19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

চালচিত্রে আঁকা লুকানো পুরাণ...

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার দুর্গাপূজা আজ বিশ্বমঞ্চে এক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে স্বীকৃত। এই পূজার মূল আকর্ষণ নিঃসন্দেহে প্রতিমা, তবে প্রতিমার সঙ্গে যুক্ত আরও এক অনন্য শিল্পরূপ হলো চালচিত্র। মাটির প্রতিমার মাথার পেছনে অর্ধবৃত্তাকার বা শিরোভূষণের মতো যে কাঠামো দেখা যায়, তাকে বলা হয় চালচিত্র। প্রাচীনকাল থেকেই চালচিত্রে কেবল অলংকরণ নয়, বরং পুরাণের বিভিন্ন কাহিনী, আখ্যান এবং প্রতীকচিত্র আঁকা হয়েছে। এগুলি এমন এক ভিজ্যুয়াল টেক্সট, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌরাণিক কাহিনী ও সংস্কৃতির বহন ঘটিয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা চালচিত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এর শিল্পধারা, এর মধ্যে লুকানো পুরাণকাহিনীর প্রতিফলন এবং সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।


চালচিত্র শব্দটি এসেছে চালা অর্থাৎ ছাউনি বা মাথার উপর আবরণ, এবং চিত্র অর্থাৎ ছবি থেকে। বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে প্রায় ৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে চালচিত্র আঁকার প্রথা প্রচলিত। মূলত কুমোর এবং পটুয়া সম্প্রদায়ের শিল্পীরা মাটির প্রতিমার সঙ্গে চালচিত্র তৈরি করতেন। এটি প্রায়শই পাটকাঠি বা বাঁশ দিয়ে তৈরি কাঠামোর ওপর কাপড়, খাগের পাতা বা পাটের কাপড় লাগিয়ে তার উপর রঙিন ছবি আঁকা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, চালচিত্রের শিকড় রয়েছে বাংলার পটচিত্র শিল্পে। পটুয়ারা যেমন পট আঁকতেন এবং গান গেয়ে সেই পটের কাহিনী বর্ণনা করতেন, তেমনি চালচিত্রে আঁকা হতো পুরাণের কাহিনী, যা পূজা দেখতে আসা সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত ও বিনোদিত করত। বিশেষত গ্রামীণ মানুষ, যাদের হাতে লিখিত পুরাণগ্রন্থ পৌঁছত না, তারা চালচিত্র দেখে পৌরাণিক জ্ঞান অর্জন করতেন।

চালচিত্র সাধারণত প্রতিমার মাথার ওপরে অর্ধবৃত্তাকার বা শিরস্ত্রাণের মতো করে বসানো হয়। এটি মাটির প্রতিমার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে যায় এবং একটি পবিত্র আভা প্রদান করে। চালচিত্রের চিত্রভাষা মূলত লোকশিল্পধর্মী উজ্জ্বল লাল, হলুদ, সবুজ, নীল রঙের প্রয়োগ, সরলরেখার ব্যবহার এবং গল্প বলার ভঙ্গি। শিল্পীরা সাধারণত প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করতেন গাছের পাতা, ফুল, মাটি বা পাথর থেকে প্রাপ্ত রঙ। কাগজ বা কাপড়ে আঁকা ছবি পরে কাঠামোর সঙ্গে আটকানো হতো। আধুনিক কালে অবশ্য রঙ এবং উপকরণে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু শিল্পধারা মূলত ঐতিহ্যগত।


চালচিত্রে পুরাণকাহিনীর প্রতিফলন

চালচিত্রকে বলা যায় এক প্রকার লোকায়ত পুরাণ-এনসাইক্লোপিডিয়া। এর মধ্যে পুরাণের নানা কাহিনী চিত্ররূপে উপস্থাপিত হয়।

১. দেবী দুর্গার কাহিনী :
চালচিত্রে প্রধানত দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের কাহিনী উঠে আসে। দেবীর দশভুজ রূপ, সিংহবাহন, মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ সবকিছুই কেন্দ্রীয়ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। অনেক চালচিত্রে দেবীর জন্মকাহিনী, দেবতাদের শক্তি প্রদান ইত্যাদিও দেখানো হয়।

২. দেবতা ও দেবীর আখ্যান :
চালচিত্রে বিষ্ণুর দশাবতার, শিবের তাণ্ডব, গণেশের জন্মকাহিনী, কার্তিকের দানববধ, লক্ষ্মীর কুবের পূজা ইত্যাদি নানা পৌরাণিক আখ্যান চিত্রায়িত হয়। এভাবে দুর্গাপূজার মণ্ডপ এক প্রকার পূর্ণাঙ্গ পুরাণমঞ্চে রূপান্তরিত হয়।

৩. রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্য :
চালচিত্রে রাম-রাবণের যুদ্ধ, সীতা হরণ, হনুমানের লঙ্কাদাহ, ভীষ্মের শয্যা, অভিমন্যুর বীরগতি ইত্যাদি ঘটনাও স্থান পেয়েছে। এগুলি গ্রামীণ মানুষের কাছে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক আদর্শও পৌঁছে দিয়েছে।

৪. লোকবিশ্বাস ও আঞ্চলিক পুরাণ :
অনেক চালচিত্রে স্থানীয় লোকদেবতা, ব্রতকথা কিংবা আঞ্চলিক মিথও আঁকা হতো। যেমন মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল বা কৃষ্ণকীর্তন থেকে দৃশ্য। এর ফলে চালচিত্র শুধুই পৌরাণিক কাহিনী নয়, বরং আঞ্চলিক সংস্কৃতির দলিল হয়ে উঠেছে।


চালচিত্রে লুকানো পুরাণ

চালচিত্রে আঁকা কাহিনীগুলি কেবল ভক্তির প্রতীক নয়, বরং বহু গোপন বার্তা বহন করে।

  • নৈতিক শিক্ষা : দেব-অসুর যুদ্ধের মাধ্যমে ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব এবং সত্যের জয় চিত্রিত হয়।

  • সামাজিক বার্তা : কৃষ্ণলীলা, মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের দৃশ্য গ্রামীণ সমাজের আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস এবং দুঃখ-সুখের প্রতিফলন।

  • নারীশক্তির উত্থান : মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবীর উপস্থিতি সমাজে নারীর শক্তির মর্যাদা প্রতিপন্ন করে।

  • ঐক্য ও সমবায় : চালচিত্রে দেবতাদের একত্রিত রূপ বোঝায় যে ঐক্যই শক্তির উৎস।

এইভাবে চালচিত্রকে শুধু প্রতিমার সাজসজ্জা হিসেবে দেখা ভুল হবে; এটি এক প্রকার ভিজ্যুয়াল টেক্সট, যেখানে পুরাণ লুকিয়ে আছে প্রতিটি রেখা ও রঙের মধ্যে।


সমাজ ও সংস্কৃতিতে চালচিত্রের ভূমিকা

চালচিত্র কেবল শিল্প নয়, এটি সমাজবিজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির দলিল।

১. লোকশিক্ষা : নিরক্ষর গ্রামীণ মানুষ চালচিত্র দেখে পুরাণকাহিনী জানতে পারতেন।
২. সাংস্কৃতিক ঐক্য : গ্রামীণ উৎসব ও পূজা চালচিত্রকে কেন্দ্র করে মিলনমেলায় পরিণত হতো।
৩. অর্থনৈতিক দিক : চালচিত্র আঁকতে পটুয়ারা পারিশ্রমিক পেতেন, যা তাদের জীবিকার অংশ।
৪. লোকনন্দন শৈলী : চালচিত্র আজও বাংলার লোকশিল্পের বৈশিষ্ট্য বহন করছে, যা বিশ্ববাজারেও জনপ্রিয়।

আধুনিক সময়ে দুর্গোৎসব মণ্ডপশিল্পে নানা নতুনত্ব এলেও চালচিত্র এখনও টিকে আছে। কলকাতা ও গ্রামীণ মণ্ডপে চালচিত্রের আধুনিক রূপ দেখা যায়। অনেক শিল্পী চালচিত্রকে আলাদা লোকশিল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিদেশি প্রদর্শনীতে চালচিত্র আজ বিশ্বসংস্কৃতির অংশ। তবে দুঃখজনকভাবে, বাণিজ্যিকীকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক থিম-প্যান্ডেলের যুগে চালচিত্র তার পূর্বের গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখন মূলত ঐতিহ্যবাহী পরিবার বা কিছু গ্রামীণ পূজায় চালচিত্রের পূর্ণ রূপ দেখা যায়। তা সত্ত্বেও লোকশিল্প গবেষক এবং শিল্পীরা এটিকে নতুনভাবে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। চালচিত্র বাংলার পূজাশিল্পের এক অমূল্য ধন। এর ভেতরে আঁকা পুরাণকাহিনী কেবল ভক্তির প্রকাশ নয়, বরং নৈতিকতা, সমাজচেতনা এবং লোকসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। চালচিত্রকে বলা যায় এ এক নীরব গ্রন্থ, যার পাতায় পাতায় আঁকা আছে দেব-অসুরের দ্বন্দ্ব, দেবীর মহিমা, মানবিক আদর্শ এবং বাংলার লোকবিশ্বাস। আজকের দিনে যখন প্রযুক্তি ও থিম-শিল্প দুর্গোৎসবকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে, তখন চালচিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা, অতীতের গৌরবের কথা। লুকানো পুরাণের এই ভিজ্যুয়াল ভাষা আমাদের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তাই চালচিত্র কেবল প্রতিমার পেছনের সজ্জা নয়, বরং এটি বাংলার ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত দলিল।

Archive

Most Popular