19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

উৎসবের অন্দরসজ্জা !

বাড়িঘর

নিজস্ব প্রতিনিধি


উৎসব মানেই আলো, রঙ, আনন্দ আর সাজের ছোঁয়া। কিন্তু সাজ মানে কি শুধু নিজেকে সাজানো? একদমই না। উৎসবের আনন্দ শুরু হয় ঘর থেকেই। তাই উৎসবের সময় ঘরও যেন হয়ে ওঠে উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত আর উষ্ণতায় ভরা। আজকের দিনে বড় বড় শহরে ফ্ল্যাটই এখন মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্নের আশ্রয়। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে, কম খরচে, ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় এনে দেওয়া যায় এক অন্যরকম রূপ—যেখানে থাকবে আধুনিকতার আরামের সঙ্গে সাবেকি মাধুর্যও। পুরনো দিনের সেই অগোছালো, অথচ প্রাণভরা মধ্যবিত্ত ঘরগুলির এক অদ্ভুত টান আছে। বাঁধানো খাট, কাঠের আলমারি, পাটের মাদুর, বেতের চেয়ার, দেওয়ালে শীতলপাটি—সব মিলিয়ে যেন এক পরম আপন অনুভূতি। আজকের দিনে সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনা খুব একটা কঠিন নয়, শুধু চাই একটু কল্পনা আর মনোযোগ। ফ্ল্যাটের ছোট্ট বসার ঘরকে সাজাতে পারেন বৈঠকী ঘরের ছোঁয়ায়। সোফাসেটের বদলে রাখুন একটি বড় পুরু গদি, তার উপর বিছানার চাদর ও কুশন রাখুন কাঁথা-স্টিচ বা এমব্রয়ডারির কাজের। বালিশের কভারেও থাকুক ভারতীয় নকশা কল্কা, ময়ূর, হাতি, পুষ্পমালা ইত্যাদি। এই ছোটখাটো সংযোজনেই ঘরে ফুটে উঠবে দেশজ ঐতিহ্যের ছোঁয়া।


উৎসব মানেই আলো। দীপাবলি, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ক্রিসমাস অথবা নববর্ষ সব উৎসবেই আলোই সাজের মূল কথা। দামি লাইট বা ঝাড়বাতি না থাকলেও কিছু বেতের ল্যাম্পশেড, মাটির প্রদীপ বা বাঁশের আলো রাখলেই ঘরে অন্যরকম উষ্ণতা ফুটে উঠবে। ঘরের বারান্দায় রাখতে পারেন বাঁশের তৈরি ঝুলন্ত লণ্ঠন বা ফেয়ারি লাইটে জড়ানো শোলার মালা। আর জানলার পাশে মাটির কলসীতে রাখুন তাজা ফুল—চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, রজনীগন্ধা। দেখবেন, আলো আর সুবাসে ঘরের আবহ মুহূর্তেই বদলে যাবে।


এথনিক লুক দিতে হলে কাঠের আসবাবই মূল চাবিকাঠি। মেহগিনি বা শাল কাঠের দাম এখন অনেক বেশি, তাই বিকল্প হিসেবে নিতে পারেন প্লাই বা ইঞ্জিনিয়ার্ড কাঠ। তার উপর গাঢ় বাদামি বা কালো পালিশ করলে সাবেকি ভাব ঠিকই ফুটে উঠবে। ঘরের খাট, টেবিল, দেরাজ, বইয়ের আলমারি সবকিছুতেই রাখুন কাঠের উষ্ণ স্পর্শ। বিশেষ করে বইয়ের আলমারি—যে কোনো বাঙালি বাড়ির গর্ব। কাঠের তাক ভর্তি বই মানেই ঘরে সংস্কৃতির সুবাস।


উৎসবের ঘর সাজাতে চটকদার বিদেশি শো-পিসের প্রয়োজন নেই। বরং নিজের মাটির গন্ধ মেশানো জিনিস রাখুন—মাটির পুতুল, ফুলদানি, কলসী, বাঁশ বা বেতের পাত্র। খুব বেশি খরচ ছাড়াই এগুলি ঘরে এক অনন্য সৌন্দর্য নিয়ে আসে। যদি পকেট একটু ভারী হয়, তবে রাখতে পারেন পিতলের মূর্তি, অ্যান্টিক ধাতব প্রদীপ, হুঁকো বা পুরোনো ধাতব অস্ত্র। এই ছোটো ছোটো উপকরণেই তৈরি হয় ঘরের গল্প—একটি ঐতিহ্যবাহী ও গর্বের কাহিনি।


ঘরের দেওয়াল ঘরের চরিত্র প্রকাশ করে। তাই দেওয়াল সাজান এমনভাবে যাতে সেখানে আপনার রুচি, সংস্কৃতি আর উৎসবের উজ্জ্বলতা একসঙ্গে ধরা পড়ে। ইন্টারনেট থেকে ভালো মানের ভারতীয় শিল্পকর্ম বা ট্রাইবাল পেন্টিং ডাউনলোড করে প্রিন্ট করাতে পারেন। কাঠের বা বাঁশের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখলে দেখতে দারুণ লাগে। আর যদি একটু হাত চলে, তাহলে নিজের আঁকা ছবি, আলপনা বা ওয়ার্ল আর্টেই বদলে দিতে পারেন দেওয়ালের রূপ। বাংলা উৎসবের আবহে পদ্মফুল, ঢাক, ধুনুচি বা রাধা-কৃষ্ণের ছায়া ফুটিয়ে তুলুন রঙে রঙে। চাদর, পর্দা, কুশন, টেবিলক্লথ—সবেতেই থাকুক উৎসবের রঙ। কাঁথা, ব্যাটিক, অ্যাপ্লিকে বা ব্লক প্রিন্টের কাপড় ব্যবহার করুন। লাল, গেরুয়া, হলুদ, সবুজের মিশ্রণে ঘরে এনে দিন প্রাণচাঞ্চল্য।


একই সঙ্গে পর্দা বা টেবিলক্লথে রাখুন হাতের কাজের ছোঁয়া। এতে যেমন আলাদা নান্দনিকতা আসে, তেমনি স্থানীয় হস্তশিল্পীদের তৈরি জিনিস ব্যবহার করার আনন্দও মেলে।


সবাই তো বড় বাড়িতে থাকে না। ছোট ফ্ল্যাটে উৎসবের সাজ আনতে গেলে একটু বুদ্ধি খাটাতে হয়। যেমন:


মাদুর বা শীতলপাটি ব্যবহার করুন রুম ডিভাইডার বা দেওয়াল কাভার হিসেবে।


বেতের টেবিল ও চেয়ার রাখলে ঘরে হালকা এবং দেশজ লুক আসে।


বাঁশ বা পাটের কার্পেট দামি কার্পেটের বিকল্প হিসেবে চমৎকার।


কুরুশের তৈরি টেবিল ক্লথ বা কভার ঘরে আনে একান্ত নিজস্ব ছোঁয়া।


উৎসবের সাজ সম্পূর্ণ হয় না যদি ঘরে সবুজ না থাকে। জানলার পাশে, বারান্দায় বা ঘরের কোণে ছোটো টবে মানিপ্ল্যান্ট, তুলসী, পাথরচুরা, অ্যালোভেরা রাখুন। মাটির টব রঙ করে বা কাপড়ে ঢেকে রাখলে আরও সুন্দর লাগে। ঘরে যেন প্রকৃতির শ্বাস থাকে, তবেই উৎসবের প্রাণ পায় নতুন মাত্রা।


ফ্ল্যাট হোক বা বাড়ি ঘরের প্রবেশপথটাই অতিথির প্রথম অভিজ্ঞতা। কাঠের নেমপ্লেটে যদি থাকে হাতের আঁকা ফুল, শঙ্খ বা আলপনার নকশা, তাহলে দরজার সামনেই উৎসবের বার্তা পৌঁছে যায়।


দরজার পাশে রাখুন মাটির প্রদীপ, ফুলের মালা বা কলসীতে রাখা তুলসীপাতা—এই ছোটো জিনিসগুলিই ঘরকে করে তোলে ‘উৎসবমুখর’।


উৎসবের আমেজ কেবল চোখে দেখার নয়, গন্ধে ও অনুভবে মিশে যায়। তাই ঘরে রাখুন সুগন্ধি মোমবাতি, ধূপ বা আতর। গাঁদা ফুলের মালা, রজনীগন্ধা বা তুলসীপাতা দিয়ে সাজানো বাটি রাখলে ঘরে সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।


রঙের ক্ষেত্রেও রাখুন উষ্ণতার ছোঁয়া—লাল, হলুদ, গেরুয়া, সোনালি রঙের সংমিশ্রণ উৎসবের রূপকে উজ্জ্বল করে তোলে।


উৎসব শুধু বাইরে নয়, ভিতরেও। ঘরকে সাজিয়ে তোলার মধ্যে শুধু সৌন্দর্য নয়, আছে নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক আন্তরিক প্রয়াস। মাটির জিনিস, কাঠের আসবাব, বেতের ল্যাম্প, কাঁথা-স্টিচের পর্দা—সব মিলিয়ে যখন ঘর জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন উৎসবের আনন্দও যেন আরও গভীর হয়।


কম খরচে, সামান্য পরিশ্রমে, অনেক ভালোবাসা দিয়ে ঘর সাজান। কারণ ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়—ঘরই তো উৎসবের প্রথম স্পন্দন, যেখানে আলো জ্বলে শুধু প্রদীপে নয়, হৃদয়েও।

Archive

Most Popular