19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

অনলাইন প্রতারণা থেকে সুরক্ষার পাঁচটি উপায় !

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে ইন্টারনেট মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে অসীম সুবিধা। কেনাকাটা, ব্যাংকিং, শিক্ষালাভ, স্বাস্থ্যপরামর্শ সবই কয়েকটি টাচেই সম্ভব। কিন্তু এই ডিজিটাল সুবিধার পাশাপাশি বাড়ছে বিপদের মাত্রাও। প্রতারণা এখন আর শুধুই রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ নয়; পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সাইবার অপরাধীরা স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে মুহূর্তেই টাকা হাতিয়ে নিতে পারে। বিশেষ করে স্মার্টফোনে ব্যাংকিং অ্যাপ, UPI পেমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। তাই আজকের দিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করার পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষার কৌশল জানা অত্যন্ত জরুরি।

অনলাইন প্রতারণা নানা ধরনের হতে পারে। কোথাও ফিশিং লিঙ্ক ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা হয়, কোথাও আবার KYC আপডেটের মিথ্যা অজুহাতে ব্যাংক ডিটেলস নিয়ে নেওয়া হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নকল প্রোফাইল তৈরি করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলে আর্থিক বা মানসিক ক্ষতি করা হয়, আবার অনলাইন শপিংয়ে কম দামে প্রলোভন দেখিয়ে পণ্য না পাঠিয়েও টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। লটারি জেতার প্রলোভন কিংবা চাকরি দেওয়ার নামেও প্রতারক চক্র মানুষকে ফাঁদে ফেলে। ফলে, সচেতনতা ও সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলার প্রধান পথ।

এখানে অনলাইন প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকার পাঁচটি কার্যকর উপায় ব্যাখ্যা করা হলো

১) ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রাখুন: ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার প্রথম ধাপ

ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় সবচেয়ে বেশি যেটি ঝুঁকির মুখে পড়ে, তা হলো ব্যক্তিগত তথ্য। নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ওটিপি, পাসওয়ার্ড এই সবই সাইবার অপরাধীদের মূল টার্গেট। যেখানেই এই তথ্যগুলি শেয়ার করা হয়, সেখানেই তৈরি হয় প্রতারণার সুযোগ। তাই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কার সাথে কী শেয়ার করছেন, সেটি ভেবে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কখনোই ফোন বা ই-মেইল করে ওটিপি, কার্ড নম্বর, সিভিভি, পিন চাওয়া হয় না। কেউ চাইলে নিশ্চিত থাকুন তিনি প্রতারক। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিজের ব্যক্তিগত নথি যেমন আধার, প্যান কার্ড, ব্যাংক পাসবুকের ছবি শেয়ার করা একেবারেই উচিত নয়।

অনেক সময় অপরিচিত কেউ বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠালে আমরা ভাবি না, সরল বিশ্বাসে গ্রহণ করি। পরে সেই ব্যক্তি সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেল পর্যন্ত করতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় গোপনীয়তা সেটিংস শক্ত করে রাখা, ফ্রেন্ডলিস্ট সীমিত করা এবং পরিচয়ের সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত তথ্য যত কম ছড়াবে, প্রতারণার সম্ভাবনা তত কম থাকবে এই কথাটি সবসময় মনে রাখতে হবে।

২) শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এবং দুই স্তরের নিরাপত্তা (2FA) ব্যবহার করুন

পাসওয়ার্ড হলো আপনার ডিজিটাল সম্পত্তির চাবি। কিন্তু আজও অনেকেই খুব সাধারণ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন 123456, password, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর ইত্যাদি। হ্যাকারদের জন্য এগুলি খুব সহজেই ভাঙা সম্ভব। তাই পাসওয়ার্ড তৈরি করতে হবে জটিল এবং আলাদা আলাদা।

ভালো পাসওয়ার্ড তৈরির নিয়ম:

কমপক্ষে ১২ অক্ষরের

বড়-ছোট অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার

একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে না ব্যবহার করা

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ই-মেইল, সোশ্যাল মিডিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে অবশ্যই Two Factor Authentication (2FA) চালু করতে হবে। এতে পাসওয়ার্ড চুরি হলেও লগইন করতে ওটিপি বা বায়োমেট্রিক লাগবে, ফলে সুরক্ষা বহুগুণ বাড়বে।

এ ছাড়া নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করাও জরুরি বিশেষ করে সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলতে হবে। এই ছোট কৌশলগুলি অনেক বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করে।

৩) সন্দেহজনক লিঙ্ক, ই-মেইল ও অ্যাপ থেকে দূরে থাকুন

অনলাইন প্রতারণার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ফিশিং। এতে প্রতারকরা এমন একটি লিঙ্ক পাঠায়, যা দেখতে হয়তো আপনার ব্যাংকের অফিসিয়াল সাইটের মতোই। আপনি ক্লিক করলেই আপনার তথ্য তাদের হাতে চলে যায়। কখনো বলা হয় KYC আপডেট না করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে; আবার কোথাও অফার বা উপহার পাওয়ার লোভ দেখানো হয়।

সুতরাং

অপরিচিত কোনো লিঙ্কে ক্লিক করবেন না

ই-মেইল প্রেরকের ঠিকানা ভালো করে দেখুন

সন্দেহ হলে ব্যাংকের অফিসিয়াল হেল্পলাইনে ফোন করুন

প্লে স্টোর/অ্যাপ স্টোর ছাড়া অন্য কোথাও থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করবেন না

UPI অনুরোধ পেলেই অনুমতি দেবেন না বিশেষ করে কেউ টাকা ফেরত চাইলে বা ইনস্ট্যান্ট ক্যাশব্যাকের প্রলোভন দিলে। মনে রাখবেন UPI-তে ‘Pay’ করলে তবেই টাকা যায়; ‘Receive’ করতে কোনো অনুমতি লাগে না। তাই ‘Receive’ বললেও যদি ‘Pay’ দেখায় সেটি নিঃসন্দেহে প্রতারণা।

এই সচেতনতাই ডিজিটাল নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল।


৪) অনলাইন শপিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় লেনদেনে সতর্ক থাকুন

অনলাইন শপিং বর্তমানে খুব জনপ্রিয়। কিন্তু ঠিক এখানেই অনেক প্রতারক ফাঁদ পেতে থাকে। কম দাম, ফ্রি গিফট, সীমিত সময়ের অফারের প্রলোভন দেখিয়ে তারা মানুষকে ভোলায়। অনেক সময় পণ্য পাঠানোই হয় না, আবার অনেকটা আলাদা বা নিম্নমানের পণ্য পাঠানো হয়।

তাই:

শুধুমাত্র পরিচিত ও বিশ্বস্ত ই-কমার্স সাইট ব্যবহার করুন

অতি লোভনীয় অফার দেখলেই সন্দেহ করুন

অগ্রিম টাকা পাঠানোর আগে বিক্রেতার রিভিউ ভালো করে পড়ুন

বেনামি নম্বর বা অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাবেন না

এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া কেনাবেচায় প্রায়ই প্রতারণার ঘটনা ঘটে। নকল প্রোফাইল বা গ্রুপ তৈরি করে প্রতারকরা টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়। তাই ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) হলে ভালো, আর যদি অনলাইন পেমেন্ট হয়—তোয়াক্কা করতে হবে সব নিরাপত্তা শর্ত।

বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। তাই কারো ওপর অন্ধ বিশ্বাস ঝুঁকিপূর্ণ।

৫) ডিভাইস সুরক্ষা ও নিয়মিত আপডেট: ডিজিটাল নিরাপত্তার ভিত্তি

কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল এই ডিভাইসগুলিই ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম। কিন্তু সেগুলি সুরক্ষিত না হলে তথ্য চুরি হতে পারে সহজেই। হ্যাকাররা ম্যালওয়ার, স্পাইওয়্যার, র‍্যানসমওয়্যার দিয়ে পুরো সিস্টেম দখল করতে পারে।

সুতরাং:

ডিভাইসের অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ নিয়মিত আপডেট করুন


অফিসিয়াল অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন


পাবলিক ওয়াইফাই-এ ব্যাংকিং বা জরুরি লেনদেন করবেন না


ব্লুটুথ বা হটস্পট খোলা অবস্থায় রাখবেন না


গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ব্যাকআপ রাখুন


যদি ফোন হারিয়ে যায়, তাহলে রিমোটলি ডেটা মুছে ফেলার ব্যবস্থা রাখুন। অন্য কারোর ফোনে বা কম্পিউটারে নিজের গুগল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লগইন করলে অবশ্যই সাইন-আউট করতে হবে।


ডিভাইস সুরক্ষার এই অভ্যাসগুলো প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।


অনলাইন প্রতারণা হলে কী করবেন?


যতই সতর্ক থাকি না কেন, প্রতারণা হয়ে যেতে পারে। তখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:


সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক/ওয়ালেটের হেল্পলাইনে ফোন করে অ্যাকাউন্ট ব্লক করুন


সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন ১৯৩০ নম্বরে যোগাযোগ করুন


www.cybercrime.gov.in–এ গিয়ে অভিযোগ দায়ের করুন


প্রমাণ (স্ক্রিনশট/কল রেকর্ড) সংরক্ষণ করুন

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দ্রুত পদক্ষেপ নিলে টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই লজ্জা বা ভয়ে দেরি করা উচিত নয়।

ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি জটিল বিপদের দোরগোড়াতেও নিয়ে এসেছে। অনলাইন প্রতারণা কখনো চেনা মানুষের থেকেও হতে পারে, আবার দূরের অপরিচিতও মুহূর্তে ক্ষতি করতে পারে। তাই সচেতনতা এই বিপদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। ইন্টারনেট ব্যবহার আমাদের অধিকার, কিন্তু সেটি নিরাপদে ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব।

নিজে সচেতন হোন, অন্যকেও সচেতন করুন।

প্রতারণার আগেই প্রতিরোধ সেই বোঝাপড়াই আমাদের সাইবার-ঢাল।

Archive

Most Popular