প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপূজা বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু আজকের যে জাঁকজমকপূর্ণ বারোয়ারি পূজা আমরা দেখি রঙিন প্যান্ডেল, আলো ঝলমলে সাজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই অন্য এক আকারে। প্রথমদিকে দুর্গাপূজা ছিল পারিবারিক বা একচালা পূজা, যেখানে নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও পরিচিতজনরাই মূলত পূজার অংশীদার হতেন। ক্রমে সমাজবদ্ধ জীবনের বিকাশ ও গণআবেগের মিলনে জন্ম নেয় বারোয়ারি পূজা, যা আজ সর্বজনীন দুর্গোৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ষোড়শ শতকের শেষভাগে এবং সপ্তদশ শতকে জমিদার ও ধনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা শুরু হয়। বিশেষ করে বাংলার জমিদারবাড়ি, বাবু সংস্কৃতি ও অভিজাত পরিবারগুলিই একচালা পূজার প্রচলন ঘটায়।
একচালা পূজা কী?
"একচালা" মানে একসঙ্গে একটি খাঁচা বা কাঠামোর মধ্যে দেবী দুর্গা, তাঁর সন্তান ও মহিষাসুর প্রতিস্থাপিত।
একচালা পূজা মূলত ছিল পারিবারিক পূজা, যেখানে কুলদেবী রূপে দুর্গার আরাধনা করা হতো।
প্রথম দৃষ্টান্ত: ইতিহাসবিদদের মতে, নদিয়ার রাজবাড়ি, শান্তিপুরের জমিদারবাড়ি কিংবা কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতেই প্রথম একচালা দুর্গাপূজার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বারোয়ারি শব্দের উৎপত্তি: বারোয়ারি এসেছে বারো ও ইয়ার থেকে, অর্থাৎ বারোজন বন্ধু বা প্রতিবেশীর মিলিত উদ্যোগ। পরে এটি সর্বজনীন পূজার প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রথম বারোয়ারি পূজা: ১৭৯০ সালে গঙ্গারাম মিত্র কলকাতায় প্রথম সর্বজনীন পূজার আয়োজন করেন বলে অনেক ঐতিহাসিকের দাবি। আবার কেউ কেউ মনে করেন ১৭৯০-এর দশকেই গোপাল মিত্রের উদ্যোগে কুমারটুলিতে প্রথম বারোয়ারি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সামাজিক কারণ:
জমিদারবাড়ির পূজায় সাধারণ মানুষ ছিলেন বহিরাগত দর্শক, অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত ছিল।
শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পূজার আনন্দে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চাইছিল।
একসঙ্গে কয়েকজন বন্ধু বা পাড়ার বাসিন্দা চাঁদা তুলে পূজা শুরু করলেন—যা থেকেই জন্ম নিল বারোয়ারি পূজা।
অভিজাত থেকে গণমুখী: একচালা পূজা ছিল অভিজাত পরিবারের ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক, বারোয়ারি পূজা হয়ে উঠল পাড়ার মানুষের সম্মিলিত আনন্দ।
দর্শন থেকে অংশগ্রহণ: জমিদারবাড়ির পূজায় মানুষ ছিল কেবল দর্শক; বারোয়ারি পূজায় সকলে হলো অংশীদার।
সাংস্কৃতিক প্রকাশ: বারোয়ারি পূজায় শুরু হলো যাত্রা, গান, নাটক, কবিগান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক আয়োজন, যা একচালা পূজায় ছিল না।
সাজসজ্জার বিবর্তন: একচালা পূজা মূলত প্রতিমা ও পুজার্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ; বারোয়ারি পূজার হাত ধরে এল থিম, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা।
কলকাতায় বাবু সংস্কৃতি যখন তুঙ্গে, তখন জমিদার ও ধনীদের পূজা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক ছিল।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসন ও নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের ফলে বারোয়ারি পূজা সমাজজীবনের নতুন দিকচিহ্ন হয়ে দাঁড়াল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর সমাজসংস্কারকরা সর্বজনীন পূজাকে সমর্থন করেছিলেন, কারণ এতে সামাজিক মিলন ও ঐক্যের প্রকাশ ঘটেছিল।
কুমারটুলি মূলত মৃৎশিল্পীদের এলাকা, যেখানে প্রতিমা তৈরি হয়। বারোয়ারি পূজার উত্থানের পর থেকেই কুমারটুলি প্রতিমা নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর ফলে
পূজা হলো আরও শিল্পসমৃদ্ধ।
পাড়ার পূজায় শুরু হলো প্রতিযোগিতা।
প্রতিমাশিল্পে বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের সূচনা।
বিশ শতকের শুরুতে বারোয়ারি পূজা ধীরে ধীরে সর্বজনীন পূজায় রূপান্তরিত হয়।
এখন এটি কেবল পাড়ার সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহর বা অঞ্চলের মানুষকে যুক্ত করে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বারোয়ারি পূজা হয়ে ওঠে দেশাত্মবোধ জাগানোর অন্যতম ক্ষেত্র। অনেক মণ্ডপে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি, দেশাত্মবোধক গান প্রচার করা হতো।
আজকের দিনে বারোয়ারি পূজা মানেই থিম পুজো, শিল্পের প্রতিযোগিতা, সামাজিক বার্তা। বড় বড় ক্লাব ও কমিটি মিলিতভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পূজার আয়োজন করে। মণ্ডপে দর্শনার্থীর ভিড়, টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পনসরশিপ সব মিলিয়ে বারোয়ারি পূজা এক মহোৎসব। একচালা পূজা থেকে বারোয়ারি পূজার যাত্রা কেবল আচার পরিবর্তন নয়, এটি সমাজের বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। জমিদারবাড়ির গণ্ডি ছেড়ে দুর্গাপূজা আজ গণমানুষের উৎসব। যেখানে সবাই সমানভাবে অংশ নেয়, মিলেমিশে উপভোগ করে আনন্দ। একচালা পূজা শিখিয়েছিল ঐতিহ্যকে, আর বারোয়ারি পূজা শিখিয়েছে সর্বজনীনতা এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজকের দুর্গোৎসব।