19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

দুর্গাপুজোর বিশেষ আলপনা ও তার প্রতীকী কি, জানেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগের আরেক নাম। মণ্ডপসজ্জা, ধুনুচি নাচ, আরতিসহ একের পর এক আচার অনুষ্ঠানকে ঘিরে ভক্তদের উচ্ছ্বাস থাকে চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যেই একটি বিশেষ শিল্পের উপস্থিতি নীরব অথচ গভীর তাৎপর্য বহন করে সেটি হলো আলপনা। মাটির উপর সাদা, লাল কিংবা রঙিন গুঁড়ো দিয়ে আঁকা এই নকশা শুধু শোভা বাড়ায় না, বরং বহন করে নানা প্রতীকী বার্তা। দুর্গাপুজোর সময় আঁকা আলপনাগুলি বিশেষভাবে দেবীর শক্তি, শুভশক্তি এবং সামষ্টিক আনন্দের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। আলপনা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত আলিপ্ত শব্দ থেকে, যার অর্থ লেপন। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি গৃহিণীরা বিশেষ দিনে বাড়ির আঙিনায় চালগুঁড়ো বা গুঁড়ো রঙ দিয়ে নকশা এঁকে শুভ শক্তিকে আহ্বান জানাতেন। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে আলপনা আঁকা হতো বীজ বপনের আগে, নতুন ধান কাটার সময়, বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে, এবং অবশ্যই দুর্গাপুজোয়। দুর্গাপুজোর আলপনা অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও প্রতীকধর্মী। দেবীর আগমন, পূজা এবং বিসর্জনের সময় মণ্ডপের মেঝেতে, দেবীর পাদপীঠে এবং আঙিনায় এই আলপনা আঁকা হয়।

  • রঙের ব্যবহার: সাধারণত সাদা চালগুঁড়ো, লাল সিঁদুর, হলুদ গাঁদা ফুলের রঙ, সবুজ পাতা ইত্যাদি দিয়ে আলপনা তৈরি হয়। আধুনিককালে রঙিন পাউডারও ব্যবহার করা হয়।

  • আকৃতি: বৃত্ত, পদ্মফুল, শঙ্খ, ত্রিশূল, আলোকরশ্মি, গাছের ডালপালা থেকে শুরু করে দেবীর চোখের প্রতীক বিভিন্ন নকশা এখানে স্থান পায়।

  • স্থান: মণ্ডপের প্রবেশদ্বার, দেবীর মূর্তির সামনে, পুজোর মঞ্চ এবং বিশেষত সিঁদুর খেলায় অংশ নেওয়ার জায়গায় আলপনার ব্যবহার বেশি দেখা যায়।


আলপনার প্রতীকী অর্থ

১. পদ্মফুল

পদ্ম দেবীর আসন। আলপনায় পদ্ম আঁকার মাধ্যমে দেবী লক্ষ্মী ও দেবী দুর্গাকে আহ্বান জানানো হয়। পদ্ম পবিত্রতা, জ্ঞান ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

২. শঙ্খ

শঙ্খ আঁকা হয় শুভশক্তির আহ্বানে। হিন্দু ধর্মে শঙ্খ মহাশক্তির প্রতীক, যা দুষ্টশক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখে।

৩. ত্রিশূল ও চক্র

ত্রিশূল ও চক্র দেবীর যুদ্ধশক্তির প্রতীক। আলপনায় এগুলি আঁকা মানে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা।

৪. শঙ্খচক্র গদাপদ্ম (বিশ্বচক্র নকশা)

বিশ্বচক্র নকশা মহাবিশ্বের ঐক্য, পূর্ণতা ও দেবশক্তির সর্বব্যাপী উপস্থিতির প্রতীক।

৫. পায়ের ছাপ

লাল সিঁদুর বা আলপনা দিয়ে আঁকা দেবীর পায়ের ছাপ মানে দেবী ঘরে প্রবেশ করেছেন। এটি শুভলক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।

৬. ধানের শিষ ও মাছ

ধানের শিষ মানে উর্বরতা ও সমৃদ্ধি। মাছ বাঙালির সংস্কৃতিতে সৌভাগ্যের প্রতীক। দুর্গাপুজোর আলপনায় এগুলি আঁকা হয় সংসারের শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনায়।

৭. চোখ (ত্রিনয়ন)

দেবীর তৃতীয় নয়ন বা চোখ আলপনায় প্রায়ই আঁকা হয়। এটি সর্বত্র বিরাজমান দেবশক্তি ও সর্বজ্ঞতার প্রতীক।

আলপনা আঁকার প্রধান শিল্পী ছিলেন গৃহিণীরা। দুর্গাপুজোর সময় গ্রামের মহিলারা দল বেঁধে মণ্ডপের মেঝেতে আলপনা আঁকতেন। এই সমষ্টিগত শিল্পকর্ম নারীদের শুধু দেবীকে আহ্বান করার এক মাধ্যমই ছিল না, বরং তাদের সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশও ছিল। আজও গ্রামীণ বাংলায় সেই চর্চা বহমান।

  1. ঘটস্থাপন: পূজার শুরুতে ঘট স্থাপনের জায়গায় বিশেষ আলপনা আঁকা হয়।

  2. আঞ্জলি: দেবীকে অঞ্জলি দেওয়ার স্থানে আলপনা শুভ পরিবেশ সৃষ্টি করে।

  3. সিঁদুর খেলা: বিজয়ার দিনে সিঁদুর খেলার জায়গা আলপনা দিয়ে সাজানো হয়, যাতে স্থানটি আরও শুভ হয়ে ওঠে।

  4. বিসর্জন: দেবীর বিদায়ের আগে বিসর্জনের মঞ্চে আলপনা আঁকা হয়, যা দেবীর গমনকে পবিত্র করে।

আজকের শহুরে দুর্গাপুজোয় আলপনা অনেকটা রূপ বদলেছে। আগে হাতে চালগুঁড়ো দিয়ে আঁকা হতো, এখন স্টেনসিল ব্যবহার করা হয়। কেবল সাদা নয়, রঙিন পাউডার, ফুলের পাপড়ি, এমনকি আলো বা লাইট ব্যবহার করে আলপনার ডিজাইন তৈরি করা হচ্ছে। অনেক শিল্পী এখন আলপনাকে মণ্ডপসজ্জার সঙ্গে মিলিয়ে থিম্যাটিক ডিজাইন করেন, যেমন পরিবেশ বাঁচানো, নারীশক্তি, স্বাধীনতার বার্তা ইত্যাদি। আলপনা আসলে শুভ শক্তি আহ্বানের এক প্রতীকী ভাষা। এর প্রতিটি রেখা ও বৃত্ত জীবনচক্র, সমৃদ্ধি, শান্তি ও দেবীশক্তির আবহ প্রকাশ করে। যখন ভক্তরা দেবীর সামনে দাঁড়ান, এই আলপনা তাঁদের মনে অজান্তেই এক পবিত্রতা ও ভক্তিভাব জাগিয়ে তোলে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে আলপনার ব্যবহার কেবল দুর্গাপুজোতেই নয়, বরং লক্ষ্মীপুজো, অন্নপ্রাশন, বিয়ে প্রভৃতি অনুষ্ঠানেও দেখা যায়। তবে দুর্গাপুজোর আলপনাই সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। গ্রামবাংলার কাঁচা মাটির আঙিনায় সাদা চালগুঁড়ো দিয়ে আঁকা আলপনা আজও অমলিন সৌন্দর্য বহন করে। দুর্গাপুজোর বিশেষ আলপনা কেবল অলংকরণ নয়, বরং এটি বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। পদ্ম থেকে ত্রিশূল, পায়ের ছাপ থেকে বিশ্বচক্র প্রতিটি নকশাই বহন করে গভীর প্রতীকী বার্তা। আলপনা যেন এক নীরব মন্ত্র, যা দেবী দুর্গার শক্তিকে আহ্বান করে, ভক্তদের মনে ভক্তি জাগায় এবং সামষ্টিক আনন্দকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আলপনার রূপ পাল্টালেও, তার মর্মার্থ আজও অটুট শুভশক্তির আহ্বান, অসুর শক্তির বিনাশ, আর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনা।

Archive

Most Popular