স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ নারীর উপস্থিতি শক্তিশালী ও দৃশ্যমান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা ব্যবসার মতো ক্ষেত্রেও কর্মজীবী নারীরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু এই উন্নতির সঙ্গেই থেকে যায় নানান চ্যালেঞ্জ, যার অন্যতম হলো স্ট্রেস বা মানসিক চাপের সমস্যা। পরিবার ও কর্মস্থলের দুই প্রান্তকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে অনেক নারীই নিরবচ্ছিন্ন এক মানসিক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যান। এই স্ট্রেস নিয়ন্ত্রিত না হলে তা শরীর-মন দুইয়ের উপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেক্ষেত্রে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের উপায় জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।
কর্মজীবী নারীর স্ট্রেসের মূল কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা বাড়ছে। লক্ষ্য অর্জন, সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করা, কর্মজীবনে নিজের অবস্থান ধরে রাখা এসবই চাপের বড় উৎস। অনেক সময় নারী সহকর্মীদের দক্ষতা সত্ত্বেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না বা তাঁদের মতামত উপেক্ষিত হয়। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, কর্মস্থলে হেনস্তা ও অসহযোগিতার মতো সমস্যাগুলোও মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। আবার অফিসের কাজ শেষ করে ঘরে ফিরেও তাঁকে দ্বিতীয় শিফটের কাজ সামলাতে হয় রান্নাবান্না, সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের সকল দায়িত্ব। এতে নারীর নিজের বিশ্রাম, অবসর বা আত্ম-যত্নের জন্য সময়ই থাকে না।
বহু কর্মজীবী নারী সময় ব্যবস্থাপনায় সমস্যায় পড়েন। ফলে তারা মনে করেন, দিন যেন সবসময় কম পড়ে যাচ্ছে। পরিবারকে সময় দিতে না পারা, সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগে ঘাটতি এসব বিষয়ে অপরাধবোধ বাড়তে থাকে। আবার একই সময়ে তাঁদের কাছে আশা থাকে সব কিছু নিখুঁতভাবে করার ‘পারফেকশনিজম’। এই নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা অনেকাংশে নিজের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তিকে মানসিকভাবে ক্লান্ত ও হতাশ করে তোলে।
স্ট্রেস কেবল মানসিক নয় শরীরে তার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। মাথাব্যথা, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, পেশিতে ব্যথা ইত্যাদি অনেক শারীরিক সমস্যা স্ট্রেসের ফল। আগ্রহহীনতা, মন খারাপ লাগা, সহজে রেগে যাওয়া, কাজের প্রতি অনীহা এসবই স্ট্রেসের আচরণগত লক্ষণ। দীর্ঘমেয়াদে এই স্ট্রেস থেকে উদ্বেগজনিত রোগ, ডিপ্রেশন বা বার্নআউট সিনড্রোম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর্মজীবী নারীর স্ট্রেসের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি দিক হলো সমাজের প্রত্যাশা। এখনও সমাজে নারীর প্রথম পরিচয় হিসেবে ধরা হয় তিনি একজন স্ত্রী, মা বা গৃহিণী। কর্মজীবনের সাফল্যকে পরিবারিক সাফল্যের নিচে ফেলে দেখা হয় অনেক ক্ষেত্রে। ফলে নারী ক্রমাগত চেষ্টা করেন পরিবারের কেউ যেন তাঁকে অভিযোগ করতে না পারে। আবার সন্তান ছোট থাকলে তাঁকে সময় না দিতে পারার ভেতরকার অপরাধবোধ নারীর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। যে কারণে মানসিক চাপ আরও বাড়ে এবং নারী নিজেকে দিন দিন আরো একাকী অনুভব করতে শুরু করেন।
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের প্রথম ধাপ হলো নিজেকে বোঝা এবং নিজের সীমা স্বীকার করা। প্রতিটি মানুষের সামর্থ্য আলাদা। সব কিছু নিখুঁতভাবে সামলানো সবসময় সম্ভব নয়। তাই অগ্রাধিকার ঠিক করে চলা জরুরি কোন কাজটা আগে, কোনটা পরে এবং কোনটা করা জরুরি নয়। কাজের মাঝে নিজের জন্য সামান্য বিরতি নেয়াও মানসিক স্বস্তি আনে। অনেক সময় এক কাপ চা নিয়ে ৫ মিনিটের বিশ্রামই মনকে নতুন করে শুরুর শক্তি দেয়।
সময় ব্যবস্থাপনা স্ট্রেস কমানোর অন্যতম বড় উপায়। দৈনন্দিন কাজের তালিকা তৈরি করলে কাজের চাপ কম মনে হয়। অফিসে প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সব কিছু নিজে করতে গেলে চাপ বাড়ে, তাই ‘না’ বলতে শিখতে হবে। ঘরোয়া কাজেও পরিবার ও সঙ্গীর সহায়তা প্রয়োজন কারণ সংসার যৌথ দায়িত্ব। সন্তানদেরও বয়স উপযোগী ছোট কাজ শিখিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
নিজের স্বাস্থ্য যত্ন স্ট্রেস কমানোর আরেকটি মূল উপাদান। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এগুলো মানসিক শক্তি বাড়ায়। হাঁটা, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মনকে শান্ত রাখে এবং টেনশন কমায়। প্রতিদিন অন্তত ১৫–২০ মিনিট নিজের জন্য গান শোনা, বই পড়া, বাগান করা বা কোনো শখ পূরণ এসব কাজ মাথাকে চাপমুক্ত করে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে মনোবিদের সাহায্য নেওয়াও স্বাভাবিক, এতে সংকোচের কিছু নেই।
যোগাযোগ ও আড্ডার ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অনুভূতি পরিবার ও বন্ধুদের সাথে ভাগ করলে মন হালকা হয়। নারীদের অনেক সমস্যা চেপে রাখার প্রবণতা থাকে যা স্ট্রেসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই খোলামেলা কথা বলা এবং কাছের মানুষের ওপর নির্ভর করা মানসিক শক্তি জোগায়। সহকর্মীরাও সহায়তার বড় উৎস হতে পারেন অফিসে ইতিবাচক সম্পর্ক স্ট্রেস অনেক কমিয়ে দেয়।
ইতিবাচক চিন্তা বা ‘পজিটিভ মাইন্ডসেট’ বজায় রাখা জরুরি। প্রতিদিনের ছোট সাফল্যগুলোকেও উদ্যাপন করুন। ব্যর্থতাকে আত্মদোষারোপের কারণ না করে তা থেকে শেখার অভ্যেস তৈরি করুন। নিজের অর্জন ও সক্ষমতাকে স্বীকার করলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং চাপ কমে। নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া শিখতে হবে নারী প্রথমে মানুষ। তিনি যদি ক্লান্ত হন, অসুস্থ হন, মানসিকভাবে ধসে পড়েন তবে আর কিছুই ঠিকভাবে চলবে না।
ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারও স্ট্রেস বাড়ায়। অফিসের ফোন, ইমেল, মেসেজ সবই কাজের ঘড়ি বাড়িয়ে দেয় ২৪ ঘণ্টায়। তাই কাজের সময় এবং ব্যক্তিগত সময় আলাদা রাখা জরুরি। বাড়িতে এসে নির্দিষ্ট সময়ের পর কাজের ফোন না ধরা বা উইকএন্ডে নিজের/পরিবারের সময়ে কাজ না টানা এতে মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
কর্মস্থল এবং নীতিনির্ধারক সংস্থারও নারীর স্ট্রেস কমাতে দায়িত্ব রয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টায় নমনীয়তা, ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমের সুযোগ এসব সুবিধা কর্মজীবী নারীর ভার কমাতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে নারী কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং সহায়তা বা স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কর্মশালার আয়োজন করা।
সব শেষে বলা যায়, স্ট্রেস কর্মজীবনের অংশ হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কর্মজীবী নারী যত বেশি নিজেকে গুরুত্ব দেবেন, নিজের যত্ন নেবেন, ততই তাঁর ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বাড়বে পরিবার এবং কর্মস্থল দুই ক্ষেত্রেই। নারী শুধু দায়িত্বের বাহক নন তিনি একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, যার স্বপ্ন, চাওয়া, অনুভূতি ও বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। নিজেদের প্রতি যত্নশীল হওয়া মানেই নিজের সাফল্যের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। সুখী, সুস্থ এবং সফল কর্মজীবী নারীই গড়ে তুলতে পারেন সুস্থ পরিবার, সমৃদ্ধ সমাজ ও উন্নত দেশ। তাই প্রতিটি কর্মজীবী নারীর বলাই উচিত “আমার স্বাস্থ্য, আমার মানসিক শান্তি সবার আগে।”