19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বিনিয়োগ সোনায় নাকি বাড়িতে?

বাড়িঘর

নিজস্ব প্রতিনিধি


অর্থ উপার্জন যেমন একটি শিল্প, তেমনি সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা তার চেয়েও বড়ো একটি কৌশল। বাংলার মধ্যবিত্ত মানসিকতায় বরাবরই নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের একটা স্পষ্ট চাহিদা থাকে। সেই প্রেক্ষিতে দুইটি চিরাচরিত বিনিয়োগ মাধ্যম আজও জনপ্রিয় সোনা (Gold) এবং আবাসন (Real Estate/House Property)। প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘমেয়াদে লাভের দিক থেকে, নিরাপত্তা, রিটার্ন এবং তরলতার বিচারে কে সেরা? সোনায় বিনিয়োগ, না বাড়িতে? এই প্রবন্ধে আমরা এই দুটি বিনিয়োগ মাধ্যমের সুবিধা, অসুবিধা, ঝুঁকি, রিটার্ন ও বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ করে দেখব।


সোনায় বিনিয়োগ: এক ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার প্রতীক

ভারতীয় সমাজে সোনার প্রতি এক গভীর আবেগ ও সংস্কৃতিগত মূল্য রয়েছে। বাঙালি পরিবারে সোনার গয়না শুধু আর্থিক সম্পদ নয়, কন্যার বিবাহ, সামাজিক সম্মান ও প্রজন্মান্তরের উত্তরাধিকারের অংশ। সোনায় বিনিয়োগের একাধিক উপায় রয়েছে

  • ফিজিক্যাল গোল্ড: গয়না, বার, কয়েন ইত্যাদি।

  • ডিজিটাল গোল্ড: মোবাইল অ্যাপ বা ওয়ালেট মারফত।

  • Sovereign Gold Bond (SGB): RBI দ্বারা জারি, সুদসহ রিটার্ন।

  • Gold ETF ও Mutual Fund: স্টক মার্কেটে ট্রেডযোগ্য।


সোনার বিনিয়োগের সুবিধা

নগদীকরণের সহজতা (Liquidity)

জরুরি সময়ে সোনা সহজেই বিক্রি বা বন্ধক রাখা যায়। ভারতের যে কোনো প্রান্তেই এর বিক্রয়যোগ্যতা আছে।

মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা (Capital Appreciation)

সোনা সাধারণত মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ায়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা বাজার পতনের সময়েও সোনার চাহিদা বাড়ে।

কম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ

সোনা একটি “safe haven asset” হিসেবে পরিচিত। যখন স্টক মার্কেট পড়ে, সোনার দাম বরং বাড়ে।

সঞ্চয়ের সহজ মাধ্যম

ছোট অঙ্কের টাকা থেকেও শুরু করা যায় (ডিজিটাল গোল্ড, SGB)। ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও সোনা কিনে আর্থিক সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারেন।


সোনার বিনিয়োগের অসুবিধা

ফিজিক্যাল সোনায় নিরাপত্তা ঝুঁকি

বাড়িতে সোনা রাখলে চুরি, হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুরক্ষা ব্যয়ও বেড়ে যায় (লকার ইত্যাদি)।

ফিক্সড রিটার্ন নেই

সোনার কোনো নিশ্চিত সুদ পাওয়া যায় না (শুধু SGB-তে ২.৫% সুদ আছে)। দাম বাড়লেই লাভ, নইলে নয়।

গয়না হিসেবে ব্যবহারে মূল্যহ্রাস

গয়নার ক্ষেত্রে মেকিং চার্জ, ওয়েস্টেজ, রিসেল ভ্যালু কম পাওয়া যায়।


বাড়ি/ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ এক বাস্তব সম্পদের হাতছানি


কেন বাড়ি কেনা?

জীবনের অন্যতম বড়ো লক্ষ্য নিজের বাড়ি। আবাসন কেবল আশ্রয় নয়, তা একটি সম্পদও। বিনিয়োগ হিসেবে বাড়ি কিনলে তা থেকে ভাড়া আয়, ভবিষ্যতের রিটার্ন এবং উত্তরাধিকারের সুবিধা পাওয়া যায়।

বাড়িতে বিনিয়োগের ধরন

  • সেলফ-অকুপায়েড হোম: নিজে থাকেন।

  • রেন্টাল প্রপার্টি: ভাড়া দিয়ে মাসিক আয়।

  • প্লট/ল্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট: ভবিষ্যতের দাম বৃদ্ধির আশায়।

  • কর্মাশিয়াল স্পেস (Shop, Office): ব্যবসার জন্য বা ভাড়ার আয়।


বাড়ি কেনার সুবিধা

দুই ধরনের আয়: ভাড়া + মূল্যবৃদ্ধি

প্রতি মাসে ভাড়া আয় এবং সময়ের সঙ্গে প্রপার্টির দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

লং টার্ম স্ট্যাবিলিটি

বাড়ির দাম সাধারণত ৫-১০ বছরে দ্বিগুণ হতে পারে (লোকেশনভেদে)। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।

লোন ও ট্যাক্স বেনিফিট

হোম লোনে সরকার কর ছাড় দেয় (ধারা ৮০সি, ২৪বি)। EMI ও সুদ উভয়েই ছাড় পাওয়া যায়।

বাসস্থান ও উত্তরাধিকার

নিজের থাকার জায়গা হওয়ায় মানসিক শান্তি আসে। ভবিষ্যতে ছেলে-মেয়ের উত্তরাধিকারে একটি নিশ্চিত সম্পদও তৈরি হয়।


বাড়িতে বিনিয়োগের অসুবিধা

বাড়ি বিক্রি বা বন্ধক রাখা সময়সাপেক্ষ, ঝামেলাপূর্ণ এবং লোকেশনভেদে কঠিন হতে পারে।

প্রতিবছর মেরামতি, ট্যাক্স, সোসাইটি চার্জ, জলের বিল, কর্পোরেশন ট্যাক্স ইত্যাদি দিতে হয়।

যদি লোকেশন ভাল না হয়, তবে বাড়ির দাম বাড়ে না, ভাড়াটে পাওয়া যায় না।

প্রপার্টির কাগজে ভুল থাকলে ভবিষ্যতে বড়ো ঝুঁকি হতে পারে। দলিল, মিউটেশন, দখল সব সঠিক থাকা জরুরি।


তুলনামূলক বিশ্লেষণ: সোনা বনাম বাড়ি

বিষয়সোনাবাড়ি
আয় ও রিটার্নশুধুমাত্র মূল্যবৃদ্ধিভাড়া + মূল্যবৃদ্ধি
নগদীকরণখুব সহজ (লিকুইড)কঠিন, সময়সাপেক্ষ
ঝুঁকিকমবেশি (লোকেশন, কাগজ, ভাড়াটে)
রক্ষণাবেক্ষণপ্রায় শূন্যনিয়মিত খরচ লাগে
নূন্যতম বিনিয়োগ₹৫০০ থেকেও শুরু সম্ভবলাখ টাকার ওপরে দরকার
ইনফ্লেশন হেজহ্যাঁহ্যাঁ
আবেগিক মূল্যসাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়বাসস্থান ও পারিবারিক ঐতিহ্য
উত্তরাধিকারসহজে হস্তান্তরযোগ্যআইনগত হস্তান্তর লাগে

কখন সোনায় বিনিয়োগ করবেন?

  • যদি আপনি নগদ টানাটানির সময়ে দ্রুত টাকা চাইলে।

  • কম ঝুঁকির নিরাপদ বিনিয়োগ চান।

  • ছোট অঙ্কে ধাপে ধাপে সঞ্চয় করতে চান।

  • আপনার হাতে আগে থেকেই বাড়ি আছে।


কখন বাড়িতে বিনিয়োগ করবেন?

  • যদি আপনার নিজস্ব বাসস্থান না থাকে।

  • আপনি দীর্ঘমেয়াদী আয় (ভাড়া) চান।

  • ব্যাংক লোন সুবিধা পেতে চান।

  • বড় অঙ্কের এককালীন বা EMI দেওয়ার সামর্থ্য থাকে।


কলকাতায় বিনিয়োগচিত্র

২০১০ সালে ১০ গ্রামের সোনার দাম ছিল প্রায় ₹১৮,০০০। ২০২৫ সালে তা পৌঁছেছে ₹৬০,০০০। ১৫ বছরে প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি। গড়ে বছরে ~৮% রিটার্ন। একই সময়ে দক্ষিণ কলকাতায় ৩BHK ফ্ল্যাটের দাম ছিল ₹৩০ লক্ষ, যা আজ ₹৯০-১০০ লক্ষ। আবার ভাড়াও বেড়েছে ₹৮০০০ → ₹২৫,০০০। তাই বছরে ~১০-১২% পর্যন্ত কম্পাউন্ড রিটার্ন এসেছে।


কোনটা সেরা? ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত

সোনায় বিনিয়োগ ও বাড়িতে বিনিয়োগ উভয়েরই নিজস্ব জায়গা আছে। আপনি যদি একজন তরুণ, যিনি স্বল্প আয় ও কম ঝুঁকিতে ছোট অঙ্কে শুরু করতে চান, তাহলে সোনা উপযুক্ত। আবার আপনি যদি পরিবার নিয়ে স্থায়ী বসবাস বা ভাড়া আয়ের লক্ষ্যে এগোতে চান, তাহলে বাড়ি এক চমৎকার দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ। আদর্শ সিদ্ধান্ত হলো: উভয়েরই সুষম ভারসাম্য রাখা। উদাহরণস্বরূপ আপনার মোট বিনিয়োগের ১০-১৫% সোনায়, এবং ৫০-৬০% রিয়েল এস্টেটে হলে ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব ও তরলতা দুটোই বজায় থাকে।

স্মার্ট বিনিয়োগকারীর মূলমন্ত্র:
Not all eggs in one basket.
আপনার আর্থিক লক্ষ্য, বয়স, আয়, দায়িত্ব এবং ঝুঁকি গ্রহণ ক্ষমতার ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। বিনিয়োগ যেন শুধু আর্থিক লাভ নয়, মানসিক শান্তি ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও বয়ে আনে।

Archive

Most Popular