19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

অন্দরসজ্জায় থাক আন্তরিক আবহ!

বাড়িঘর

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাড়ি এই শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে উষ্ণতা, আরাম আর ভালোবাসা। এটি শুধু চারটি দেয়াল আর ছাদের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের আবেগ, স্মৃতি আর ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। তাই বাড়ির অন্দরসজ্জা বা ইন্টেরিয়র ডিজাইন কেবল সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়, এটি একধরনের আবহ সৃষ্টির শিল্প যেখানে প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি রঙ, প্রতিটি আলো, এমনকি গন্ধও আমাদের মনের সঙ্গে কথা বলে। “অন্দরসজ্জায় থাক আন্তরিক আবহ” এই কথাটার মর্ম ঠিক এখানেই। যে ঘরেই আমরা প্রবেশ করি, সেখানে যদি একটা আপন, উষ্ণ, স্নিগ্ধ অনুভূতি পাই, তবেই সেই সাজের সার্থকতা। আজকের প্রবন্ধে আমরা জানব কীভাবে ঘরের সাজে সেই আন্তরিকতার ছোঁয়া আনা যায় রঙে, আলোয়, আসবাবে, গন্ধে, এমনকি ছোটখাটো মানবিক টাচে।


অন্দরসজ্জা: শুধু সাজ নয়, এক অনুভব

অন্দরসজ্জা মানে শুধু দামি আসবাব বা বিলাসবহুল ডেকর নয়। এটি আসলে এমন এক ভারসাম্য যেখানে ব্যক্তিত্ব, আরাম, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা মিলেমিশে যায়।
একটি ঘর যখন তার মালিকের গল্প বলে, তখনই সেটি হয়ে ওঠে আন্তরিক। যেমন

  • কোনো কোণে মা’র পুরনো কাঠের আলমারি,

  • দেওয়ালে নিজের হাতে আঁকা ছবি,

  • জানালার পাশে রাখা দোলনা চেয়ার,

  • কিংবা বারান্দায় প্রিয় মানচিত্র বা বইয়ের তাক

এই সব মিলেই তৈরি হয় এক উষ্ণ আবহ, যা বাজারের কোনো দামি চ্যান্ডেলিয়ার দিতে পারে না।


রঙে রঙে মনের ভাষা

রঙ মানুষের মনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই অন্দরসজ্জায় রঙের ব্যবহারই নির্ধারণ করে একটি ঘরের মেজাজ।

উষ্ণ রঙ (Warm tones)

যেমন লাল, কমলা, হালকা হলুদ।
এগুলো প্রাণশক্তি ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। অতিথি ঘর বা ডাইনিং স্পেসে এই রঙগুলো আন্তরিকতা ও হাসিখুশি ভাব আনতে সাহায্য করে।

শীতল রঙ (Cool tones)

যেমন সবুজ, নীল, ল্যাভেন্ডার।
এগুলো শান্ত, নিরিবিলি ও প্রশান্ত অনুভূতি দেয়। বেডরুম বা স্টাডি রুমে এই রঙগুলো মানসিক শান্তি আনে।

নিরপেক্ষ রঙ (Neutral tones)

সাদা, ধূসর, বেইজ এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করলে ঘর আরও প্রসারিত লাগে, আর অন্যান্য ডেকর আইটেমগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

টিপস:
একঘেয়ে রঙের বদলে বিভিন্ন টেক্সচার ও লেয়ার ব্যবহার করুন যেমন সাদা দেয়ালে কাঠের র‍্যাক, বা ক্রিম রঙের সঙ্গে বেতের ল্যাম্প এই কনট্রাস্টই আনবে আন্তরিক সৌন্দর্য।


আলো: অন্দরসজ্জার প্রাণ

“আলো মানেই জীবন” এই কথাটা ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেও সত্য।

প্রাকৃতিক আলো

দিনের আলো ঘরে ঢুকলে সেই উষ্ণতা অমূল্য। জানালার পর্দা হালকা রাখুন, যাতে রোদ ও বাতাস সহজে প্রবেশ করে।

কৃত্রিম আলো

আলোকসজ্জা তিনভাবে ভাবা যায়

  1. Ambient light: ঘরের প্রধান আলো (ceiling light বা chandelier)।

  2. Task light: নির্দিষ্ট কাজের জন্য যেমন পড়ার ল্যাম্প, রান্নাঘরের লাইট।

  3. Accent light: কোনো বিশেষ কোণা বা শিল্পকর্মকে হাইলাইট করার জন্য।

রাতের সময় হালকা হলুদ বা উষ্ণ আলো (warm white light) ব্যবহার করলে ঘরে একধরনের শান্ত, আরামদায়ক, পারিবারিক আবহ তৈরি হয়।


প্রকৃতির ছোঁয়া

প্রকৃতি মানেই সতেজতা। ঘরের ভেতর সবুজের উপস্থিতি ঘরের প্রাণ বাড়িয়ে দেয়।

  • ইন্ডোর প্ল্যান্টস যেমন মানিপ্ল্যান্ট, আরেকাপাম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট রাখুন।

  • টেরারিয়াম বা কাঁচের ছোট পাত্রে গাছ সাজালে টেবিলেও এনে দেয় প্রাণ।

  • গন্ধরাজ বা তুলসির টব শুধু সৌন্দর্য নয়, পজিটিভ এনার্জিও দেয়।

প্রকৃতির রঙ, গন্ধ, আলো সবকিছু মিলে অন্দরসজ্জায় আসে এক মমতাময় আবহ, যা আন্তরিকতার মূল চাবিকাঠি।


আসবাব ও বিন্যাসে মানবিক ছোঁয়া

বাড়ি সাজানোর সময় আসবাব শুধু ডিজাইনের বস্তু নয় এগুলো ব্যবহারযোগ্য, আরামদায়ক ও স্মৃতিবাহী হওয়া উচিত।

  • কাঠ বা বেতের আসবাব ঘরে প্রাকৃতিক উষ্ণতা আনে। সোফা বা ডাইনিং চেয়ারে হালকা কাপড়ের কুশন ব্যবহার করুন এতে বসার আরাম ও রঙের মেলবন্ধন দুটোই বাড়ে।

  • অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জমিয়ে রাখবেন না; “কম কিন্তু মানসম্পন্ন” নীতিই ঘরকে পরিপাটি রাখে।

একটি ছোট দোলনা, প্রিয় বইয়ের তাক বা নানুর পুরনো ঘড়ি এই সামান্য জিনিসগুলোই ঘরের আবেগকে জীবন্ত রাখে।


দেওয়ালে কথা বলুক স্মৃতি

দেওয়াল শুধুমাত্র সিমেন্ট নয় এটি একখানা ক্যানভাস, যেখানে আমাদের জীবনের গল্প ফুটে উঠতে পারে।

  • পরিবারের ছবি, ভ্রমণের মুহূর্ত, শিশুর আঁকা ছবি এইসব ফ্রেমে বাঁধুন।

  • দেয়ালের এক পাশে মুরাল বা ওয়াল আর্ট রাখলে ঘরের চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়।

  • বাংলা কলিগ্রাফি বা লোকশিল্পের টুকরোও যোগ করতে পারেন এতে ঐতিহ্যের গন্ধ থাকবে।

এই দেওয়ালগুলোই তখন বলবে “এই ঘর শুধুই সাজ নয়, এটি এক সম্পর্কের আশ্রয়।”


গন্ধ, শব্দ ও অনুভূতির ভূমিকা

একটি ঘর শুধু দেখা নয় শোনা, ঘ্রাণ নেওয়া ও অনুভব করার বিষয়ও বটে।

  • সুগন্ধি মোমবাতি বা অ্যারোমা ডিফিউজার ব্যবহার করুন ল্যাভেন্ডার, স্যান্ডালউড বা জুঁই-এর ঘ্রাণ ঘরে এনে দেয় শান্তি।

  • সুরেলা সঙ্গীত বাজান হালকা রবীন্দ্রসঙ্গীত বা যন্ত্রসঙ্গীত সন্ধ্যার ঘরে এক আলাদা স্নিগ্ধতা আনে।

  • নরম পর্দা ও কার্পেট শব্দ শোষণ করে, ফলে ঘরে তৈরি হয় নরম, অন্তরঙ্গ ধ্বনি।

এই সব ছোট উপাদানই গড়ে তোলে এক উষ্ণ, মানবিক পরিবেশ যেখানে বসে মন নিজেই বিশ্রাম পায়।


ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

আজকের ঘরগুলো অনেক সময় সম্পূর্ণ আধুনিক সাজে সাজানো থাকে, যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া হারিয়ে যায়। অথচ আন্তরিক আবহ আসে ঠিক সেই ঐতিহ্যের টানে।

কীভাবে এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো যায়?

  • মডার্ন সোফার পাশে রাখুন একজোড়া পিতলের প্রদীপ।

  • গ্লাস টপ টেবিলের উপর রাখুন কাঁসার ফুলদানী বা কোলাজ করা পুরনো ছবি।

  • আধুনিক প্যানেলের সঙ্গে কাঠের টেক্সচার যোগ করুন এতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা মিলেমিশে যায়।

এই মেলবন্ধনই ঘরে আনে “বাংলা ঘর”-এর সেই চিরচেনা আন্তরিক গন্ধ।

ছোট ছোট DIY ও ব্যক্তিগত স্পর্শ 

নিজের হাতে তৈরি জিনিসের মূল্য সবসময় আলাদা।

  • পুরনো বোতল রঙ করে ফুলদানী বানাতে পারেন।

  • ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে কুশন কভার বানিয়ে ফেলুন।

  • মাটির প্রদীপে সাজান বারান্দা বা করিডর।

যখন কোনো জিনিসে আপনার শ্রম ও ভালোবাসা মিশে থাকে, তখন সেটি কেবল ডেকর নয়, হয়ে ওঠে আপনার পরিচয়ের অংশ।


উৎসবের সময় অন্দরসজ্জা

বাংলার বাড়িতে উৎসব মানেই সাজের নতুন উপলক্ষ। পুজো, দীপাবলি, নববর্ষ এই সময়ে অন্দরসজ্জায় বাড়তি আন্তরিকতা যোগ হয়।

  • দীপাবলিতে: হলুদ আলো, ফুলের মালা, তেলদীপ ও লণ্ঠন ব্যবহার করুন।

  • দুর্গাপূজায়: লাল-সাদা রঙ, ধূপ-ধুনো আর আলতা রঙের টেক্সটাইল ঘরে আনবে ঐতিহ্যের স্পর্শ।

  • পয়লা বৈশাখে: আলপনা, পটচিত্র আর কাঁসার বাসনে ফুল রাখলে ঘর ভরে উঠবে উৎসবের গন্ধে।

উৎসবের এই সাজ কেবল বাহ্যিক নয় এটি একধরনের পারিবারিক বন্ধনকেও পুনরুজ্জীবিত করে।


জীবনের গতিতে “আন্তরিক ঘর”-এর প্রয়োজন

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই বাইরের দৌড়ঝাঁপে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তখন বাড়ি হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়।
যদি সেই আশ্রয়টিতে শান্তি, ভালোবাসা, এবং উষ্ণতা থাকে তবে সেটিই প্রকৃত সুখ।

“আন্তরিক আবহ” মানে এমন এক পরিবেশ, যেখানে

  • অতিথি এলেই হাসিমুখে বসতে পারেন,

  • সন্তানেরা মুক্তভাবে খেলতে পারে,

  • নিজের একান্ত কোণ খুঁজে নিয়ে চা হাতে বসে থাকা যায়,

  • আর প্রতিটি জিনিসের মধ্যে থাকে পরিচিত গন্ধ ও ভালোবাসার ছোঁয়া।

এই ঘরেই থাকে জীবনের প্রকৃত প্রশান্তি। অন্দরসজ্জা কখনও কেবল সাজ নয় এটি এক অন্তরযাত্রা। আমরা যেমন, আমাদের ঘরও তেমন। তাই সাজ যেন কৃত্রিম না হয়; বরং প্রতিটি কোণে থাকুক মমতার ছোঁয়া, প্রতিটি আলোয় ফুটে উঠুক সম্পর্কের উষ্ণতা। ঘরের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন সেখানে মানুষ, স্মৃতি, ও হৃদয় একসূত্রে বাঁধা থাকে। সেই ঘরেই থাকে আন্তরিক আবহ, যা আমাদের ক্লান্ত মনকে বলে

“ফিরে এসো, এ ঘর তোমার।”

Archive

Most Popular