প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
মানুষের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, বিশেষত হিন্দু সনাতন সংস্কৃতিতে, প্রতিটি সংখ্যার একটি প্রতীকী অর্থ রয়েছে। ফুল থেকে শুরু করে ধূপ–দীপ, অর্ঘ্য থেকে মন্ত্র সব কিছুতেই নির্দিষ্ট নিয়ম এবং সংখ্যা মানা হয়। তার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলো ১০৮। দেব–দেবীর পূজো বা যজ্ঞে মন্ত্র জপের জন্য ১০৮ দানা বিশিষ্ট মালা ব্যবহার করা হয়, অর্ঘ্যও ১০৮টি দেওয়া হয়, অনেক সময় প্রদীপও ১০৮টি জ্বালানো হয়। কেন এই ১০৮ সংখ্যাটি এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্ন যুগের পর যুগ ধরে গবেষণার বিষয়। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো সংখ্যা ১০৮-এর ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। একই সঙ্গে এর সাংস্কৃতিক প্রভাব ও বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও আলোকপাত করবো।
অর্ঘ্য দেওয়ার সময় সাধারণত ফুল, তুলসি পাতা, বিল্ব পাতা, জবা, পদ্ম ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি দেবতা বা আচার অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ফুল বা পাতা লাগে। কিন্তু সংখ্যাটি যেন সর্বজনীন অর্ঘ্য ১০৮। এর কারণ হলো
পূর্ণতার প্রতীক: ১০৮ সংখ্যাটি সনাতন ধর্মে পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে মান্য। যেমন এক অঙ্কের (১–৯), দুই অঙ্কের (১০–৯৯) এবং তিন অঙ্কের (১০০–৯৯৯) মধ্যে ১০৮-কে একাধারে সব স্তরের পূর্ণ সংখ্যা হিসেবে ধরা হয়।
আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন: বিশ্বাস করা হয়, ১০৮ বার কিছু করলে মন ও শরীর সেই শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়। তাই ১০৮ অর্ঘ্য দিয়ে দেবতার সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করা হয়।
মন্ত্র–অর্ঘ্য সংযোগ: যেমন মন্ত্র জপের জন্য ১০৮ দানা মালা, তেমনই অর্ঘ্যও ১০৮ বার নিবেদন করলে মন্ত্র–পূজা সম্পূর্ণ হয়।
১০৮ সংখ্যার মাহাত্ম্য কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসেই সীমাবদ্ধ নয়, বিজ্ঞানের সঙ্গেও এর গভীর যোগ আছে।
সূর্য ও পৃথিবী: পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব সূর্যের ব্যাসের প্রায় ১০৮ গুণ।
চন্দ্র ও পৃথিবী: পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্বও চাঁদের ব্যাসের প্রায় ১০৮ গুণ।
জ্যোতিষশাস্ত্র: বৈদিক জ্যোতিষে ১২টি রাশি × প্রতিটি রাশির ৯টি নক্ষত্রপদ = ১০৮। তাই মানুষের জীবনের সমস্ত ভাগ্য ও চক্র ১০৮ সংখ্যার মধ্যে আবদ্ধ।
এই বৈজ্ঞানিক সংযোগ প্রমাণ করে যে, প্রাচীন ঋষিরা প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের সঙ্গতিপূর্ণ একটি সংখ্যা হিসেবে ১০৮-কে গ্রহণ করেছিলেন।
হিন্দু শাস্ত্রে ১০৮ সংখ্যার নানা উল্লেখ পাওয়া যায়।
উপনিষদ সংখ্যা: মোট ১০৮টি উপনিষদ রয়েছে, যা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ভাণ্ডার।
শিবের নাম: শিবের ১০৮ নাম, দেবীরও ১০৮ নাম প্রচলিত।
জপমালা: মন্ত্র জপের মালায় ১০৮টি দানা থাকে, আর একটি মেরু দানা থাকে শুরু/শেষ বোঝাতে।
তীর্থক্ষেত্র: ভারতে প্রাচীনকালে ১০৮টি তীর্থক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে।
নৃত্যশাস্ত্র: ভরতনাট্যমসহ অনেক শাস্ত্রীয় নৃত্যে ১০৮টি করণ বা ভঙ্গির বর্ণনা রয়েছে।
১০৮ সংখ্যাটিকে ভেঙে দেখা যায়
১ মানে ঈশ্বর বা সর্বোচ্চ সত্য।
০ মানে শূন্যতা বা মায়া।
৮ মানে অনন্ত বা অসীম (∞)।
অর্থাৎ ১০৮ হলো ঈশ্বর + শূন্যতা অতিক্রম করে অনন্তের দিকে যাত্রা। দার্শনিকভাবে এই সংখ্যা জীবনের আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক।
যোগশাস্ত্রে বিশ্বাস করা হয়
মানুষের শরীরে ১০৮টি প্রধান নাড়ি বা শক্তিপথ আছে, যা হৃদয়ের সঙ্গে যুক্ত।
ধ্যানের সময় ১০৮ বার মন্ত্র জপ করলে শরীরের প্রতিটি নাড়ি পবিত্র হয়।
অনেক যোগগুরু ১০৮ বার সূর্য নমস্কার করার পরামর্শ দেন আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত করার জন্য।
শুধু হিন্দুধর্ম নয়, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, এমনকি জাপান ও চীনের সংস্কৃতিতেও ১০৮ সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
বৌদ্ধধর্মে: বলা হয়, মানুষের ১০৮ প্রকার ক্লেশ বা বাসনা আছে। তাই ধ্যানের মাধ্যমে ১০৮ ক্লেশ কাটিয়ে নির্বাণ লাভ করা যায়। জাপানে নববর্ষে ১০৮ বার ঘণ্টা বাজানো হয়।
জৈনধর্মে: ১০৮টি গুণের সাধনা সর্বোচ্চ মুক্তির পথ।
সিখ ধর্মে: গুরু গ্রন্থ সাহিবে ১০৮ মালা জপের প্রাধান্য আছে।
সংখ্যা ১০৮ সাহিত্য ও কাব্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। কবিরা দেবীর ১০৮ নাম নিয়ে স্তোত্র রচনা করেছেন। অনেক সময় প্রেয়সীর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে বলা হয়েছে ওর গুণ ১০৮টি পদ্মের মতো। এর মাধ্যমে বোঝা যায় ১০৮ সংখ্যাটি ভারতীয় সংস্কৃতির কাব্যিক কল্পনায়ও অমূল্য।
আজও ধর্মীয় আচার, পূজা বা যোগচর্চায় ১০৮ সংখ্যার প্রভাব অটুট। আধুনিক মানুষ হয়তো মহাবিশ্ব বা শরীরের সঙ্গে এই সংখ্যার বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক জানেন, কিন্তু এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও সমানভাবে মূল্যবান। ১০৮ আজ এক ধরণের সাংস্কৃতিক কোড, যা ভারতীয় জীবনের নানা ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রোথিত। অর্ঘ্য সংখ্যা ১০৮ কেন হয় তার উত্তর শুধুমাত্র একটি কারণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একাধারে বৈজ্ঞানিক, আধ্যাত্মিক, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। সূর্য–চন্দ্র থেকে মানবদেহ, মন্ত্র থেকে উপনিষদ সব কিছুর সঙ্গেই এর গভীর যোগ রয়েছে। তাই ফুল থেকে বলি, প্রতিটি অর্ঘ্য সংখ্যা ১০৮ হওয়া এক গভীর ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ, যা ভারতীয় সভ্যতার হাজার বছরের জ্ঞান, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতিফলন।