19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজকীয় রূপ দেখতে মনের মতো গন্তব্য!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


হিমালয়ের কোলে পাহাড়ি ঝরনার সুর আর শীতল বাতাসের ছোঁয়ায় ভেসে বেড়ানো এক ছোট্ট গ্রাম চটকপুর। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত এই জায়গাটি এখন ধীরে ধীরে প্রকৃতি প্রেমীদের প্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, নির্জনতা ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে বসে থাকা চটকপুর যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার মহিমাকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ দেয়। যারা পাহাড় ভালোবাসেন, প্রকৃতি ভালোবাসেন, আর ভিড়ভাট্টার বাইরে গিয়ে নিরিবিলিতে ভ্রমণ করতে চান, তাদের কাছে চটকপুর একেবারে আদর্শ গন্তব্য। চটকপুর অবস্থিত দার্জিলিং জেলার ঘুম শহরের কাছাকাছি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,৮০০ ফুট উচ্চতায়। এটি সিনচল wildlife sanctuary–র অন্তর্গত একটি ছোট্ট গ্রাম, যা পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চটকপুর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বেই রয়েছে দার্জিলিং শহর। তাই অনেকেই দার্জিলিং সফরের সঙ্গেই চটকপুর ঘুরে আসেন।

চটকপুরে পৌঁছেই যেটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করবে, তা হলো কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য। ভোরবেলা সূর্যের প্রথম কিরণ যখন বরফে ঢাকা শৃঙ্গকে লালচে সোনালি রঙে রাঙিয়ে তোলে, তখন চোখ ফেরানো অসম্ভব। দার্জিলিং বা তেনজিং রক থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, কিন্তু চটকপুরের নির্জন পাহাড়ি প্রান্তরে দাঁড়িয়ে যেভাবে পাহাড়কে কাছে টেনে পাওয়া যায়, তা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এখানকার আকাশও অনেক স্বচ্ছ, তাই বরফে মোড়া শৃঙ্গের রেখাচিত্র স্পষ্ট দেখা যায়। চটকপুর প্রকৃতির আঁচলে মোড়া। চারদিকে ঘন অরণ্য, যেখানে অর্কিড, রডোডেনড্রন, নানা বুনো ফুল আর অজস্র প্রজাতির পাখি। সিনচল অভয়ারণ্যের অংশ হওয়ায় এখানে পাখি পর্যবেক্ষণের সুযোগও প্রচুর। বিশেষ করে কালিজ ফেজান্ট, হিমালয়ি মনাল, নানা প্রজাতির কাঠবিড়ালি আর প্রজাপতি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বাড়তি আনন্দ এনে দেয়। শীতকালে কনকনে ঠান্ডা হলেও গ্রীষ্মে এখানকার আবহাওয়া বেশ মনোরম, যা পরিবার বা দম্পতিদের জন্য নিখুঁত ছুটির আবহ তৈরি করে।

চটকপুর শুধু নির্জনতার জায়গা নয়, ট্রেকিং প্রেমীদের জন্যও এক আদর্শ স্থান। এখান থেকে শুরু হয় সিনচল পাহাড়ি অরণ্যের বিভিন্ন ট্রেকিং রুট। স্থানীয় গাইডের সহায়তায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি পৌঁছে যাবেন ভিউ পয়েন্টে, সেখান থেকে আবার নতুন রূপে ধরা দেবে কাঞ্চনজঙ্ঘা। যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন না, তারাও সহজেই ছোটখাটো পথ ধরে গ্রাম ও অরণ্য ঘুরে বেড়াতে পারবেন।

চটকপুরে কোনো বড় হোটেল নেই। এখানে থাকার ব্যবস্থা মূলত হোমস্টে। স্থানীয় পরিবাররাই অতিথিদের আতিথেয়তায় মেতে ওঠেন। কাঠের তৈরি ঘর, জানলার বাইরে সবুজ পাহাড়, আর দোতলার বারান্দায় বসে গরম চায়ের কাপে চুমুক এগুলোই চটকপুরের আসল অভিজ্ঞতা। হোমস্টেতে থেকে আপনি স্থানীয় নেপালি, লেপচা ও ভুটিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন। সন্ধ্যায় হোমস্টে পরিবারের সঙ্গে পাহাড়ি খাবার খাওয়ার আনন্দ শহুরে জীবনে কল্পনা করা কঠিন। দিনে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পর রাতের চটকপুর আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য জগতে। শহরের মতো আলো দূষণ এখানে নেই। তাই আকাশ ভরে ওঠে তারার মেলায়। যারা অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি করেন বা কেবল আকাশ দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য চটকপুর সত্যিই স্বর্গরাজ্য।

চটকপুর ভ্রমণের সঙ্গে আশেপাশের কয়েকটি জায়গাও ঘুরে দেখা যায়

  • দার্জিলিং শহর – বিখ্যাত চা বাগান, মল রোড, পিস প্যাগোডা।

  • ঘুম মঠ – দার্জিলিংয়ের অন্যতম প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ।

  • তিনচুলে – আরেকটি শান্ত ও অপরূপ গ্রাম।

  • সিনচল ভিউ পয়েন্ট – এখান থেকেও হিমালয়ের বিশাল দৃশ্য চোখে পড়ে।

চটকপুর যেতে হলে প্রথমে পৌঁছতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) রেলস্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দরে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে প্রায় ৩–৪ ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় চটকপুরে। রাস্তা খানিকটা আঁকাবাঁকা ও উঁচুনিচু হলেও পাহাড়ি দৃশ্য সেই কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। চটকপুর সারা বছরই সুন্দর। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আদর্শ সময়, কারণ এই সময়ে আকাশ বেশি পরিষ্কার থাকে। গ্রীষ্মে এখানে আরামদায়ক আবহাওয়া পাওয়া যায়, যা গরমের ছুটি কাটানোর জন্য আদর্শ। বর্ষাকালে অরণ্য ভরে ওঠে সবুজে, কিন্তু তখন রাস্তার অবস্থা একটু খারাপ হয়ে যায়।

  • ভিড়ভাট্টাহীন শান্ত পরিবেশ

  • কাঞ্চনজঙ্ঘার নিকট দৃশ্য

  • স্থানীয় সংস্কৃতি ও হোমস্টে অভিজ্ঞতা

  • অরণ্য, ঝরনা ও পাখিরাজির ভাণ্ডার

  • ট্রেকিং ও প্রকৃতির সান্নিধ্য

যারা শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুদিনের জন্য পালাতে চান, তাদের জন্য চটকপুর হলো এক আশ্রয়স্থল।

চটকপুর এক নিঃশব্দ কবিতা, যা পাহাড়, মেঘ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার রঙে লেখা। ছোট্ট এই গ্রামে কোনো বিলাসিতা নেই, নেই আধুনিক হোটেলের চাকচিক্য। আছে শুধু প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য, মানুষের সরলতা আর শান্তির আবহ। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজকীয় রূপ দেখতে চাইলে ভিড়ভাট্টার বাইরে গিয়ে একবার চটকপুর ঘুরে আসতেই পারেন। সেই অভিজ্ঞতা আপনার মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

Archive

Most Popular