19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

জানেন কী, পূর্ণিমা-অমাবস্যা ছাড়াও সপ্তাহের এই তিন দিনেও তুলসীপাতা ছেঁড়া মানা !

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



তুলসী পাতা বা হোলি বেসিল, আমাদের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং স্বাস্থ্যগত জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্ভিদ। হিন্দু শাস্ত্রে তুলসীর স্থান বিশেষভাবে সুপরিচিত। শুধু পূর্ণিমা বা অমাবস্যার দিনে নয়, বরং সপ্তাহের নির্দিষ্ট তিন দিন রবিবার, মঙ্গলবার ও শুক্রবার তুলসীপাতা ছেঁড়া বা সংগ্রহ করা ও স্পর্শ করা নিষেধ। এই নিয়মটি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে এবং আজও অনেক পরিবারে কঠোরভাবে পালন করা হয়। তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক নয়, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই নিয়মের পেছনে ব্যাখ্যা রয়েছে। এই প্রতিবেদনে তুলসীপাতার মাহাত্ম্য, শাস্ত্রীয় বিধি, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

প্রথমেই বলা যায়, তুলসী শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, এটি হিন্দু ধর্মের দেবতা ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, তুলসীকে সরাসরি স্পর্শ বা ছেঁড়া অবাধে করলে পাপের সম্ভাবনা থাকে। তুলসীকে প্রতিদিন দেখাশোনা করা এবং নিয়মিত জল দেওয়া, তেলের আলো দেওয়া বা প্রসাদ প্রদান এই অভ্যাস মানুষের মানসিক শান্তি এবং নৈতিক অনুশাসন বৃদ্ধি করে। শাস্ত্রে তুলসীকে ঘরের প্রধান দেবতা হিসেবে মানা হয়, যার পাশে বসবাস করলে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি আসে।

তুলসীপাতা ছেঁড়া নিষেধের নির্দিষ্ট দিন হলো রবিবার, মঙ্গলবার ও শুক্রবার। রবিবার সূর্যদেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দিনে তুলসীপাতা ছেঁড়া বা স্পর্শ করলে মানুষের প্রাকৃতিক শক্তি এবং মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। মঙ্গলবার যুদ্ধ দেবতা মঙ্গলদেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দিনে তুলসীপাতা সংগ্রহ করলে বাড়িতে অশুভ শক্তি প্রবেশ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। শুক্রবার শাস্ত্রে লক্ষ্মী দেবীর দিন হিসেবে মানা হয়। এই দিনে তুলসীপাতা ছেঁড়া বা অবাধে ব্যবহার করলে ভাগ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শাস্ত্র অনুযায়ী, তুলসীপাতা ছেঁড়া উচিত সঠিক সময় এবং সঠিক নিয়মে। তুলসী উদ্ভিদকে ধ্যান ও পূজা করার আগে সকালে অথবা সন্ধ্যায় পানি দিয়ে পরিষ্কার করে স্পর্শ করা যায়। দিনের বেলা, বিশেষ করে যে তিন দিনে ছেঁড়া নিষেধ, ওই সময়ে স্পর্শ করা উচিত নয়। এছাড়া ছেঁড়ার সময় উদ্ভিদের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। তুলসীপাতা ছেঁড়ার আগে বা পরে হাত ধোয়া এবং গাছের চারপাশের মাটি পরিচ্ছন্ন রাখা—এই অভ্যাসও শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তুলসীপাতা ছেঁড়া বা অবাধ স্পর্শ নির্দিষ্ট দিনে না করার কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। তুলসী পাতায় প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট তিন দিনে তুলসীপাতার পাতায় জীবাণু এবং ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। অতএব এই দিনগুলোতে স্পর্শ বা ছেঁড়া এড়িয়ে চললে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে। এছাড়া তুলসীপাতা সংরক্ষণের সঠিক সময় এবং পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।

তুলসীপাতার মানসিক ও শারীরিক উপকারিতা অনেক। এটি স্ট্রেস কমাতে, ইমিউনিটি বাড়াতে এবং ঘরের পরিবেশকে পজিটিভ রাখতে সাহায্য করে। তুলসীপাতা চায়ের মাধ্যমে শীতকালীন ঠান্ডা, কাশি ও সর্দি প্রতিরোধে কার্যকর। নিয়মিত তুলসীপাতা দেখা এবং স্পর্শের মাধ্যমে মানুষের মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়। তাই শাস্ত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে স্পর্শ না করা, অন্য সময়ে ধ্যান ও পূজার মাধ্যমে ব্যবহার করা—এই ভারসাম্য বজায় রাখে।

তুলসীপাতা সংগ্রহের সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। প্রথমে হাতে ধোয়া, তারপর গাছের নিচের অংশ থেকে পাতাগুলো নরমভাবে ছেঁড়া। কাটা অংশে জল দেয়া বা মাটি মসৃণ করা উচিত। এই অভ্যাস উদ্ভিদের দীর্ঘায়ু এবং পুষ্টিগুণ বজায় রাখে। উদ্ভিদ যত্নের সঙ্গে আধ্যাত্মিক দিকও মিলিয়ে চললে মানুষ মানসিক শান্তি ও স্বাস্থ্য—উভয়ই উপভোগ করতে পারে।

শিশুদের মধ্যে তুলসীকে পছন্দ করার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। সন্তানদের শিখিয়ে দিতে হবে, তুলসীপাতা ছেঁড়ার সময় সতর্ক থাকা, নির্দিষ্ট দিনে না ছেঁড়া। এভাবে ধর্মীয় ও পরিবেশগত শিক্ষাও প্রদান করা হয়। তুলসীপাতার প্রতি সম্মান দেখানো একটি শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

উপসংহারে বলা যায়, তুলসীপাতা ছেঁড়া না করার নিয়ম শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতি নয়। এটি মানসিক শান্তি, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত সচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। রবিবার, মঙ্গলবার ও শুক্রবার—এই তিন দিনে তুলসীপাতা ছেঁড়া এড়িয়ে চললে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, অশুভ শক্তি এবং ভাগ্যগত ক্ষতি কমে। অন্য দিনগুলোতে তুলসীপাতা ছেঁড়া বা ব্যবহার করলে উদ্ভিদ ও পরিবারের জন্য উপকার হয়। তুলসী শুধু এক উদ্ভিদ নয়, এটি শাস্ত্র, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য এবং মানসিক শান্তির এক সমন্বয়। সঠিক সময় এবং নিয়ম মেনে তুলসীপাতা ব্যবহারে পরিবার ও সমাজ—উভয়ের জন্যই শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।

Archive

Most Popular