19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ঝাউবনের ছায়া, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল পেরিয়ে সমুদ্র সৈকতে !

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


ঝাউবনের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতেই শুরু হয় তাজপুর সমুদ্র সৈকতের দিকে যাত্রা। মাথার উপর আকাশছোঁয়া ঝাউগাছ, দু’পাশে নরম বালির পথ, আর বাতাসে ভেসে আসা নোনা জলের গন্ধ—সব মিলিয়ে প্রথম ধাক্কাতেই মনটা হালকা হয়ে যায়। শহরের কোলাহল, কাজের চাপ যেন ঝাউবনের এই শান্ত ছায়াতেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

ঝাউবন পেরোতেই প্রকৃতির রং ও গন্ধে আসে পরিবর্তন। সামনে পড়ে ম্যানগ্রোভের ঘন জঙ্গল—নোনাজলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এক অনন্য বাস্তুতন্ত্র। জলের ধার ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা গাছের শিকড়, ছোট ছোট খাল আর কাদামাটির পথ সব মিলিয়ে এক রহস্যময় পরিবেশ। পায়ের কাছে কাঁকড়ার ছোটাছুটি, দূরে অচেনা পাখির ডাক, আর বাতাসে সোঁদা গন্ধ এই জঙ্গলকে আরও জীবন্ত করে তোলে। এই ম্যানগ্রোভ জঙ্গল শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, তাজপুর উপকূলের রক্ষাকবচ হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় এই গাছগুলিই ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখানে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির প্রতি এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা জন্মায় মানুষের অজান্তেই যে প্রকৃতি প্রতিদিন পাহারা দিয়ে চলে।

ম্যানগ্রোভের ঘনত্ব ছাড়িয়ে হঠাৎ করেই সামনে খুলে যায় বিস্তৃত সমুদ্র। ঝাউবন ও জঙ্গলের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে তাজপুর সমুদ্র সৈকতের খোলা আলোয় দাঁড়ানো এক কথায় অপূর্ব। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বালির উপর, সাদা ফেনার রেখা টেনে আবার ফিরে যাচ্ছে সমুদ্রে। দিগন্তের নীল জল আর খোলা আকাশ মিলে এক প্রশান্ত দৃশ্য তৈরি করে।

তাজপুর সমুদ্র সৈকতের বিশেষত্ব তার শান্ত পরিবেশে। দিঘা বা মন্দারমণির তুলনায় এখানে ভিড় কম, তাই নিরিবিলিতে সমুদ্র উপভোগ করার সুযোগ বেশি। ভোরবেলা সূর্যোদয় কিংবা বিকেলে সূর্যাস্ত দু’সময়েই সমুদ্রের রং বদলে যায়, আর সেই রঙের খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

ঝাউবনের ছায়া, ম্যানগ্রোভের নীরবতা আর শেষে তাজপুরের খোলা সমুদ্র এই পুরো যাত্রাপথটা যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর কথোপকথন। একা হোক বা প্রিয়জনের সঙ্গে, এই পথ ধরে হাঁটা মানেই নিজের ভেতর একটু শান্তি খুঁজে পাওয়া। তাজপুর সমুদ্র সৈকত তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং ক্লান্ত মনকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক শান্ত আশ্রয়।

কলকাতার কাছাকাছি শান্ত, নিরিবিলি সমুদ্রভ্রমণের কথা ভাবলেই তাজপুরের নাম চলে আসে। ঝাউবন, ম্যানগ্রোভ আর ফাঁকা সমুদ্র সৈকতের টানেই বছরভর ভ্রমণপিপাসুরা এখানে আসেন। কলকাতা থেকে তাজপুর যাওয়াও বেশ সহজ। পথ, সময় ও বাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন উপায়ে পৌঁছনো যায়।

বাসে তাজপুর যাওয়া :

কলকাতা থেকে তাজপুর যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী উপায় হলো বাস। ধর্মতলা, এসপ্ল্যানেড বা গড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে দিঘা বা মন্দারমণিগামী একাধিক সরকারি ও বেসরকারি বাস পাওয়া যায়। বাসে উঠে নেমে যেতে হবে কন্টাই বা বেলদা অঞ্চলে। সেখান থেকে লোকাল বাস, টোটো বা অটো ধরে তাজপুর পৌঁছতে প্রায় ৩০–৪৫ মিনিট সময় লাগে। মোট যাত্রাপথে সাধারণত ৫–৬ ঘণ্টা সময় ধরে নিতে হয়।

ট্রেনে তাজপুর যাওয়া :

যাঁরা আরাম করে ভ্রমণ করতে চান, তাঁদের জন্য ট্রেন ভালো বিকল্প। কলকাতার হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে দিঘাগামী একাধিক এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন রয়েছে। ট্রেনে কন্টাই রোড বা রামনগর স্টেশনে নামাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। স্টেশন থেকে টোটো, অটো বা গাড়ি ভাড়া করে সহজেই তাজপুর পৌঁছনো যায়। ট্রেনযাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক এবং সময়ও বাঁচে।

নিজের গাড়িতে :

পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে গেলে নিজের গাড়িতে যাওয়াই সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। কলকাতা থেকে NH-16 ধরে বেরিয়ে কোলাঘাট, বেলদা হয়ে কন্টাইয়ের দিকে যেতে হবে। কন্টাই পেরিয়ে তাজপুরের দিকে আলাদা রাস্তা আছে, সাইনবোর্ড দেখে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। ভালো রাস্তা হওয়ায় গাড়িতে যেতে ৪.৫–৫ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। পথে ধাবা ও চায়ের দোকানও যথেষ্ট আছে।

ভাড়া গাড়ি বা ট্যাক্সিতে যাত্রা :

যাঁরা ঝামেলামুক্ত ভ্রমণ চান, তাঁদের জন্য কলকাতা থেকে সরাসরি তাজপুর যাওয়ার ভাড়া গাড়ির ব্যবস্থাও রয়েছে। দিনের হিসেবে বা প্যাকেজে গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ বা ছোট বাচ্চা থাকলে এই উপায়টি বেশ সুবিধাজনক।

কবে গেলে ভালো?

তাজপুর ভ্রমণের সেরা সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে, সমুদ্রও তুলনামূলক শান্ত। বর্ষাকালে সবুজের ছোঁয়া বেশি থাকলেও রাস্তা কিছুটা সমস্যাজনক হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, কলকাতা থেকে তাজপুর পৌঁছনো খুবই সহজ ও সুবিধাজনক। বাস, ট্রেন বা গাড়ি যে পথেই যান না কেন, গন্তব্যে পৌঁছে ঝাউবনের ছায়া আর শান্ত সমুদ্র আপনার সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেবে।

Archive

Most Popular