স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
ওজন কমাতে সাহায্য করে ব্ল্যাক কফি? সত্যিই কি তাই—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে, ওজন কমানোর বিজ্ঞান আসলে কী বলে। বর্তমান সময়ে ডায়েট সংস্কৃতি, জিম ট্রেন্ড এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে ব্ল্যাক কফি যেন এক প্রকার ‘ফ্যাট বার্নিং ড্রিংক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অনেকে সকালে খালি পেটে বা ব্যায়ামের আগে এক কাপ ব্ল্যাক কফি পান করেন এই আশায় যে এতে দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু বাস্তবতা কতটা?
ব্ল্যাক কফির মূল কার্যকর উপাদান হলো ক্যাফেইন। ক্যাফেইন একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপক, যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। এর ফলে শরীরে সাময়িকভাবে মেটাবলিজ়ম বা বিপাকক্রিয়ার হার কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন থার্মোজেনেসিস প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে—অর্থাৎ শরীর তাপ উৎপাদনের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত ক্যালোরি খরচ করে। একই সঙ্গে এটি ফ্যাট অক্সিডেশন বা সঞ্চিত চর্বি ভাঙার হার সাময়িকভাবে বাড়াতে পারে। ফলে ব্যায়ামের আগে ব্ল্যাক কফি পান করলে অনেকের ক্ষেত্রে সহনশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং ক্যালোরি বার্ন কিছুটা বাড়ে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ। চিনি, দুধ বা ক্রিম ছাড়া এক কাপ ব্ল্যাক কফিতে প্রায় শূন্য ক্যালোরি থাকে—গড়ে ২ থেকে ৫ ক্যালোরি। ফলে যারা ওজন কমানোর জন্য ক্যালোরি ঘাটতি বজায় রাখতে চান, তাদের জন্য এটি উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত পানীয়ের তুলনায় অনেক ভালো বিকল্প। উদাহরণস্বরূপ, মিষ্টি কফি, মিল্কশেক বা সফট ড্রিঙ্কের পরিবর্তে ব্ল্যাক কফি খেলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তবে এখানে একটি বড় ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। ব্ল্যাক কফি নিজে থেকে চর্বি গলিয়ে দেয় না। এটি কোনো অলৌকিক পানীয় নয়। ওজন কমানোর মূল সূত্র একই থাকে—শরীর যত ক্যালোরি গ্রহণ করছে, তার চেয়ে বেশি ক্যালোরি খরচ করতে হবে। অর্থাৎ সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি বিষয় ছাড়া স্থায়ী ওজন হ্রাস সম্ভব নয়। ব্ল্যাক কফি কেবল সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
ক্যাফেইনের আরেকটি প্রভাব হলো ক্ষুধা সাময়িকভাবে দমন করা। অনেকেই জানান, ব্ল্যাক কফি পান করার পর কিছু সময় ক্ষুধা কম অনুভূত হয়। তবে এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না। বরং অনেক সময় অতিরিক্ত ক্ষুধা জমে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও বিবেচনা করা জরুরি। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে অনিদ্রা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের পেটের সমস্যা আছে, তাদের খালি পেটে ব্ল্যাক কফি অস্বস্তি বাড়াতে পারে। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যা ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে দিনে সীমিত পরিমাণ—সাধারণত ১ থেকে ২ কাপ—গ্রহণই নিরাপদ বলে ধরা হয়, যদিও ব্যক্তিভেদে সহনশীলতা ভিন্ন হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কফির সঙ্গে কী মেশানো হচ্ছে। অনেকেই ‘ব্ল্যাক কফি’ বললেও তাতে চিনি, ফ্লেভার সিরাপ বা ক্রিম মিশিয়ে নেন। এতে ক্যালোরি দ্রুত বেড়ে যায় এবং ওজন কমানোর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তাই সত্যিকারের উপকার পেতে হলে কফি হতে হবে নিঃসন্দেহে চিনি ও দুধবিহীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যায়ামের ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট আগে এক কাপ ব্ল্যাক কফি গ্রহণ করলে কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে। এতে বেশি সময় ও তীব্রতায় ব্যায়াম করা সম্ভব হয়, যা পরোক্ষভাবে ক্যালোরি খরচ বাড়াতে সহায়তা করে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; সবার শরীর একইভাবে সাড়া দেয় না। ব্ল্যাক কফি ওজন কমানোর পথে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়। এটি একটি সহায়ক উপাদান মাত্র—যা সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে যুক্ত হলে ফল দিতে পারে। তাই অন্ধভাবে ট্রেন্ড অনুসরণ না করে নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাই দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।