19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাচ্চারা খেতে বসলেই মোবাইল চায় ? আসক্তি কাটানোর উপায় কী ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট বাচ্চাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাবারের সময়ও তারা মোবাইল চায়, যা পরিবারের খাবারের নিয়ম এবং সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। শিশুদের মধ্যে স্ক্রিন আসক্তি শুধু খাবারের অভ্যাস নয়, বরং মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। এই প্রতিবেদনে আমরা শিশুদের মোবাইল আসক্তির কারণ, প্রভাব এবং এই অভ্যাস কাটানোর কার্যকর কৌশল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

প্রথমেই জানা জরুরি—কেন বাচ্চারা খেতে বসলেই মোবাইল চায়। বাচ্চাদের মস্তিষ্কের নিউরোলজি এবং আচরণগত দিক থেকে দেখা যায়, ভিডিও গেম, কার্টুন এবং রঙিন অ্যানিমেশন তাদের মধ্যে ডোপামিন মুক্তি বাড়ায়। এটি আনন্দ ও সন্তুষ্টির অনুভূতি তৈরি করে। তাই খাবারের সময়ে যখন পিতামাতা বা পরিবার তাদের দিকে মনোযোগ দেয় না, তখন মোবাইল বাচ্চাদের জন্য সান্ত্বনার উৎসে পরিণত হয়। এছাড়া, পরিবারের অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। যদি পরিবারের সদস্যরা নিজেরাও খাবারের সময় মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, তবে শিশুদের জন্য এটি প্রাকৃতিক আচরণ হিসেবে তৈরি হয়।

মোবাইল আসক্তি কেবল আনন্দের অভ্যাস নয়। এটি শিশুদের খাবার খাওয়ার অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটায়। শিশুরা মনোযোগ দেয় না, খাবার ঠিকমতো চিবায় না এবং কখনো কখনো অর্ধেক খাবার ফেলে দেয়। এর ফলে হজম সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি এবং ওজনের অস্বাভাবিকতা হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক দক্ষতা, পরিবারে সম্পর্ক এবং একাগ্রতা কমিয়ে দেয়।

মোবাইল আসক্তি কাটানোর জন্য পিতামাতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ধাপ হলো স্বরূপ চিহ্নিত করা—শিশু কখন এবং কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করছে। এরপর ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত। হঠাৎ মোবাইল বন্ধ করলে শিশু মানসিকভাবে অস্থির হয়ে যেতে পারে। তাই ধীরে ধীরে ব্যবহার সীমিত করা সর্বোত্তম।

“নো স্ক্রিন ডাইনিং” নিয়ম শিশুদের মধ্যে একটি কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলে। খাবারের সময় কোনো মোবাইল, টিভি বা ট্যাবলেট ব্যবহার করা যাবে না। প্রথমে ছোট ধাপ নিন—প্রথমে দুপুরের খাবার, তারপর সন্ধ্যার মিল, এবং শেষমেশ পুরো পরিবারের মিল। এর সঙ্গে শিশুদের মনোযোগ অন্যদিকে আকর্ষণ করার জন্য গল্প বলুন, খেলা করুন বা খাবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করুন। উদাহরণস্বরূপ, “আজ স্কুলে কি নতুন ঘটনা ঘটল?” বা “এই সালাদের স্বাদ কেমন?”—এ ধরনের কথোপকথন শিশুদের মনোযোগকে খাবারের দিকে নিয়ে আসে।

আচরণগত কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য একটি রুটিন তৈরি করা—নির্দিষ্ট সময়ে খাবার, খেলার সময় এবং মোবাইল ব্যবহারের সময়—শিশুদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পিতামাতা বা অভিভাবকরা যদি ধৈর্য ধরে এই নিয়ম অনুসরণ করেন, তবে শিশু ধীরে ধীরে নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এছাড়া, শিশুদেরকে স্বল্প পুরস্কার বা প্রশংসার মাধ্যমে নতুন নিয়মে অনুপ্রাণিত করা যায়।

বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কাটানোর জন্য কিছু প্রায়োগিক টিপস কার্যকর।

1. খাবারের সময় পরিবেশ পরিবর্তন: শিশুদের জন্য আলাদা টেবিল বা পরিবারের সবাই একত্রে বসার ব্যবস্থা করুন।

2. মোবাইল হাইড বা বাইরে রাখুন: খাবারের সময় শিশুদের পৌঁছানো না যায় এমন স্থানে রাখুন।

3. গল্প, গান বা খাদ্য সংক্রান্ত কার্যক্রম ব্যবহার করুন: শিশুদের মনোযোগ অন্য দিকে নিয়ে যান।

4. ছোট ধাপে ব্যবহারের সময় কমানো: প্রথমে ৩০ মিনিট, পরে ২০ মিনিট, তারপর সম্পূর্ণ বন্ধ।

5. নিয়মিত পরিবারের মিল: পরিবারের সঙ্গে মিলের সময় শিশুদের আনন্দ এবং সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।

বেশি বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, স্বনির্ধারিত সীমা কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, দুপুরের খাবারের সময় মোবাইল ব্যবহার করলে ৫ মিনিট কম খেলাধুলার সুযোগ। এইভাবে শিশু শিখতে পারে—স্ক্রিন এবং সামাজিক আচরণ উভয়কে সঠিক ভারসাম্যে রাখা।

স্কুলে বা শিক্ষাগত পরিবেশেও শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাসকে প্রভাবিত করা যায়। শিক্ষক এবং অভিভাবকরা একত্রে নিয়ম প্রয়োগ করলে শিশুরা সহজেই নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়। এছাড়া শিশুদের জন্য বিকল্প বিনোদন—বই, খেলনা, পাজল, শারীরিক খেলা—মনোযোগ ও মানসিক বিকাশে সহায়ক।

বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কাটানো শুধু খাবারের সময় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা এবং শারীরিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখে। মোবাইল আসক্তি কমালে শিশুদের চেতনামূলক মনোযোগ বৃদ্ধি পায়, পরিবারে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং খাবার খাওয়ার অভ্যাসও স্বাস্থ্যকর হয়।

উপসংহারে বলা যায়, বাচ্চারা খেতে বসলেই মোবাইল চাওয়া একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, এটি ধাপে ধাপে কাটানো সম্ভব। পিতামাতার সচেতনতা, “নো স্ক্রিন ডাইনিং” নিয়ম, আচরণগত কৌশল, ধৈর্য এবং বিকল্প বিনোদনের মাধ্যমে শিশুর মোবাইল আসক্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিয়মিত রুটিন, গল্প, পরিবারে সংলাপ, এবং স্বল্প পুরস্কার—এসব অভ্যাস শিশুদের নতুন অভ্যাসে অভ্যস্ত করতে সহায়ক। স্মার্টফোন ব্যবহারের সঠিক সীমা নির্ধারণ শিশুদের মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক বিকাশে সহায়ক। তাই আজ থেকেই পরিবারকে একত্রিত করে এবং শিশুর সাথে সক্রিয়ভাবে মিলে—নিয়মিত মিলের সময়ে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

সঠিক রুটিন ও সচেতনতার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে খাবারের সময় মোবাইল চাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। এটি শিশুদের স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা এবং মানসিক শান্তি উভয়ই নিশ্চিত করে।

Archive

Most Popular