বাড়িঘর
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার ঘর, বাংলার মাটি এই দুটি শব্দেই যেন লুকিয়ে আছে আমাদের চিরন্তন নান্দনিকতা, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির মূলে থাকা দেশজ সৌন্দর্য। আজ যখন আধুনিকতার ঝলমলে আলোয় আমাদের ঘর সাজানোর ধারা বদলে যাচ্ছে, তখনও কোথাও না কোথাও মাটি, কাঠ, বেতের উষ্ণতা আমাদের টেনে রাখে। প্লাস্টিক, স্টিল বা কাচের ঠান্ডা পরিসরে যে উষ্ণ মানবিক স্পর্শের অভাব, তা মেটাতে পারে কেবল এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো। তাই আজকের প্রজন্মও আবার ফিরে আসছে সেই ঐতিহ্যের কাছে country chic বা eco-friendly décor-এর নামে এক নতুন করে দেশজ শিল্পের পুনর্জন্ম ঘটছে।
বাংলার স্থাপত্য, গৃহসজ্জা ও ব্যবহারিক শিল্পকলার ইতিহাসে কাঠ, মাটি ও বেতের ব্যবহার প্রাচীন। গ্রামের মাটির ঘর, বাঁশের বেড়া, মাটির হাঁড়ি, কাঠের পিঁড়ি, বেতের মোড়া এগুলো শুধু বস্তু নয়, এরা আমাদের জীবনযাত্রার প্রতীক। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান, পরিশ্রম ও সৃষ্টিশীলতার মেলবন্ধন।
প্রাচীনকালে গ্রামের ঘরবাড়ি বানানো হতো স্থানীয় উপাদান দিয়ে — মাটির দেয়াল, খড়ের ছাউনি, কাঠের জানলা, বেত বা বাঁশের আসবাব। সেই ঘর গরমে ঠান্ডা ও শীতে উষ্ণ থাকত, মানে ছিল প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বিত এক জীবনধারা। এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে শান্তিনিকেতন, কুমোরটুলি, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া বা সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে।
কাঠের প্রতি মানুষের আকর্ষণ প্রাচীনকাল থেকেই। কাঠ শুধু নির্মাণ সামগ্রী নয়, এটি সৌন্দর্যের ভাষা। কাঠের তৈরি দরজা-জানলা, খাট, চেয়ার, আলমারি, পিঁড়ি বা শোকেস একদিকে যেমন টেকসই, তেমনি ঘরে এনে দেয় উষ্ণতা ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন।
বাংলার কাঠের কারিগররা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তাদের খোদাই করা দরজার নকশা, আলমারির নকশা, বা পালঙ্কের খুঁটির অলংকার আজও আমাদের বিস্মিত করে। একসময় রাজবাড়ি থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহেও দেখা যেত এই সূক্ষ্ম কাঠখোদাই। আজ আধুনিক ইন্টেরিয়রে ‘solid wood furniture’ বা ‘handcrafted furniture’-এর চাহিদা বাড়ছে যা আসলে আমাদের সেই ঐতিহ্যেরই আধুনিক সংস্করণ।
বিশেষত সেগুন, শিমুল, শাল, মেহগিনি প্রভৃতি কাঠে তৈরি আসবাবপত্র দীর্ঘস্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব। কাঠের তৈরি পণ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য, এবং তার প্রাকৃতিক টেক্সচার ঘরে এক ধরনের আরামদায়ক উষ্ণতা নিয়ে আসে।
“বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল”— এই পঙক্তি শুধু কবিতাই নয়, এটি জীবনের বাস্তব দর্শন। মাটি আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। কুমোরটুলির শিল্পীরা প্রতিদিন সেই মাটিকেই প্রাণ দেন— প্রতিমা, হাঁড়ি, কলস, প্রদীপ, ফুলদানিতে।
গ্রামীণ জীবনে মাটির পাত্র একসময় ছিল অপরিহার্য। রান্না, সংরক্ষণ, জল রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো মাটির হাঁড়ি, গামলা, কলস। এগুলির বিশেষ গুণ হলো, এগুলো প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে যায়। আজ শহুরে জীবনে এই মাটির পাত্র নতুন করে ফিরে এসেছে “terracotta décor” নামে। ঘর সাজাতে, বারান্দায় গাছের টব হিসেবে, কিংবা দেয়ালের শিল্পে মাটির ছোঁয়া এক অনন্য রুচির পরিচয় দিচ্ছে।
বাংলার মাটির পুতুল, শান্তিনিকেতনের মৃৎশিল্প, বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরের অলংকার, কুমোরদের তৈরি প্রদীপ— প্রতিটিই একেকটা শিল্পের দলিল। মাটির কাজের মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে মাটির সান্নিধ্যে বেঁধে রাখে।
বেত, বাঁশ ও পাট এই তিন উপাদান গ্রামীণ জীবনের মেরুদণ্ড। বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামে কোনো না কোনো পরিবার বেতের শিল্পে যুক্ত। বেতের মোড়া, ডালা, ঝুড়ি, চেয়ার, হাতপাখা, ঝুলন, এমনকি ল্যাম্পশেড এই সবকিছুই এখন শহুরে জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
আগে এই শিল্পকে অনেকেই ‘গ্রামীণ কারুশিল্প’ বলে অবহেলা করতেন, কিন্তু এখন বেত ও বাঁশের কাজকে sustainable décor হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশেও ‘eco-cane’ বা ‘bamboo craft’-এর প্রচণ্ড চাহিদা তৈরি হয়েছে।
বেতের তৈরি পণ্য শুধু হালকা নয়, তার নান্দনিক আবেদনও অনন্য। একদিকে আধুনিক নকশা, অন্যদিকে গ্রামীণ সাদামাটা স্বাদ— দুই মিলিয়ে বেতের আসবাব আজ আধুনিক বাংলার ঘরে দেশজ ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দেশজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধবতার সম্পর্ক
প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি আসবাব ও সামগ্রী পরিবেশবান্ধব। এতে প্লাস্টিক বা রাসায়নিক রঙের ব্যবহার নেই। কাঠ, মাটি বা বেতের পণ্য সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং ভেঙে গেলে প্রকৃতিতে মিশে যায়। ফলে পরিবেশের ওপর চাপ কমে।
আজকের দিনে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও প্লাস্টিক দূষণ বড় সমস্যা, তখন দেশজ শিল্পই আমাদের শেখায়— কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে সুন্দরভাবে বাঁচা যায়।
শিল্পীদের সংগ্রাম ও নতুন দিগন্ত
গ্রামীণ বাংলার এই শিল্প আজও টিকে আছে শিল্পীদের হাত ধরে। তবে তারা নানা সংকটের মুখোমুখি— কাঁচামালের দাম, বিপণনের অভাব, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। তবুও অনেকে হাল ছাড়েননি।
সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা এখন দেশজ কারুশিল্পকে এগিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে— যেমন হাট, মেলা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজাইন ট্রেনিং ইত্যাদি। “Bangla Haat”, “Biswa Bangla” বা “Khadi India”-র মতো প্রকল্পগুলো শিল্পীদের নতুন আশা দিয়েছে।
আজকের তরুণ ডিজাইনাররাও বেত, মাটি, কাঠের জিনিস দিয়ে আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন তৈরি করছেন। এতে একদিকে ঐতিহ্য রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে বাড়ছে ‘Made in Bengal’-এর মর্যাদা।
শহুরে ঘরে দেশজ স্পর্শ
আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট জীবনেও দেশজ উপাদানের ব্যবহার এখন ট্রেন্ড। কাঠের মেঝে, মাটির ফুলদানি, বেতের ল্যাম্পশেড বা চেয়ার— এগুলো শুধু সাজ নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির উৎস।
একটু বেতের পর্দা, টেরাকোটা প্লেট, বাঁশের লাইটস্ট্যান্ড, কাঠের টেবিল বা হাতে বানানো মাটির প্রদীপ— এই ছোট ছোট সংযোজনেই ঘরে আসে প্রকৃতির শান্তি।
আজ অনেকেই নিজের বাড়িকে ‘sustainable home’ বানাতে চান। সেখানে সিমেন্ট ও স্টিলের ঠান্ডা আবহ কাটিয়ে কাঠ-মাটি-বেতের ছোঁয়া যেন এনে দেয় প্রাণের উষ্ণতা।
দেশজ শিল্পের মনস্তত্ত্ব
দেশজ উপাদানের প্রতি মানুষের টান শুধু নান্দনিক নয়, তা মানসিকও। কাঠের গন্ধ, মাটির ছোঁয়া, বেতের বুনন— এগুলো আমাদের শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের বাড়ির বারান্দা, পুকুরের ধারে বসে চা খাওয়া বিকেল। এই স্মৃতি আমাদের শান্ত করে, ক্লান্তি মুছে দেয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শে থাকা মানসিক প্রশান্তি বাড়ায়, উদ্বেগ কমায়। কাঠের উষ্ণ টোন, মাটির নরম টেক্সচার বা বেতের হালকা বুনন— এগুলো মস্তিষ্কে একধরনের “relaxing response” তৈরি করে। তাই আজও মানুষ অবচেতনে ফিরে যায় সেই দেশজ সৌন্দর্যের দিকে।
দেশজ নান্দনিকতার পুনর্জাগরণ
বর্তমান সময়ে দেশজ শিল্প শুধু nostalgia নয়, এটি এক নতুন জীবনধারা। বাংলার তরুণ প্রজন্ম বুঝতে শিখেছে— আধুনিকতা মানেই পশ্চিমা রীতি নয়, বরং নিজের ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ। তাই আজকের ইন্টেরিয়র ডিজাইনেও ‘Minimal meets Local’ অর্থাৎ কম জিনিসে, কিন্তু স্বদেশি উপাদানে সৌন্দর্য।
অনেকে এখন নিজের বাড়িতে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি পণ্য কিনছেন, তাদের কাজের প্রশংসা করছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করছেন। এতে যেমন ঐতিহ্য বেঁচে থাকে, তেমনি শিল্পীর জীবনও বদলায়।
কাঠ, মাটি ও বেত এই তিনটি উপাদান যেন বাংলার আত্মা। এগুলো শুধু বস্তু নয়, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানসিকতার প্রতিফলন। আধুনিকতার এই দৌড়ে আমরা যখন নিজস্বতার খোঁজে ক্লান্ত, তখন এই দেশজ উপাদানগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
“যেখানেই যাই, মাটির টান থেকে মুক্তি নেই।”
কাঠের উষ্ণতা, মাটির ঘ্রাণ, বেতের বুনন— এই সব মিলেই গড়ে ওঠে আমাদের ঘর, আমাদের জীবন, আমাদের পরিচয়। তাই নতুন প্রজন্মের হাতে যখন এই দেশজ ঐতিহ্য নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে, তখন মনে হয়— বাংলার শিল্প ও নান্দনিকতা কখনও হারায়নি, বরং নতুন যুগে আরও উজ্জ্বলভাবে ফিরে এসেছে।