বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপুজো বাঙালির হৃদয়ে কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি বার্ষিক মহোৎসব। এই কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের জীবন নতুন করে সাজে পোশাক থেকে শুরু করে গৃহসজ্জা, রন্ধন থেকে আড্ডা সবকিছুতেই উৎসবের রঙ মিশে যায়। বিশেষত বাড়ি সাজানো নিয়ে উৎসাহ থাকে সবার মধ্যেই। Pujo মানেই অতিথি-আতিথেয়তা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, বন্ধুবান্ধবের ভিড়। তাই ঘর সাজাতে চাই এমন এক স্টাইল যা একইসঙ্গে আরামদায়ক, আধুনিক এবং বৈচিত্র্যময়। এই জায়গাতেই আজকাল ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে বোহো স্টাইল বা Bohemian Style। Boho শব্দটি এসেছে Bohemian থেকে, যার মূল অর্থ ভিন্নতাবাদী, স্বাধীনচেতা জীবনযাপন। সাজসজ্জার ক্ষেত্রে এটি মানে রঙের উচ্ছ্বাস, মিশ্রনশৈলী, আর্টিস্টিক ছোঁয়া এবং একধরনের ভ্রমণপিপাসু দৃষ্টিভঙ্গি। এবারের পুজোয় তাই বাড়ির সাজে যদি যুক্ত হয় বোহো ছোঁয়া, তবে ঘর হবে প্রাণবন্ত, শিল্পসমৃদ্ধ ও একেবারেই আলাদা।
বোহো সাজসজ্জা মূলত ইউরোপে হিপি আন্দোলনের সময় থেকে জনপ্রিয়তা পায়। স্বাধীনচেতা শিল্পী, কবি, সংগীতশিল্পীরা তাঁদের জীবনযাত্রায় যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটাতেন, তাই থেকেই এই স্টাইলের উৎপত্তি। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো
রঙের ছটা: উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙ যেমন লাল, সবুজ, নীল, হলুদ ইত্যাদি।
টেক্সচার ও লেয়ারিং: কাপড়, কুশন, গালিচা, ঝালর, পর্দা সব কিছুর স্তরে স্তরে ব্যবহার।
নকশা ও মোটিফ: ট্রাইবাল, ফোক, জ্যামিতিক, ফুলেল নকশা।
প্রাকৃতিক উপাদান: বাঁশ, কাঠ, জুট, কটন, উলের ব্যবহার।
হ্যান্ডমেড জিনিসপত্র: ম্যাক্রামে, মাটির হস্তশিল্প, বোনা ঝুড়ি, মৃৎশিল্প।
উৎসবের উচ্ছ্বাস বাড়ায়: বোহো রঙিন সাজসজ্জা উৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ করে তোলে।
অতিথি আপ্যায়নে মানানসই: Pujo-র সময় ঘরে আসা অতিথিদের বোহো ছোঁয়া ঘর দেবে উষ্ণতা ও স্বাচ্ছন্দ্য।
ক্লান্তি দূর করে: বোহো স্টাইলের নরম আলো, কুশন, মাটির টব ইত্যাদি ঘরে আনে প্রশান্তি।
সৃজনশীলতার প্রকাশ: বোহো সাজ কোনো বাঁধাধরা নিয়ম মানে না। নিজের রুচি অনুযায়ী মেলবন্ধন করা যায়।
ড্রয়িং রুম
পুজোর সময় অতিথি আসার মূল জায়গা।
সোফায় রঙিন কুশন, টেক্সচার্ড থ্রো, উজ্জ্বল গালিচা ব্যবহার করুন।
দেওয়ালে হস্তশিল্প বা ট্রাইবাল আর্ট ঝুলিয়ে দিন।
রটান বা বাঁশের ঝুড়িতে ফুল বা শুষ্ক পাতা সাজান।
ডাইনিং এরিয়া
কাঠের টেবিলের উপর রাখুন রঙিন টেবিল রানার।
মাটির বা কাঁচের লণ্ঠন জ্বালান।
পিতল বা ব্রাসের থালা ও গ্লাস ব্যবহার করলে বোহো লুক আরও বাড়বে।
শোবার ঘর
বিছানায় নকশাদার বেডকভার, ম্যাক্রামে ঝুল।
বিছানার মাথার পাশে ফেয়ারি লাইট, ফ্রেমে বাঁধানো ফোক আর্ট।
জুটের গালিচা ও বড় বড় টব প্ল্যান্ট রাখলে ঘর হবে একেবারে ভ্রমণক্লান্ত পথিকের বিশ্রামস্থল।
বারান্দা/টেরেস
বাঁশের চেয়ার, হ্যামক বা ঝুলন্ত দোলনা রাখুন।
কুশনে রঙিন কাভার দিন।
পাত্রে সাকুলেন্ট বা ফুলগাছ সাজিয়ে দিন।
বোহো স্টাইল মানেই রঙের খেলায় ভরপুর সাজসজ্জা। এবারের পুজোয় রঙের সঠিক ব্যবহার ঘরে আনবে উৎসবের আবহ।
উষ্ণ রঙ: কমলা, হলুদ, লাল আনবে শক্তি ও উচ্ছ্বাস।
শীতল রঙ: নীল, সবুজ, বেগুনি আনবে প্রশান্তি।
নিউট্রাল বেস: সাদা, বেজ, বাদামি যাতে উজ্জ্বল রঙগুলো আরও স্পষ্ট হয়।
আলো ছাড়া Pujo-র সাজ অসম্পূর্ণ। বোহো স্টাইলে আলো হতে পারে
কাঁচের লণ্ঠন বা মোমবাতির হোল্ডার।
পিতলের প্রদীপ।
ফেয়ারি লাইট দিয়ে দেওয়াল সাজানো।
বোনা বা কাপড়ের ল্যাম্পশেড।
বোহো মানেই প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা। তাই সাজসজ্জায় প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করুন।
বাঁশ, রটান, কাঠের ফার্নিচার।
জুট, কটন বা লিনেনের কাপড়।
মাটির ফুলদানী, হস্তশিল্প।
ইনডোর প্ল্যান্ট যেমন মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট।
এবার Pujo-তে ঘরকে বিশেষ করে তুলতে হ্যান্ডমেড জিনিস ব্যবহার করতে পারেন
ম্যাক্রামে ওয়াল হ্যাংগিং
কাঠের ফটো ফ্রেম
কুঁচি করা কুশন কভার
মাটির প্রদীপ ও টব
লোকশিল্প বা ট্রাইবাল পেইন্টিং
পুরোনো কাঁচের বোতল রঙ করে ফুলদানী বানান।
পুরোনো শাড়ি দিয়ে কুশন কাভার তৈরি করুন।
নারকেলের খোল দিয়ে লাইট হোল্ডার বানাতে পারেন।
বাঁশের ডালা রঙ করে দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিন।
বোহো স্টাইল কেবল সাজসজ্জা নয়, এটি একধরনের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
ফোক ও ট্রাইবাল শিল্পের ব্যবহার আমাদের লোকশিল্পকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
স্থানীয় হস্তশিল্পীরা উপকৃত হন।
Pujo-তে আত্মীয়স্বজন এলে এই সাজসজ্জা তাঁদের কাছে বিশেষ অভিজ্ঞতা হবে।
এবারের দুর্গাপূজোতে যখন গোটা শহর আলোয় আলোকিত, মণ্ডপ ভরে উঠেছে শিল্প ও সৃজনশীলতায়, তখন ঘরেও চাই সেই রঙিন ও বৈচিত্র্যময় ছোঁয়া। বোহো স্টাইল ঘরে আনবে এক অন্য রকম আনন্দ যেখানে মিলবে রঙ, শিল্প, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক সুন্দর সমন্বয়। কেবল দৃষ্টিনন্দন নয়, বোহো ঘর হবে উষ্ণতা ও আতিথেয়তায় ভরা, যেখানে Pujo-র প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠবে স্মরণীয়। তাই এবারের পুজোয় ঘরে আসুক বোহো ছোঁয়া, আর আপনার ঘর হয়ে উঠুক উৎসবের অনন্য আড্ডাঘর।