19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

শীতের অন্দরসজ্জায় দশটি ইনডোর প্ল্যান্ট !

বাড়িঘর

নিজস্ব প্রতিনিধি



শীতের মরসুমে যখন বাইরের পরিবেশ ধীরে ধীরে শুকনো, ঠান্ডা ও মলিন হয়ে ওঠে, তখন ঘরের ভেতরের কোণে একটু সবুজের স্পর্শ এনে দিতে পারে অসাধারণ উষ্ণতা। ইনডোর প্ল্যান্ট শুধু ঘর সাজায় না—বাতাসকে বিশুদ্ধ করে, মন ভালো রাখে, এমনকি ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ঠান্ডার মরশুমে যেসব গাছ সহজে টিকে থাকে, কম আলোতেও বেড়ে ওঠে, সেই সব ইনডোর প্ল্যান্টকে অন্দরসজ্জার অংশ করলে আপনার ঘর হয়ে উঠতে পারে এক আরামদায়ক, শান্ত ও প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ পরিবেশ। শীতের অন্দরসজ্জায় কোন দশটি ইনডোর প্ল্যান্ট সবচেয়ে উপযোগী—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. মানিপ্ল্যান্ট : সহজ যত্ন, অসাধারণ সৌন্দর্য

মানিপ্ল্যান্ট সম্ভবত ইনডোর প্ল্যান্ট জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম। শীতে যখন সূর্যের আলো কম থাকে, তখনও এটি খুব সহজে টিকে থাকে এবং দ্রুত বাড়ে। লতানো পাতাগুলোকে টেবিলের উপরে রাখুন বা ওয়ালে ঝোলানো প্ল্যান্টার—যেখানেই রাখবেন, সঙ্গে সঙ্গে ঘরের প্রাণ বদলে দেবে। মানিপ্ল্যান্ট বাতাস পরিশোধনে অত্যন্ত কার্যকর, বিশেষ করে ফর্মালডিহাইড ও কার্বন মনোক্সাইড দূর করতে সাহায্য করে। শীতকালে সপ্তাহে একদিন হালকা জলই যথেষ্ট, আর অল্প আলোতেও বেড়ে ওঠে। তাই ড্রয়িংরুম, বেডরুম বা এমনকি রান্নাঘরের জানালার পাশে রাখার জন্য এটি আদর্শ।

২. স্নেক প্ল্যান্ট : কম আলোতে টিকে থাকা সাহসী গাছ

স্নেক প্ল্যান্ট বা সানসেভেরিয়া শীতের অন্দরসজ্জার অন্যতম উপযুক্ত গাছ। এর লম্বা, সোজা দাঁড়ানো পাতা ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায় এবং অত্যন্ত কম যত্নে বছরের পর বছর টিকে থাকে। ঘরের এক কোনা আলো না পেলেও স্নেক প্ল্যান্ট বিন্দুমাত্র অভিযোগ করবে না। এটি রাতে অক্সিজেন ছাড়ে—এই গুণের জন্য অনেকেই বেডরুমে রাখেন। শীতকালে অতিরিক্ত জল না দেওয়াই ভালো; বরং দুই থেকে তিন সপ্তাহে একবার জল যথেষ্ট। ঘরের মিনিমাল, আধুনিক বা কাঠের সাজের সঙ্গে এই প্ল্যান্ট বিশেষভাবে মানিয়ে যায়।

৩. এলোভেরা : উপকারী ও সৌন্দর্য-বর্ধক

এলোভেরা শুধু স্বাস্থ্য ও স্কিনকেয়ারের জন্যই বিখ্যাত নয়, ঘরের সাজের ক্ষেত্রেও দারুণ ভূমিকা রাখে। শীতের ঋতুতে ঘরের শুষ্কতা বাড়ে, এলোভেরা ঘরের আর্দ্রতা কিছুটা স্বাভাবিক রাখে। আলো পেলে দ্রুত বাড়ে, তবে জানালার পাশে হালকা আলোতেও চলে। শীতকালে সপ্তাহে একবার জলেই জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। এর মাংসল পাতাগুলো ঘরের লিভিং স্পেসে একধরনের আধুনিক নান্দনিকতা এনে দেয়।

৪. আরেকায়া পাম : লিভিংরুমকে করে তুলবে সতেজ

যদি বড় আকারের কোনো ইনডোর প্ল্যান্ট খুঁজে থাকেন, যা ঘরের সাজে রাজকীয় ভাব আনবে—তাহলে আরেকায়া পাম উপযুক্ত। শীতে গাছটি বেশ ভালো থাকে, কারণ ঠান্ডা-সহিষ্ণু ও ঘরোয়া আবহাওয়ায় সহজে মানিয়ে যায়। এর লম্বা পাতাগুলোর ভিতর দিয়ে আলো প্রতিফলিত হয়ে ঘরকে ফ্রেশ দেখায়। বড় কর্নার, সোফার পাশে বা জানালার কোণে রাখলে পুরো ঘরের পরিবেশ বদলে যায়। তবে শীতে অতিরিক্ত জল না দেওয়াই ভালো—মাটির উপরিভাগ শুকোলে অল্প জল দিন।

৫. পিস লিলি : স্নিগ্ধতার প্রতীক

শীতের বাতাসে পিস লিলি অসাধারণভাবে টিকে থাকে। এর সাদা ফুল এবং গাঢ় সবুজ পাতার কনট্রাস্ট ঘরে একধরনের শান্ত, নরম পরিবেশ তৈরি করে। যারা ন্যাচারাল ডেকর বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাজ পছন্দ করেন, তাদের ঘরে পিস লিলি একেবারে মানানসই। এটি ইনডোর এয়ার পিউরিফায়ার হিসেবেও পরিচিত। হালকা আলোতে রাখলেও চলে, তবে পরোক্ষ সূর্যালোক পেলে বেশি ফুল দেয়। জল সপ্তাহে দু’বার হলেই যথেষ্ট।

৬. স্পাইডার প্ল্যান্ট : ঘরকে দেয় প্রাণবন্ত সবুজ

স্পাইডার প্ল্যান্ট খুব দ্রুত বাড়ে এবং ঝুলন্ত বা উঁচু শেলফে রাখলে দারুণ দেখায়। শীতের শুষ্ক আবহাওয়া এদের জন্য ক্ষতিকর নয়; বরং বরাবরই তারা ঘরের তাপমাত্রায় ভালো থাকে। শিশু বা পোষ্য-সহ বাড়ির জন্য এই গাছ একেবারে নিরাপদ। স্পাইডার প্ল্যান্ট বাতাস থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক শোষণ করে ঘরের পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করে তোলে। এছাড়া এদের পাতার দোলানো সবুজ স্ট্রাইপ ঘরের অন্দরসজ্জায় প্রাণ যোগ করে।

৭. জিজি প্ল্যান্ট : ব্যস্ত মানুষের জন্য আদর্শ

যারা খুব ব্যস্ত, অফিস–বাড়ি সামলে প্রতিদিন গাছের যত্ন নেওয়ার সময় পান না—তাদের জন্য জিজি (ZZ) প্ল্যান্ট একেবারে আদর্শ। এটি শীতে যেমন ভালো থাকে, গ্রীষ্মেও তেমনি শক্ত। খুব কম আলো সহ্য করতে পারে, তাই ঘরের যে কোনো অন্ধকার কোণেও বাড়তে পারে। জল একদম কম দিতে হয়—মাটির নিচে বড় আলুর মতো রাইজোম থাকে, যা জল ধরে রাখে। ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণ—সর্বোচ্চ সৌন্দর্য।

৮. রাবার প্ল্যান্ট : আড়ম্বরপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন

রাবার প্ল্যান্ট শীতের অন্দরসজ্জায় একটু নাটকীয়, মোটা, চকচকে পাতার সৌন্দর্য যোগ করে। এটি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে একটি ‘স্টেটমেন্ট প্ল্যান্ট’ হিসেবে দাঁড়ায়। গাছটি ঘরের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং বাতাস বিশুদ্ধ করে। শীতকালে খুব বেশি জল প্রয়োজন হয় না—তবে পাতায় হালকা জল স্প্রে করলে ভালো থাকে। কাঠের ফার্নিচার, মিনিমাল ডেকর বা আধুনিক অন্দরসজ্জার সঙ্গে রাবার প্ল্যান্ট ভীষণ মানানসই।

৯. ইংলিশ আইভি : শীতের অন্দরসজ্জায় এলিগ্যান্ট টাচ

ইংলিশ আইভি ইনডোর প্ল্যান্টের মধ্যে অন্যতম সুন্দর লতানো গাছ। শীতের ঠান্ডা পরিবেশ এদের জন্য বেশ আরামদায়ক। দেওয়ালের ওপর ঝুলিয়ে রাখা, বুকশেলফ বা জানালার গ্রিল—যেখানেই রাখুন, এর ঝরঝরে লতা ঘরে নিয়ে আসে নরম, ক্লাসিক অনুভূতি। এছাড়া এটি ঘরের বাতাসে থাকা ছত্রাক দূর করে, যা শীতকালে বিশেষ উপকারী।

১০. ফিলোডেনড্রন : অন্দরসজ্জার চিরসবুজ নায়ক

ফিলোডেনড্রন ঘরের আলো–আর্দ্রতার সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। শীতে নতুন পাতা কিছুটা কম বের হলেও গাছটি খুব ভালো থাকে। হৃদয় আকৃতির পাতাগুলো ঘরকে করে তোলে স্নিগ্ধ ও উষ্ণ। বিভিন্ন বৈচিত্রের ফিলোডেনড্রন পাওয়া যায়—হ্যাংগিং বাস্কেটে, টেবিলটপে বা বড় ফ্লোর প্ল্যান্টারেও দারুণ লাগে। শীতকালে জল দিতে হয় খুব কম, তবে শুকনো বাতাসে মাঝে মাঝে পাতায় স্প্রে করলে গাছটি তরতাজা থাকে।


শীতের অন্দরসজ্জায় ইনডোর প্ল্যান্ট ব্যবহারের কিছু টিপস

শীতের ইনডোর প্ল্যান্ট শুধু ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায় না, একটি স্বাস্থ্যকর, আরামদায়ক পরিবেশও তৈরি করে। তবে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে গাছগুলো আরও ভালো থাকে

1. ঘর অতিরিক্ত ঠান্ডা হলে গাছকে জানালার খুব কাছে রাখবেন না, ঠান্ডা বাতাস পাতায় ক্ষতি করতে পারে।

2. অতিরিক্ত জল দেবেন না—শীতে মাটি শুকোতে সময় লাগে।

3. পাতায় ধুলো জমলে মুছে দিন, এতে আলো ঠিকভাবে পৌঁছায়।

4. প্রাকৃতিক আলো যেখানে পড়ে সেসব জায়গা বেছে নিন, তবে সরাসরি তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন।

5. গাছের পাত্র পরিবর্তনের দরকার নেই—শীতকালে রিপটিং না করাই ভালো।

শীতের অন্দরসজ্জায় ইনডোর প্ল্যান্ট যোগ করলে ঘর শুধু সবুজ হয় না একটি উষ্ণ, শান্ত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত আবহ তৈরি হয়। বাতাসকে বিশুদ্ধ করা থেকে শুরু করে মানসিক স্বস্তি দেওয়া—এই গাছগুলো বাড়ির পরিবেশকে মানসিক ও শারীরিকভাবে আনন্দদায়ক করে তোলে। মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট, পাম, পিস লিলি বা রাবার প্ল্যান্ট—প্রতিটি গাছেরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। শীতের ঠান্ডার মধ্যেও এদের যত্ন নেওয়া সহজ, দেখতেও দৃষ্টিনন্দন। তাই এই মরসুমে অন্দরসজ্জার অংশ করুন আপনার পছন্দের ইনডোর প্ল্যান্ট, বাড়ি হোক সবুজে ভরা, সুন্দর আর প্রাণবন্ত।

Archive

Most Popular