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া, নতুন জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, অচেনা পথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাঁটতে শেখা এসবই একা ঘোরার অঙ্গ। একজন মহিলা যখন একা ভ্রমণে বের হন, তখন তাঁর সঙ্গে যায় শুধু স্যুটকেস নয় যায় সাহস, কৌতূহল আর নিজের প্রতি ভরসা।

আমাদের সমাজে আজও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে মেয়েটা একা কোথায় যাচ্ছে? বা সারাদিন কী দরকার একা ঘোরা? এই প্রশ্নগুলো শুধুই কৌতূহল নয়, অনেক সময় অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনাস্থার প্রকাশ। কিন্তু যারা একা ঘুরতে বেরিয়েছেন, তাঁরা জানেন এই চোখরাঙানি পার করেই নিজস্ব জায়গা তৈরি করতে হয়। আজ এমন অনেক নারী আছেন, যাঁরা শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্ব একা ঘুরেছেন। নন্দিতা, একা সাইকেল নিয়ে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ভ্রমণ করেছেন। অবন্তিকা তিওয়ারি শুধু ভারত নয়, আফ্রিকার মধ্যেও একা ঘুরে বেড়িয়েছেন স্থানীয় সংস্কৃতি জানার উদ্দেশ্যে। বাঙালি ইউটিউবার সৃজিতা মণ্ডল একা লাদাখ, স্পীতি, কাশ্মীর ঘুরে ফিরেছেন, ক্যামেরায় তুলে এনেছেন সাহস আর অভিজ্ঞতার ছবি। এসব গল্প শুধু অনুপ্রেরণা নয় এগুলি এক একটা চ্যালেঞ্জ জয় করার দলিল।

নারীদের একা ভ্রমণ নিরাপদ ও উপভোগ্য করতে হলে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

1. গন্তব্য ভালোভাবে নির্বাচন করুন: প্রথমবারের জন্য নিরাপদ, পর্যটক-বান্ধব জায়গা বেছে নিন। যেমন: সিকিম, কোর্গ, পুদুচেরি, জয়সলমির, কসৌলি বা দক্ষিণ ভারতের হ্যাম্পি।

2. থাকার জায়গা আগেই বুক করুন: ভালো রেটিং আছে এমন হোটেল বা হোস্টেল বেছে নিন।

3. পরিবার বা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখুন: কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় থাকছেন তা জানান। লোকেশন শেয়ার করা যায় এমন অ্যাপ ব্যবহার করুন।

4. নিজের ইন্টুইশনকে গুরুত্ব দিন: কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি অস্বস্তিকর মনে হলে সরে যান। না বলতে শিখুন।

5. কম ব্যাগ, বেশি বুদ্ধি: হালকা ব্যাগ নিন, যেখানে প্রয়োজনীয় ও জরুরি জিনিস থাকবে: ওষুধ, আইডি কার্ড, কিছু নগদ টাকা, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, স্যানিটারি প্রোডাক্ট ইত্যাদি।

একজন একা মহিলা ভ্রমণকারী যখন পাহাড়ের কোলে বসে সূর্যাস্ত দেখে, তখন তার চোখে শুধু প্রকৃতির রূপ নয়, নিজের জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পান। হয়তো ট্রেনে, হোস্টেলে, বাজারে কোনো অচেনা মানুষের সঙ্গে কথোপকথনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নেয়। হয়তো একটা চা দোকানে বসে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন নিজেই। অস্বীকার করা যাবে না একাই ভ্রমণের পথে বিপদের সম্ভাবনা থাকে। কটূ মন্তব্য, নিরাপত্তার অভাব, সামাজিক চোখরাঙানি। তবে এইসব ভয়ের মাঝেও অনেক নারীই বলেন ভয় পেয়েছি, কিন্তু পালাইনি। কারণ প্রতিটা বিপদ তাদের আরও সচেতন, আরও শক্ত করে তোলে। আজকের প্রযুক্তির দুনিয়ায় সোলো ট্রাভেল অনেক সহজ হয়েছে। গুগল ম্যাপস, ট্রিপ অ্যাডভাইসর, বুকিং.কম, এয়ারবিএনবি সবই হাতের মুঠোয়।

মেয়েদের জন্য বিশেষ ফোরাম আছে সোলো উইমেন ট্র্যাভেলারস, গার্লস হু ট্র্যাভেল, যেখানে একে অন্যকে সাহায্য করেন, তথ্য দেন, সাহস জোগান। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের ভ্রমণ কাহিনি অনেকেই ভাগ করে নিচ্ছেন যা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করছে। সবচেয়ে বড় কথা, একা ঘোরার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, তা কোনও পাঠ্যপুস্তক শেখাতে পারে না। প্রথমবার ট্যাক্সি নিজে বুক করা, ট্রেনে নিজের ব্যাগ নিজে দেখা, হোটেলে নিজে দরাদরি করে থাকা এই অভিজ্ঞতাগুলি একজন মহিলাকে শুধু শক্তিশালীই করে না, স্বাধীনতাও দেয়। সোলো ট্রাভেল করা একজন মহিলার পক্ষে শুধুমাত্র সাহসিকতার কাজ নয় এটি এক সামাজিক বার্তা। যে সমাজ মেয়েদের ঘরেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তার কাছে এই ভ্রমণ এক নীরব প্রতিবাদ। আর সেই প্রতিবাদে আছে আনন্দ, সাহস, আর নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়ে তোলার তৃপ্তি। সোলো ট্রাভেল মানে কোনও একা হয়ে পড়া নয় বরং নিজের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা। তাই আগামী দিনে আরও বেশি নারী যাত্রাপথে একা পা বাড়াবেন, এই আশাতেই থাকি।


Archive

Most Popular