19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাড়ির খুদে সদস্যের শীতকালীন যত্ন ও খাওয়া দাওয়া !

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


শীতকাল মানেই বাড়ির খুদে সদস্যদের জন্য বিশেষ যত্নের সময়। ঠান্ডা হাওয়া, কম রোদ, শুষ্ক আবহাওয়া সব মিলিয়ে এই সময়ে শিশুদের শরীর ও মন দু’টোরই বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। বড়দের তুলনায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় এই সময়ে সর্দি-কাশি, জ্বর, ত্বকের শুষ্কতা, হজমের সমস্যা এবং শ্বাসনালীর সংক্রমণ বেশি দেখা দেয়। তাই শীত এলেই শুধু গরম জামাকাপড় পরালেই কাজ শেষ হয় না; দরকার সঠিক খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত রুটিন এবং মানসিক যত্নও।

শিশুদের শীতকালীন যত্নের মূল লক্ষ্য হলো শরীরের বিশেষ চাহিদাগুলো পূরণ করা। শীতকালে শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম জল খায়, তাই ডিহাইড্রেশন ধরা পড়া সহজ হয় না। অথচ এই সময়েও শরীরের পর্যাপ্ত জল প্রয়োজন। ঠান্ডার কারণে ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে, ঠোঁট কালচে হয়ে যেতে পারে এবং হাত-পা খসখসে হতে পারে। হজমশক্তি কিছুটা ধীর হয় এবং ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এই কারণে শীতকালে শিশুদের প্রতিরোধমূলক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

শীতকালে পোশাক নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমরা শিশুদের অতিরিক্ত মোটা জামা পরাই, যা ঘাম জমে ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই লেয়ারিং পদ্ধতি অনুসরণ করাই উত্তম, অর্থাৎ ভেতরে সুতির জামা, তার ওপর উলের বা ফ্লিসের পোশাক। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা, কান ও পা ঢেকে রাখা জরুরি। ঘরের ভেতরে অতিরিক্ত সোয়েটার পরানোর কোনো প্রয়োজন নেই। রাতে ঘুমের সময় হালকা কম্বলের সঙ্গে সুতির ফুলহাতা জামা যথেষ্ট। শিশুর আরাম বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঘাড় বা পিঠ স্পর্শ করে দেখাটা।

ত্বক ও চুলের যত্নও শীতকালে বিশেষ গুরুত্ব পায়। শীতকালে শিশুদের ত্বক সহজেই শুষ্ক হয়। স্নানের পর ভালো মানের বেবি ময়েশ্চারাইজার বা নারকেল তেল ব্যবহার করা উচিত। খুব গরম জল দিয়ে স্নান করা উচিৎ নয়, এবং দিনে একবারের বেশি সাবান ব্যবহার না করাই ভালো। ঠোঁটের জন্য আলাদা বেবি লিপ বাম ব্যবহার করা যেতে পারে। চুলের জন্য সপ্তাহে ১–২ দিন হালকা তেল মালিশ যথেষ্ট। খুব ঘন ঘন শ্যাম্পু ব্যবহার না করা এবং ভেজা চুল নিয়ে বাইরে না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শিশুদের খাওয়া-দাওয়াতেও শীতকাল এক অমূল্য সময়। এই সময়ে হজমশক্তি ভালো থাকার কারণে শরীর সহজে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শস্য, ডাল, প্রোটিন, শাকসবজি, ফল এবং পর্যাপ্ত জল বা তরল খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। 

শীতকালে শিশুদের জন্য আদর্শ কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে গরম গরম খিচুড়ি, যা মুগ ডাল, চাল এবং সবজি দিয়ে তৈরি হয় এবং প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট উভয়ই সরবরাহ করে। এছাড়া গাজর, কুমড়ো, শিম, ফুলকপি দিয়ে তৈরি ঘরে বানানো সবজির স্যুপ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। হালকা গরম দুধ, দই ও পনির ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে। ফলের মধ্যে আপেল, কমলা, পেয়ারা ও কলা ভিটামিন সি এবং ফাইবারে সমৃদ্ধ। পালং শাক, মেথি শাক, গাজর, বিট এগুলো রক্তাল্পতা রোধে সাহায্য করে। এছাড়া গুড় ও চিনাবাদাম, ভাজা চানা, সবজি দিয়ে তৈরি চিঁড়ের উপমা বা ঘরে বানানো সুজি ও ওটসের পিঠে শিশুদের জন্য হেলদি স্ন্যাকস হিসেবে খুবই উপযোগী। বাইরে অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা শীতকালে নিরাপদ।

জল ও তরল খাবারের গুরুত্বও শীতকালেও অপরিসীম। শিশুরা এই সময়ে কম জল খায়, তাই হালকা গরম জল, স্যুপ, ডাল বা ফলের রস অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। স্কুলগামী শিশুদের বোতলে জল দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন।

রোগ প্রতিরোধ ও সাধারণ অসুখ থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খুব ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলা এবং ভিড় কমানো ভালো। প্রয়োজনে ঘরোয়া টোটকা যেমন তুলসী ও আদা ফোটানো জল বা হালকা গরম হলুদ দুধ (বড় শিশুদের জন্য) দেওয়া যেতে পারে, তবে সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

শিশুর দৈনন্দিন রুটিন ও ঘুমও শীতকালে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রাত বড় হওয়ায় শিশুর ঘুমের সময়ও বাড়ে। পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, মোবাইল বা স্ক্রিন টাইম কমানো এবং ঘুমের আগে হালকা গরম দুধ বা গল্প শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।

শীতের সকালের রোদ শিশুদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি শরীরে ভিটামিন ডি যোগায়, হাড় মজবুত করে এবং মন ভালো রাখে। তাই প্রতিদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট রোদে খেলাধুলা করা উচিত।

শীতকাল শুধু ঠান্ডা থেকে বাঁচানোর সময় নয়, বরং শিশুদের সুস্থভাবে বড় করার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। সঠিক খাবার, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ভালোবাসা এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে শিশুর সুস্থ শৈশব। বাড়ির খুদে সদস্যকে শীতে যত্নে আগলে রাখলে শুধু অসুখই দূরে থাকে না, বরং তৈরি হয় একটি হাসিখুশি, প্রাণবন্ত শৈশব। শীত আসুক, কিন্তু যত্নে আর ভালোবাসায় সে শীত হোক উষ্ণ।

Archive

Most Popular